মৃত্যু নিয়ে ৫ সিনেমা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 4 minutes

মেক্সিকান পরিচালক, জীবনে মাত্র চারটি ছবি করেছেন। আর এই চার ছবি দিয়েই নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। বলা যায়, নতুন একটি ধারা তৈরি করেছেন। তিনি আলেজান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু। চার ছবির তিনটি আবার একই ধারার। বিষয়বস্তু মৃত্যু। ডেথ ট্রিলোজি। সিনেমায় গল্প বলার রীতি একটু আলাদা। একসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা এগিয়ে যায়, শেষটি হয় একবিন্দুতে। এর নাম হচ্ছে হাইপার লিঙ্ক সিনেমা। মজার ব্যাপার হলো, হাইপার লিঙ্ক সিনেমার ধারণাটা শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমা দিয়ে। ইনারিতু প্রথম মেক্সিকান পরিচালক, যিনি প্রথমবার একাডেমির জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। আর সেই ছবি হলো, অ্যামোরেস পেররোস, মেক্সিকোর ছবি, ভাষা স্প্যানিস। ডেথ ট্রিলজির প্রথম ছবি। এর পরের ছবিটি তিনি হলিউডে গিয়ে করেন, ২১ গ্রামস। আর ট্রিলজির শেষ ছবি বাবেল। ইনারিতুর শেষ ছবি বিউটিফুল, ট্রিলজির বাইরে।

অ্যামোরেস পেররোস
২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিকে বলা হয় মেক্সিকান পাল্প ফিকশন। তিনটি ঘটনা মিলিয়ে এই ছবি। শুরুটা ভয়ংকর এক গাড়ি দুর্ঘটনা দিয়ে। মূলত এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পুরো ছবি।

220px-Amores_perros_poster.jpg


প্রথম ঘটনা অক্টাভিয়া ও সুজানাকে নিয়ে। সুজানা অক্টাভিয়ার ভাইয়ের স্ত্রী। অক্টাভিয়া সুজানাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চান, এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। অক্টাভিয়া জড়িয়ে পড়েন কুকুরের লড়াইয়ে। পোষা কুকুরটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এই লড়াইয়ে। এ নিয়ে দ্বন্দ্বে একজনের শরীরে ছুরি চালিয়ে পালান অক্টাভিয়া, পথে ঘটে দুর্ঘটনা।
পরের কাহিনি ড্যানিয়েল আর ভেলেরিয়ার। বিবাহিত ড্যানিয়েল একজন সফল ম্যাগাজিন প্রকাশক আর ভেলেরিয়া সফল মডেল। ড্যানিয়েল আগের সংসার ছেড়ে চলে আসেন ভেলেরিয়ার কাছে। ওই দিনই ভেলেরিয়া বাইরে গেলে পথে ঘটে দুর্ঘটনাটি। পঙ্গু হন ভেলেরিয়া। তৃতীয় ঘটনা সাবেক গেরিলা আর একসময়কার ভাড়াটে খুনি এল ছিবোর। সেও জড়িয়ে পড়ে এই দুর্ঘটনার সঙ্গে।
অ্যামোরেস পেররোস ক্লাসিক মর্যাদা পাচ্ছে বলাই যায়। অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার ছবির পুরস্কার না পেলেও এর ভাগ্যে বাফটাসহ অসংখ্য পুরস্কার জুটেছে। মোট কথা, এই একটি ছবিই পরিচালককে সারা বিশ্বে পরিচিত করেছে।

২১ গ্রামস

ইনারিতু হলিউডে চলে যান ২০০৩ সালে। সেখানেই তৈরি করেন ডেথ ট্রিলজির তৃতীয় ছবি ২১ গ্রামস। বলা হয়, মানুষের মৃত্যু হলে নাকি ওজন ২১ গ্রাম কমে যায়। এ কারণেই এই ছবির নাম ২১ গ্রামস। ছবিটির কাহিনির মূল যোগসূত্রও দুর্ঘটনাকে ঘিরে। অভিনয়ে আছেন শন পেন, নোয়ামি ওয়াটস আর বেনিসিও ডেল তোরো।

220px-21_grams_movie.jpg


ডেল তোরো জেল খেটে বের হওয়া মানুষ, যিনি ধর্মের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছেন। মৃত্যুর পথে থাকা শন পেন অঙ্কের শিক্ষক, যাঁর হার্ট বদল না হলে বাঁচার আশা নেই। স্বামী আর দুই মেয়ে নিয়ে নোয়ামি ওয়াটসের সংসার। ডেল তোরোর গাড়ির ধাক্কায় মারা যায় নোয়ামির দুই মেয়ে, স্বামীর মৃত্যুর আগে হার্ট দিয়ে দেন শন পেনকে। এভাবেই এক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায় তিনজন। বাড়তে থাকে সম্পর্কের জটিলতা। ২১ গ্রামস-এর পুরস্কারভাগ্যও খুব খারাপ নয়।

বাবেল

মরক্কোর দক্ষিণে মরুভূমি এলাকায় মেষপালক আবদুল্লাহ একটা শক্তিশালী রাইফেল কিনলেন হাসানের কাছ থেকে। শিয়াল তাড়ানোই মূল উদ্দেশ্য। আবদুল্লাহর দুই ছোট ছেলে ইউসুফ ও আহমেদ সেই রাইফেল দিয়ে মেষ পাহারা দেয়। আহমেদের সন্দেহ এই রাইফেলের গুলি তিন কিলোমিটার পর্যন্ত যাবে না। ইউসুফ গুলি করে দেখিয়ে দিল যে গুলি এর চেয়েও বেশি দূরে যায়। দূরের রাস্তায় তখন যাচ্ছিল পশ্চিমা পর্যটকদের নিয়ে একটি বাস। গুলি লাগল সানডিয়াগের সুসানের গলার কাছে। সঙ্গে তাঁর স্বামী রিচার্ড।

220px-Babel_poster32.jpg


মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল সেই সংবাদ। মার্কিন প্রশাসন তাদের নাগরিকের ওপর এটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করল। তৎপর হলো পুলিশ। শুরু হলো নতুন কূটনৈতিক জটিলতা। হাসানকে রাইফেলটি উপহার দিয়েছিলেন আরেক জাপানি পর্যটক ইয়াসুজিরো, হাসান ছিলেন তাঁর গাইড। ইয়াসুজিরোর একটি মেয়ে আছে, সে মূক ও বধির। ওই রাইফেল নিয়ে শুরু হলো আরেক জটিলতা।
ক্যামেরা আবার চলে যায় সান ডিয়াগোতে। সুসান ও রিচার্ডের যমজ সন্তান। মেক্সিকান এমেলিয়া তাঁদের হাউসকিপার। এমেলিয়ার ছেলের বিয়ে মেক্সিকোতে। যেতেই হবে, বাচ্চাদের রেখেও যেতে পারছেন না। মাথায় কী ঢুকল, ওদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন মেক্সিকোয়। ফিরতে গিয়ে পড়লেন ঝামেলায়। মরুভূমির মধ্যে এমেলিয়া হারিয়ে ফেললেন দুই বাচ্চাকে।
চার জায়গার এ রকম কিছু চরিত্র। তারা আবার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এটাই ইনারিতুর ডেথ ট্রিলজির শেষ ছবি। বাবেল অস্কারের জন্য সাতটি মনোনয়ন পেয়েছিল। গোল্ডেন গ্লোবে সেরা ছবি হয়েছিল। ব্রাড পিট আর কেট ব্লানচেট মূল ভূমিকায়। ২০০৬ সালের সিনেমা।

তবে আমার কাছে প্রথমটিই সেরা। এই লেখাটা ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতে। এ কারণে এই লেখাটায় নতুন দুটি সিনেমা নাম দিয়ে লেখাটি পূর্ণাঙ্গ করছি। বাকি দুই ছবির বিষয়বস্তুও মৃত্যু।

এ শর্ট ফিল্ম এবাউট কিলিং: পোলিশ পরিচালকের ক্রিস্তফ কিওলস্কির ‘আ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট কিলিং’ এক কথায় অন্যধরণের এক ছবি। বিষয়বস্তু মৃত্যু। দুটি মৃত্যুর ঘটনা ছবির বিষয়বস্তু। মাত্র তিন চরিত্রের সিনেমা। ঠান্ডা মাথার এক হত্যাকান্ড আর বিচার করে ফাঁসিতে ঝোলানোর মতো রাষ্ট্র কর্তৃক হত্যাকান্ডের মধ্যে যে আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নেই সেটিই বুঝিয়েছেন পরিচালক।

220px-ShortFilmAboutKilling.jpg


প্রথশ পর্বে জ্যাক কোনো কারণ ছাড়াই একজনকে খুন করে। ঠান্ডা মাথায় নৃসংশ হত্যাকান্ড। জ্যাক ধরা পরে। তার ফাঁসি হয়। দর্শক হিসেবে মমতা খানিকটা চলে যায় জ্যাকের প্রতি। চিত্রনাট্য এমনই যে, দর্শক ভুলে যায় জ্যাকের করা হত্যাকান্ডটির কথা।
প্রথম হত্যাকান্ডটি ৭ মিনিটের আর পরেরটি ৫ মিনিটের। কোনটি বেশি নির্মম সেটিও ভাবাবে আপনাকে।

ডেড ম্যান ওয়াকিং: মৃত্যুদন্ড নিয়ে আরেকটি ছবি। শওশাঙ্ক রিডেমশনের মূল অভিনেতা টিম রবিনস এর পরিচালক। অভিনয়ে সুসান সারানডন ও শেন পেন। ১৯৯৫ সালে এই ছবি থেকে সুসান সেরা অভিনেত্রির অস্কার পেয়েছিলেন।

220px-Deadmanwalkingp.jpg


শেন পেনের মৃত্যুদন্ড হয়েছে। অপরাধ সে এবং আরেকজন মিলে দুজনকে খুন করেছে। ছেলেটিকে মারা হয় আর মেয়েটিকে রেপ করে তারপর হত্যা। অভিযোগ প্রমান হলেও সঙ্গীর হয় কেবল জেল আর শেনে পেনের মৃত্যুদন্ড। কারণ শেন পেনের পক্ষে বড় আইনজীবি ছিল না।
সুসান অর্থাৎ সিস্টার হেলেন দেখা করে শেন পেনের সঙ্গে। মৃত্যুদন্ড ঠেকাবার চেষ্টা করে হেলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। আস্তে আস্তে বিশেষ এক সম্পর্ক গড়ে উঠে দুজনের মধ্যে।
পুরো সিনেমাটা মৃত্যুদন্ডকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আছে অনেকগুলো নাটকীয় মোড়। এই সিনেমাটিই শেন পেনকে অভিনেতা হিসেবে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি এনে নেয়। শেন পেন পরিচিতি পান একজন সিরিয়াস অভিনেতা হিসেবে।

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.