web analytics

পাঁচ বছর পর স্বামী কেন আসামি


Reading Time: 5 minutes

একটা ভালো সিনেমার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে ভালো গল্প। অভাব তো এখানেই। ভালো গল্পের অভাব মনে হয় কিছুটা ঘুচল। যেমন, স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার দায়ে বাদী ও স্বামী বাবুল আক্তার গ্রেপ্তারের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এর মধ্যে সিনেমা তৈরির উপযোগী দারুণ এক গল্পের সন্ধান পেয়েছেন। রীতিমতো পর্দা কাঁপানো থ্রিলারের সব ধরনের উপকরণই এই গল্পে আছে। এমনকি কেউ কেউ তো স্ত্রী খুনের পর কান্নায় ভেঙে পড়া বাবুল আক্তারের ছবি শেয়ার দিয়ে সেরা অভিনেতার অস্কারও দিয়ে দিয়েছেন। সবাই মোটামুটি একমত যে বাবুল আক্তার-কাহিনি সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে এবং বাবুল আক্তারের মতো অভিনয় কারও পক্ষেই করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে টানা ৬ মাস সন্তানসম হয়ে থাকার অভিনয় ফুটিয়ে তোলাটা কঠিনই হবে।

ইনভেস্টিগেশন অব আ সিটিজেন এভাব সাসপিশন সিনেমার দৃশ্য

চিত্রনাট্যের মিল

মুশকিল অবশ্য একটা আছে। চিত্রনাট্য লেখা হয়ে গেলে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই কেউ কেউ হা রে রে রে করে ছুটে আসবেন। বলবেন, নকল! নকল! তাঁরা বলবেন, এ ধরনের কাছাকাছি গল্প বা সিনেমা আরও আছে। যেমন ধরেন, ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ইতালির ছবি ইনভেস্টিগেশন অব আ সিটিজেন এভাব সাসপিশন। এই সিনেমাটি বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্রের অস্কার পেয়েছিল। এটিও এক পুলিশ কর্মকর্তার কাহিনি। সদ্য পদোন্নতি পাওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা তার বান্ধবীকে খুন করে। তার অধীনস্থ এক পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত শুরু করে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী খুনি সেই পুলিশ কর্মকর্তা নানা ধরনের ক্লু বা সূত্র ধরিয়ে দিতে থাকেন। দেখতে চাচ্ছিলেন তাঁকে আসলেই ধরতে পারে কি না।

খুনি পুলিশটির ধারণা ছিল তিনি এমনভাবে খুনটা সাজিয়েছেন যে সূত্র ধরিয়ে বা সূত্রের ইঙ্গিত দিলেও তাকে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তে হবে না। আর নিজেই যেচে সূত্র দিচ্ছেন বলে তিনি সন্দেহের ‍ঊর্ধ্বেই থাকবেন। এমনকি তিনি অন্য চরিত্রদেরও সামনে নিয়ে আসেন সম্ভাব্য খুনি হিসেবে, যাতে সন্দেহ অন্যদিকে ঘুরে যায়। এর মধ্যে একজন ছিলেন বাম বিপ্লবী রাজনীতি করা এক ছাত্র। বাবুল আক্তার অবশ্য সন্দেহভাজন হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন জঙ্গিদের। বাবুল আক্তারের সঙ্গে পার্থক্য ছিল এখানেই।

হিচককের গল্পের মিল

রহস্য-রোমাঞ্চ থাকবে, আর রহস্য-রোমাঞ্চ সিনেমার সম্রাট আলফ্রেড হিচকক থাকবেন না, তা তো হয় না। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া ডায়াল এম ফর মার্ডারকে বলা হয় হিচককের অন্যতম সেরা সিনেমা। এর রিমেক বা অনুপ্রাণিত সিনেমার সংখ্যাও কম না। গল্পটা ছোট করে বলি।

সাবেক টেনিস চ্যাম্পিয়ন টনি বিয়ে করেছে সম্পদশালী মার্গোটকে। মার্গোটের সঙ্গে আবার আগে সম্পর্ক ছিল রহস্য উপন্যাস লেখক মার্কের সঙ্গে। মূলত, অর্থের লোভে স্ত্রীকে হত্যার ছক আঁকেন টনি। খুঁজে বের করেন পুরোনো সহযোগী সোয়ানকে। এক হাজার ডলারের বিনিময়ে খুন করতে রাজিও হন সোয়ান।

ডায়াল এম ফর মার্ডার সিনেমার পোস্টার

খুন করার পরিকল্পনাটি ছিল অসাধারণ, যাতে ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ নিজের ওপর না আসে। বাবুল আক্তারের সঙ্গে গল্পের পার্থক্য এখানেই। কেননা, খুন করতে এসে মার্গোটের হাতে নিজেই খুন হয়ে যান সোয়ান। খুনের আসামি হন মার্গোট। সন্দেহের সম্পূর্ণ বাইরে থেকে যান টনি। কিন্তু হাবার্ড নামের পুলিশের চিফ ইন্সপেক্টর হাল ছাড়েননি। টনির প্রতি সন্দেহের মূল কারণ কী ছিল জানেন তো? টনির অর্থ খরচের বহর। বাবুল আক্তারও কিন্তু ধরা পরেছেন তিন লাখ টাকা খরচ করতে গিয়েই। এই অর্থ তিনি খুনিদের দিয়েছিলেন স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে খুন করার কাজটি করার জন্য। কী, মিল পেলেন তো?

পুলিশের ভাবমূর্তি

পুলিশের ভাষ্য ঠিক ধরে নিলে খুন করেও বাবুল আক্তার টানা পাঁচ বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা বলেই ছাড় দেওয়া হয়েছে—এমন একটা ধারণা ছিল প্রায় সবার। অবশেষে গ্রেপ্তার হলেন তিনি। এ নিয়ে প্রথম আলোর অনলাইনে ‘যে প্রশ্নে আটকে গেলেন বাবুল আক্তার’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেখ সাবিহা আলম লিখেছেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বাবুল আক্তারকে ছাড় দেওয়ায় তাঁরা নিজেরাই পরিবারের কাছে ছোট হয়েছেন। পরিবার ও সমাজের কাছে এমন একটা বার্তা গেছে যে পুলিশ কর্মকর্তারা স্ত্রীকে খুন করলেও বিচার হবে না। তাঁদের দিক থেকেও ন্যায়বিচারের তাগাদা ছিল।’

তাহলে আবারও একটি সিনেমার পেছনের গল্প বলা যাক। অশোক কুমার অভিনীত ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া সংগ্রাম ছিল সে সময়ের তুমুল বক্স অফিস কাঁপানো সিনেমা। নবেন্দু ঘোষ ‘একা নৌকার যাত্রী’ নামের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘সংগ্রাম সিনেমার গল্পের নায়ক সুদর্শন, একজন সাধু পুলিশ অফিসারের ছেলে, কিন্তু বাল্যকালে মা মারা যাওয়ার ফলে সে গোল্লায় গেছে অতি-আদরের ফলে। মিথ্যা কথা বলে সে স্নেহপরায়ণ বাপকে শোষণ করে, মদের দোকান লুট করে, অসৎ আড্ডাতে গিয়ে জুয়া খেলে। সে একটি মেয়েকে ভালোবাসে এবং মেয়েটিকে তার বিবাহমণ্ডপ থেকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সে সেই মেয়েটিকে হত্যা করল, নিজের রিভলবারে চুমু খেল এবং যখন পুলিশ তাকে ধরতে এল তখন তাদের গুলি করল। সাংঘাতিক নিষ্ঠুর গল্প।’
সে সময়টায় এ ধরনের গল্প নিয়ে সিনেমা হতো না। কারণ হিংস্র নায়ককে দর্শকেরা গ্রহণ করত না। হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ‘অ্যাঙ্গরি ইয়ং ম্যান’-এর ভূমিকা নেওয়া সেই প্রথম। সংগ্রাম পর্দা কাঁপায়। ঘটনার শুরু কিন্তু এর পর থেকেই।

অশোক কুমারের সিনেমা সংগ্রাম

নবেন্দু ঘোষ লিখেছেন, ‘ষোলো সপ্তাহ হাউসফুল হওয়ার পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল। কারণ জনতা তখন পুলিশ দেখলেই হেসে বলতে আরম্ভ করেছে, যাও, দেখ গিয়ে অশোক কুমার কেমন করে জব্দ করেছে। তখন মোরারজি দেশাই মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর কানে এই খবর পৌঁছাল। অশোক কুমারকে ডাকা হলো। মোরারজি বললেন, আপনাকে দুটো কাজ করতে হবে, মি. অশোক কুমার। প্রথম, কাল থেকে সংগ্রাম মহারাষ্ট্রের সিনেমা হলগুলো থেকে তুলে নেবেন, ওটাকে আমরা নিষিদ্ধ করলাম আমাদের রাজ্যে। দ্বিতীয়, দয়া করে একটি ন্যায়পরায়ণ পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আপনার অস্তিবাচক নায়কত্বের ওপর জোর দিন।’

যাহোক, শেষ পর্যন্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যে বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার করে তাদের ‘অস্তিবাচক নায়কত্ব’-এর ভাবমূর্তি কিছুটা উদ্ধার করতে পেরেছে, সে জন্য ধন্যবাদ দিতেই হয়।

চিত্রনাট্যের বড় ফাঁক

থ্রিলারে একটা টান টান ভাব থাকে। চিত্রনাট্যে কোনো ফাঁকফোকর রাখা যায় না। থাকলেই গল্পটা দুর্বল হয়ে যায়। বাবুল আক্তার–কাহিনিতেও বড় একটা ফাঁক কিন্তু রয়েই গেছে। কাজ এখন সেই ফাঁক পূরণ করা। যেমন, ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের রাস্তায় খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। আমরা সবাই জানি, মিতু হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহ তিনেকের মধ্যেই সন্দেহভাজন খুনি হিসেবে বাবুল আক্তারের নাম এসেছিল। তারপর একদিন গভীর রাতে ঢাকার গোয়েন্দা কার্যালয়ে তাঁকে নিয়ে প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। এরপর বাবুল আক্তারকে পুলিশের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা জানানো হয় এবং তিনি ইস্তফা দেন। তখন থেকেই কিন্তু মিতুর বাবা মেয়ে হত্যার জন্য বাবুল আক্তারকে দায়ী করে আসছিলেন।

আর তখন থেকে পুলিশও জানত মিতু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কে। এমনকি মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসার সঙ্গে বাবুল আক্তরের সম্পর্ক, তাঁদের মধ্যে ‘বল তুই কোপালি কেন’—এই টেলিফোন আলাপ, এক রাতে মুসাকে পুলিশ পরিচয়ে ধরে নেওয়া এবং তারপর থেকে রহস্যময় নিখোঁজ—সবকিছুই সবার জানা ছিল। তারপরও বাবুল আক্তারকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেওয়া হয়েছে। এই শহরে একজন খুনি ঘুরে বেড়িয়েছেন সবার চোখের সামনে। জানা যায়, ওপরের নির্দেশ ছিল বলেই তদন্ত আর এগোয়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে বাবুল আক্তারকে এত দিন নিরাপত্তা কে দিয়েছে? বাবুল আক্তারকে ধরা যাবে না—এ নির্দেশ আসলে কার ছিল। পুলিশের বিশেষ কোনো প্রভাবশালী কর্মকর্তা? নাকি অন্য কারও? হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত বদল কেন, তাও তো জানাতে হবে। সুতরাং বাবুল আক্তারের এই মিত্রের সন্ধান পেলেই চিত্রনাট্যের শেষ ফাঁকফোকর বন্ধ হয় যাবে। তাহলেই কিন্তু তৈরি হয়ে যাবে দুর্দান্ত এক চিত্রনাট্য।

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২১

Loading

রেটিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *