web analytics

সাংবাদিকদের লেখালেখি, সাংবাদিকদের পড়াশোনা


Reading Time: 3 minutes

১.
প্রমথনাথ বিশী শান্তিনিকেতনে পড়তেন। অঙ্কে ভালো ছিলেন না। একবার পরীক্ষার খাতায় লিখে দিলেন,
হে হরি হে দয়াময়,
কিছু মার্ক দিয়ো আমায়।
তোমার শরণাগত
নহি সতত
শুধু এই পরীক্ষার সময়।
অঙ্ক করাতেন নগেন আইচ। তিনি খাতাটা নিয়ে গেলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি পড়ে বললেন, উদ্যত অঙ্কপত্রের সামনে কজন প্রবীণ কবি এমন কবিতা লিখতে পারে! ওকে অঙ্ক কষাতে চেষ্টা কর, তবে কবিতা লেখায় বাধা দিয়ো না।
এই প্রমথনাথ বিশী বড় হয়ে লিখলেন ‘রবীন্দ্র-কাব্য প্রবাহ’। তাতে একটি অধ্যায় আছে-রবীন্দ্রনাথের দোষ: অতিকথন ও সামান্যকথন।বাঙালি মাত্রই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও পারেননি। তিনি এতটাই উত্তেজিত হয়েছিলেন যে প্রমথ নাথের একটি উপন্যাসের পাতায় মার্জিনে মার্জিনে লিখেছিলে, ইহা কি অতিকথন নয়? ইহা কি সামান্যকথন নয়?
প্রমথনাথ বিশী আনন্দবাজারে বেশ কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন। চার বছর সহকারী সম্পাদক ছিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে তিনি বাংলার অধ্যাপক হলেন। একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘মূর্খের পাণ্ডিত্য ও পণ্ডিতের মূর্খতা দেখেছি দুই জায়গায়। সংবাদপত্রের জগতে দেখেছি মূর্খের পাণ্ডিত্য, কিছু না পড়েও তারা সব জানে, সবজান্তার দল। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি পণ্ডিতের মূর্খতা।’
প্রমথনাথ বিশীর লাল কেল্লা নামের খুব বিখ্যাত একটা উপন্যাসও আছে। সুতরাং সাহিত্য নিয়েও কিন্তু বলেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘না ভাবিয়া লিখিলে জার্নালিজম, ভাবিয়া লিখিলে সাহিত্য।’
২.
তবে সাংবাদিকেরা পণ্ডিত হবেন এমনটি কোথাও লেখা নেই। তাহলে তো আমরা সাংবাদিক হতাম না, অধ্যাপকই হতাম। তবে এটা সত্যি যে সাংবাদিক একবার হয়ে গেলে পড়ার কোনো বিকল্প নেই। রওশন এরশাদের কথা মেনে নিলাম না হয়।কিন্তু যেভাবেই হোক, একবার সাংবাদিকতার চাকরি শুরু করলে এরপর পড়ার কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে শেষ বিচারে প্রমথনাথ বিশীই সত্যি হয়ে থাকবেন।
অনেকেই প্রশ্ন করেন কি পড়বেন? উত্তর একটাই। সবকিছু।শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর কিশোর উপন্যাস সমগ্রের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘মাতৃভাষা না-জানাটা বা সাহিত্য না-পড়াটা মানুষের মেধার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের পক্ষেও সহায়ক নয়।’ আসলে কেবল সাংবাদিক কেনো, পড়াটা সবার জন্যই।
৩.
সাংবাদিকতা করি অনেক দিন। সুতরাং নিজের এবং অপরের অর্থাৎ মূর্খের পাণ্ডিত্য দেখছি অনেক দিন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে গিয়েছিলাম। ভাবলাম এবার আমি তাহলে পণ্ডিতের মূর্খতা দেখানোর দলে চলে আসলাম। কিন্তু পোড়া কপাল, এখানেও আমি সেই মূর্খের পাণ্ডিত্য দেখানোর দলেই থেকে গেলাম।


সবাই যে আমার দলে তা নয়। অনেকেই লেখাপড়া করেন, অসম্ভব ভালো লেখেনও। মূর্খ থেকে গেলাম আমি ও আমাদের কেউ কেউ। সাংবাদিকের লেখা তিনটি বই পড়া হলো পরপর। একটি হচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টার সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের একাল-সেকাল। আরেকটি হলো পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ডেটলাইন ঢাকা এবং হামদি বে এর বে অফ বেঙ্গল।
একাল-সেকাল মূলত সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের সাংবাদিক জীবন নিয়ে লেখা। রিপোর্টের মতো করেই লেখা, এর ভাষা বা শিল্পমূল্য নিয়ে আলোচনার কিছু নেই। তবে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। অনেক মজার তথ্য, ঘটনা ও সংবাদের পেছনের খবর জানতে পারা যায়। জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতির যে বর্ণনা তা থেকেও শেখার আছে অনেক কিছু। যারা সাংবাদিকতা করেন বা সাংবাদিকতা নিয়ে আগ্রহ আছে তারা পড়তে পারেন।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় ১৯৭১ সালে আনন্দবাজারে ওয়্যার করসপনডেন্ট ছিলেন। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ছিলেন, অনেক কিছুই দেখেছেন। সুতরাং এই বইটির আবেদন একদমই অন্যরকম। পথে পথে দেখা অনেক কিছুরই বিবরণ আছে এখানে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আত্মসমর্পণের ঠিক পর পর তিনি ছিলেন সে সময়ের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে। হোটেলটি ছিল রেডক্রসের অধীনে। মালেক মন্ত্রিসভার অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে। ছিল কূটনীতিকেরাও। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা অন্য কেউ লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই।সেই অর্থে বিশেষ একটি গ্রন্থ ডেটলাইন ঢাকা।
তবে ভাষা বা শিল্পগুণ-দুই দিক থেকেই মনে রাখার মতো বই হচ্ছে হামদি বে-এর বইটি। কি এই হামদি বে? কেউ কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন। কালি ও কলম-এ হাসনাত ভাই (আবুল হাসনাত) হামদি বে নিয়ে একটি মনোগ্রাহি লেখা লিখেছিলেন। সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করি।
‘উর্দুভাষী এই মানুষটির জন্ম হয়েছিল ১৯১৫ সালে বিহারের ছাপড়ায়। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন পাটনা কলেজে। সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হয় রয়টারে। দেশ বিভাজনের পর অভিভাবকেরা চলে গেলেন পাকিস্তানে। তিনি থেকে গেলেন ভারতে। তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করেছিলেন কোনো সৃজনশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, ঔদার্যগুণসম্পন্ন মানুষের জন্য পাকিস্তান আদর্শ রাষ্ট্র নয়, পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা কোনো উদারনৈতিক ভাবের জন্ম দেবে না। তিনি চল্লিশের দশকে সেই বিহার থেকে এই মনোভঙ্গি ধারণ করে যে শিকড়হীন হলেন তার জন্য কোনোদিন অনুতাপ করেননি। কলকাতা তাঁকে যে নির্ভরতা, প্রশান্তি ও বন্ধুবৃত্ত দিয়েছিল, তা হয়ে উঠেছিল তাঁর বেঁচে থাকার জন্য পরম সহায়।……….গড়পড়তা মানুষের বাইরে এবং মনেপ্রাণে সাহিত্য-অন্তপ্রাণ হামদি বে। কিন্তু মূলত ডাকসাইটে এক সাংবাদিক, ইংরেজি সাংবাদিকতায় কত না তাঁর অর্জন! স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতবর্ষের সর্বাধিক খ্যাতিমান ও আলোচিত দুই সংবাদপত্র টাইমস অব ইন্ডিয়া আর দ্য স্টেটসম্যানে কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে কাজ করেছেন বাংলা দৈনিক আজকালে।’
আজকালে কাজ করলেও তিনি লিখতেন ইংরেজিতে। সেগুলো অনুবাদ করে প্রকাশ করা হতো। তাঁর মোট ৬৬টি লেখা নিয়ে বই ‘বে অফ বেঙ্গল’। তিনি কি নিয়ে লিখেছেন তা বলার চেয়ে বরং বলা যায় কি নিয়ে লেখেননি।বইটির ভূমিকায় তিনি নিজে লিখেছেন কীভাবে গৌরকিশোর ঘোষ তাঁকে আজকালে নিয়ে এসেছিলেন। বলেছেন তিনি সে সময়ে একটিই বাংলা ছড়া জানতেন।
‘গৌরকিশোর ঘোষ
পোষে বুনো মোষ’
বলাই বাহুল্য এই বুনো মোষ হামতি বে নিজেই। যদিও হামদি বে লিখেছেন, ‘আমার জন্ম বিহারে, ভাষা ইংরেজি, আর ভালোবাসা বাংলা’।

Loading

রেটিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *