Reading Time: 4 minutes
আমরা ১২ জন জড়ো হয়েছি বার্লিনের এক রেস্তোরাঁয়। উদ্দেশ্য পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। হোটেল থেকে পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে এসেছে জার্মান যুবক রিক। জার্মানির অর্থনীতি, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দেখার জন্য আমন্ত্রণটা ছিল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। তবে আমাদের সবকিছু ঘুরে দেখানোর দায়িত্ব পেয়েছে অরকা অ্যাফেয়ার্স নামের একটি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান। রিক অরকার একজন নবীন কর্মকর্তা। তারিখটা ছিল ১০ সেপ্টেম্বর।
পরিচয়পর্বের অঘোষিত নিয়ম হচ্ছে নিজের নাম ও পরিচয় তো বলতে হবেই, সঙ্গে বলতে হবে ডাকনাম, থাকলে ওই নামের অর্থ। আমাদের দলে নাতাশা বা নাতালিয়া কাজাখস্তানের মেয়ে, সেখানকার এক বার্তা সংস্থায় কাজ করে। ভিয়েতনামের থু হাংয়ের ডাকনাম মুন। ভিয়েতনাম নিউজ এজেন্সির ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক নিউজের ডেপুটি প্রধান। তাইওয়ানের কারিনাও সাংবাদিক, সেখানকার ইউনাইটেড নিউজ এজেন্সির লাইফ স্টাইল বিভাগে কাজ করে। দলে সাংবাদিক আমরা আরও দুজন, বাংলাদেশের। আমিনুল ইসলাম নিউ এজ-এর, আমি প্রথম আলোর। আমিনুলের ডাকনাম মিঠু, কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল মি টু, মি থ্রি, মি ফোর—এ রকম।
লাটভিয়ার লিভা সাংবাদিক না, দ্য রেড জ্যাকেট নামের এক এনজিওর কর্মী। রোমানিয়ার মুগুর বুখারেস্টে স্থাপত্য নিয়ে একটি ম্যাগাজিন চালায়। মুগুরকে আমরা বাংলায় এর অর্থ বোঝালাম। রিকার্দো এল সালভাদরের একজন ডিজাইনার। সার্বিয়া থেকে আসা একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার কালচারাল এডিটর হচ্ছে দ্রাগন। জানা ফেরারি এসেছে স্লোভাকিয়া থেকে, সেখানকার সেন্টার ফর ফোক আর্টের বিপণন ও জনসংযোগ বিভাগ দেখে। অরকা অ্যাফেয়ার্স থেকে গাইড হিসেবে আরও আছে এক জার্মান তরুণী, তার নামই হলো জানিনা। বাংলায় জানিনা অর্থ বলতেই খুশি হয়ে বলল, ‘ভালোই হলো, কেউ কিছু জানতে চাইলেই বলব, জানিনা।’ স্লোভাকিয়ার জানা আর জার্মানির জানিনা—দুজনেরই ডাকনাম জানু। বাংলায় এর অর্থ বলতে একটুও দেরি করলাম না।
এর পরের ছয়টা দিন আমাদের মূল কর্মসূচি ছিল বার্লিন আর ড্রেসডেন শহরের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সফর ও নানা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা। বাকি সময়টা শহর দেখা আর আড্ডা। এই লেখা মূলত আড্ডা নিয়েই। নানা কর্মসূচি থাকার কারণে দুপুরে খাওয়ার সময় আড্ডাটা জমতে না জমতেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু রাতের আড্ডার সময়সীমা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল খুবই কম।
দশজনের নয়টি দেশ। প্রায় সবারই একটি অতীত আছে। এল সালভাদরে ছিল গৃহযুদ্ধ, লাটভিয়া ও কাজাখস্তান একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। স্লোভাকিয়া ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার অংশ আর সার্বিয়া যুগোস্লাভিয়ার অংশ। রোমানিয়ার অতীত বলতে চসেস্কুর শাসন আর ভিয়েতনাম গর্ব করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে।
তাইওয়ানের কারিনাকে বললাম, ‘তোমাকে তো আমার দেশে আমন্ত্রণ জানানো যাচ্ছে না। কারণ, তাইওয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।’ রোমানিয়ার একটা সিনেমা আমার খুবই প্রিয়, ফোর মান্থস, থ্রি উইকস অ্যান্ড টু ডেজ। নিকোলাই চসেস্কুর আমলে (১৯৬৫-৭৯) জনসংখ্যা বাড়াতে রোমানিয়ায় গর্ভপাত নিষিদ্ধ ছিল। সিনেমাটি অবৈধ গর্ভপাত নিয়ে। মুগুরকে সিনেমাটির প্রতি ভালো লাগার কথা জানালাম। মুগুর হেসে বলল, ‘চসেস্কুর শাসনামল রোমানিয়ার জন্য একটা কালো অধ্যায়। আমরা সেটা ভুলতেও চাই। কিন্তু এটাও ঠিক, নিজের এই জীবনের জন্য তাঁর কাছে আমার ঋণ আছে। কারণ, আমি পরিবারের ছোট ছেলে। গর্ভপাত নিষিদ্ধ না থাকলে আমি হয়তো পৃথিবীতে আসতেই পারতাম না।’

গল্পে–আড্ডায় কেটেছে সময়কাজাখস্তানের নাতাশার এটাই প্রথম ইউরোপে আসা। সবকিছুতেই তার উৎসাহ। পথ চলতে বিভিন্ন স্থানে ক্যাসিনো দেখে অবাক। তবে ক্যাসিনো না, নাতাশা রাতে যেতে চায় ডিস্কোবারে, নাচবে। অন্যরা অবশ্য খুব আগ্রহ দেখাল না। কিন্তু নাচার সুযোগ পাওয়া গেল ওই রাতেই। দ্বিতীয় রাতে আমরা গেলাম শহরের ঐতিহ্যবাহী এক রেস্তোরাঁয়। ভবনটি অনেক পুরোনো, রেস্তোরাঁর ঐতিহ্যের বিবরণ আছে খাবারের মেনুর সঙ্গেই। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে একটা ড্যান্স ফ্লোর আছে। নাতাশা সুযোগটি ছাড়বে কেন? সবাইকে টেনে নিয়ে গেল ফ্লোরে। আমরা কেউ কেউ দু-এক মিনিট হাত-পা ছুড়ে টেবিলে ফিরে এলাম, অন্যরা চুটিয়ে নাচল অনেকটা সময়।
আমাদের সেরা আড্ডাটা হয়েছিল আসলে ড্রেসডেনে, রাতে ইতালীয় এক রেস্তোরাঁয়। বন্ধুরা এক হলে এখানেও যেমন হা-হা হি-হির যন্ত্রণায় বাকি অতিথিদের মধ্যে পালাই পালাই ভাব থাকে, সেটিই আবার দেখতে হলো ওই রাতে। যে যার মতো বসার পর দেখা গেল রিকার্দো বসেছে মূলত মেয়েদের মাঝখানে। নিজের দেশে রিকার্দোকে ঝামেলায় ফেলতে মেয়েরা আরেকটু ঘন হয়ে বসে একটি ছবিও তুলে ফেলল। আড্ডাটা জমিয়ে তুলল এই রিকার্দোই। প্রত্যেককে বলতে হবে কে কখন কাঁদে। দ্রাগন কেঁদেছে টম হাঙ্কের ফিলাডেলফিয়া সিনেমা দেখে। লিভা খুব খুশির খবরে হাসতে হাসতে কেঁদে দেয়। রিকার্দো যে গানটি শুনলে কেঁদে দেয়, সেটি দুই লাইন শুনিয়েও দিল। জানা প্রতি মাসে একবার নিয়ম করে কাঁদে, কোনো কিছু না ঘটলেও। জানিনাও অনেকটা তাই। তবে অন্য কাউকে কাঁদতে দেখলেই তার কান্না পায় বেশি। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডার পরও যখন কেউই উঠছি না, তখন রেস্তোরাঁর ওয়েট্রেস মেয়েটা আমাদের সবাইকে ‘গ্রিটিংস ফ্রম ড্রেসডেন’ লেখা স্যুভেনির দিল। হয়তো ভেবেছে, এবার যদি উঠি।

সবার স্বাক্ষরড্রেসডেন থেকে বার্লিনে ফেরার পথে মনে হলো পিকনিকে যাচ্ছি, জানা আর রিকার্দো গলা ছেড়ে গাইল। নাতাশা এবার ভয়েস রেকর্ডার সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ‘ধন্যবাদ’, ‘বিদায়’ ও ‘আই লাভ ইউ’—সবাইকে যার যার ভাষায় বলতে হবে। দেখা গেল, আই লাভ ইউর বাংলাই অপেক্ষাকৃত লম্বা, বেশি সময় ধরে বলতে হয়। পুরোটা শুনে জানার মন্তব্য, ‘এত লম্বা, ততক্ষণে তো বান্ধবী চলে যাবে।’ আমি বললাম, ‘বরং, পুরোটা শোনার জন্যই আমাদের দেশের মেয়েরা অপেক্ষা করে।’
শেষ রাতে বিদায়ী ডিনার ছিল শহরের সবচেয়ে বড় গ্রিক রেস্তোরাঁয়। রিকার্দো দুটি স্যুভেনির বোতল নিয়ে এসেছে। সাদা কাগজে আমরা সবাই যার যার ভাষায় ‘ধন্যবাদ’ কথাটা লিখে উপহার দিলাম রিক আর জানিনাকে। নাতাশা সবাইকে একটি করে চকলেট দিল। তারপর সবার কাছে বিদায় নেওয়া। সেটা চলল পরের দিন হোটেল ছেড়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। নয় দেশের বিদায় নেওয়ার রীতি ভিন্ন ভিন্ন। সেই বর্ণনা এখানে আর না দিই।
১৬ সেপ্টেম্বর, যে যার পথে। আমি যাব নেদারল্যান্ডসে, ট্রেনে। সাত ঘণ্টার পথ। অভিজ্ঞতা ছিল না বলে ট্রেন ছাড়ার পরেই বুঝলাম বিপদটা কোথায়। উঠেই দেখি প্রায় সবাই খাবার নিয়েই ট্রেনে উঠেছে। একা আমি অভুক্ত। ১২টায় ট্রেন ছেড়ে আমস্টারডাম পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৭টায়। ২টার দিকে খাবারের সন্ধানে বের হলাম। সামনের দিকে খাবারের জায়গা আছে ঠিকই, তবে সেখানে নানা ধরনের পানীয়ই বেশি। ভাষার কারণে কিছু খাবারের অর্থই বের করতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত পাঁচ ইউরো দিয়ে যা নিলাম, তা আসলে সালাদ। পেট ভরল না। মনে হলো, সালাদ বরং হজমেই বেশি সাহায্য করেছে। ক্ষুধায় মৃতপ্রায় হয়তো না, তবে অবশ্যই কাছাকাছি। বিকেলের দিকে হঠাৎ মনে পড়ল নাতাশার দেওয়া বিদায়ী চকলেটটা তো ব্যাগেই আছে। শেষ পর্যন্ত সেই চকলেটই আমার জীবনটা খানিকটা বাঁচাল বলা যায়। নাতাশাকে এটা বলতে হবে, হয়তো আর কখনো বলা হবে না।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭
![]()

Comment
মুগ্ধ হলাম যথারীতি! এমন আনন্দ আরো আনন্দিত হওয়ার লোভ বাড়ায়!
অপেক্ষায় রইলাম!
থ্যাংকস, পড়লেন এবং মন্তব্য করলেন বলে
আপনার এই ব্লগ খুঁজে পাওয়া আমার একটা বড় আবিষ্কার।
এতো কঠিন হলো কেনো? যদিও আপনার নাম নেই বলে চিনতে পারছি না