Reading Time: 3 minutes
আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশের ব্যাংকগুলোকে ডাকাত বলেছেন। তিনি গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বললেন, ‘পৃথিবীর কোথাও ব্যাংকঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ২-৩ শতাংশের বেশি নয়। বাংলাদেশেই এ হার কেবল ৫ শতাংশের উপরে। এটা রীতিমতো ডাকাতি।’
বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও একজন বড় ব্যবসায়ী। পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ছিলেন। এ কারণেই হয়তো উচ্চসুদ হার নিয়ে তাঁর আপত্তি। তিনি তাঁর বক্তৃতায় সুদের হার ১ অংকে নামিয়ে আনাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যে ব্যাংকগুলো মানছে সে কথাও বলেছেন। তিনি মনে করেন, সুদের হার কমলে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হলে তাতে সাধারণ মানুষই উপকৃত হবে।
কেবল বাণিজ্যমন্ত্রীর নয়, সুদ হার কেন কমছে না এই প্রশ্ন তো সবার। তবে সরকারে যারা থাকেন, তাদের কাছ থেকে প্রশ্ন নয়, মানুষ উত্তর চায়, সমাধান চায়। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী কেবল হতাশা প্রকাশ করেই বক্তব্য শেষ করেননি, তিনি ব্যাংককে রীতিমত ডাকাত বলেছেন। এ বক্তব্যের পরে ব্যাংক ডাকাতদের নিয়ে একটু তত্ত্ব–তালাশ করা যেতে পারে। আবার ব্যাংকের আসল ডাকাত কারা সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা যায়।
নিশ্চয়ই সবার মনে আছে এক বছর আগে ব্যাংকের সুদ হার নিয়ে ‘নয়–ছয়’ শুরু করেছিল সরকার এবং ব্যাংক মালিকেরাই। ২০১৮ সালের জুন মাসের এক সুন্দর সকালে সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ঘোষণা দেন যে ১ জুলাই থেকে ব্যাংকের আমানতের সুদ হার হবে ৬ শতাংশ এবং ঋণের হবে নয় শতাংশ। এর পরের দিন, অর্থাৎ ২১ জুন রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো একযোগে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই সিদ্ধান্ত পালনের কথা জানিয়ে দেয়। তখনই এভাবে সুদ হার ঠিক করাকে অনেকে ঠাট্টা করে ‘নয়–ছয়’ বলেছিলেন। রশিকতাটা যে ভুল ছিল না সে প্রমান তো বাণিজ্যমন্ত্রীর কথাতেই আছে।
ব্যাংক খাত কীভাবে চলবে তার কিছু আন্তর্জাতিক রীতিনীতি আছে। বাংলাদেশকে তা মানতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক তা অনুসরণ করে। ফলে ব্যাংক বিষয়ে যে কোনো নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে সুদ হার নির্ধারণ করে দিল ব্যাংক মালিকেরা। একে তো আমরা নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া বা ডাকাতিও বলতে পারি।
ব্যাংক মালিকেরা সুদ হার ‘নয়–ছয়’ কেন করলো তারও একটা কারণ ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো এবং টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়। সরকারি আমানত রাখার সীমাও ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। এত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিনিময়ে ব্যাংক মালিকেরা সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তারা রাখেননি। একেও তো এক ধরনের ডাকাতি বলা যায়।
ব্যাংক খাতে আরও এক ধরণের ডাকাত আছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গত বছরের ৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হওয়াকে ব্যাংক ডাকাতি বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একশ্রেণির লোক আছেন, যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছেন, ব্যাংকের টাকা ডাকাতি করেছেন। আমরা তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যাঁরা ব্যবসা করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সহায়ক ভূমিকা দেখতে চাই।’
সুদ হার কেন বাড়ে সেটি বিশ্লেষণ না করে কেবল নির্দেশ দিয়ে তা কমানো যায় না। সুদ হার বাড়ার অনেক কারণ আছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে আছে তারল্য সংকট। কোনো কোনো ব্যাংকতো ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানই সংগ্রহ করছে। অনেক ব্যাংকের ঋণ–আমানতের সুদের হারে পার্থক্য প্রায় ৮ শতাংশ। এই তারল্য সংকটের সমাধান না করলে সুদের হার কখনোই কমবে না। কারণ এখন সুদ হার নির্ধারণ করে বাজার, চাহিদা–যোগানের ভিত্তিতে। তারপরেও সুদ হার কিছু কমানো সম্ভব। তবে এ জন্য খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। খেলাপি ঋণ কমলে ব্যাংকগুলো অন্তত আরও এক থেকে ২ শতাংশ হারে সুদ কমাতে পারতো। আর খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ঋণ খেলাপিদে বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি উলটোটা। বরং ঋণ খেলাপিদের আরও সুযোগ–সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ধরে নিই ঋণের সুদ হার ১২ শতাংশ। এই হারে ঋণ নিলে উদ্যাক্তাকে ব্যাংককে ফেরত দিতে হবে সবমিলিয়ে ১৩ শতাংশ বা এরচেয়ে বেশি হারে। আর যদি খেলাপি হয় তাহলে দিতে হবে ৯ শতাংশ হারে, তাও দীর্ঘ সময় ধরে। এই সুবিধা আগামি মে মাস থেকে কার্যকর হবে বলে অর্থমন্ত্রী ঘোষনা দিয়েছেন। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে আর ব্যাংককে ঋণ ফেরত দিতে আসবে।
এবার বাণিজ্যমন্ত্রী আপনিই বলুন, ব্যাংকের আসল ডাকাত কারা।
১৩ এপ্রিল ২০১৯
![]()
