পাপীরা দীর্ঘায়ু হয়, জোচ্চরের সম্পত্তি বাড়তে থাকে

  • 234
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    243
    Shares

Reading Time: 4 minutes

১.

ডানিয়েল এলসবার্গ একজন মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ঘটনা। কাজ করতেন সে সময়ের প্রতিরক্ষা সচিব রবার্ট ম্যাকনামারার সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। ভিয়েতনামে দুই বছর ছিলেনও এলসবার্গ। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সেটি বুঝতেন ম্যাকনামারাও। কিন্তু প্রকাশ্যে বলেননি কখনো। রাষ্ট্রও জানত, তারপরেও যুদ্ধ থেকে সরে আসেনি, সেনা পাঠিয়েছে বছরের পর বছর ধরে।

তবে ম্যাকনামারা ভিয়েতনাম নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বুঝতে একটি গবেষণা করিয়েছিলেন। শিরোনাম ছিল, ‘ইউনাইটেড স্টেটস-ভিয়েতনাম রিলেশনস, ১৯৪৫-১৯৬৭: এ স্টাডি প্রিপেয়ার্ড বাই দ্য ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স’। একেই বলা হয়, পেন্টাগন পেপার। তত দিনে এলসবার্গের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব প্রবল হয়ে উঠেছে। ১৯৭১ এর জুনে এলসবার্গ নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক নেইল সিহানের কাছে এই পেন্টাগন পেপার ফাঁস করে দিলেন। ঠিক এখান থেকেই স্টিভেন স্পিলবার্গের সিনেমা ‘দা পোস্ট’-এর শুরু।

দা পোস্ট মানে ওয়াশিংটন পোস্ট। ক্যাথরিন মেয়ার গ্রাহাম তখন পোস্টের মালিক আর বেঞ্জামিন ব্রাডলি সম্পাদক। কঠিন সময় পার করছিল তখন ওয়াশিংটন পোস্ট। স্বামীর আত্মহত্যার পর দায়িত্ব নিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগের ভাবনায় ওয়াশিংটন পোস্টকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। রবার্ট ম্যাকনামারা ক্যাথারিনের অনেক পুরোনো বন্ধু। এক অনুষ্ঠানে ম্যাকনামারাই জানালেন, পরদিন নিউ ইয়র্ক টাইমস এমন কিছু ছাপাচ্ছে যা তাঁর পক্ষে যাচ্ছে না। পরের দিন চার কলাম জুড়ে ছাপা হলো সেই পেন্টাগন পেপার। প্রতিযোগী পত্রিকা স্কুপ কোনো নিউজ ছাপা হলে কেমন লাগে তা সব সাংবাদিকদেরই জানা। আর সেটি যদি হয় ইতিহাসের একটি অংশ, যার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাপক-তাহলে তো কথাই নেই। পেন্টাগন পেপার ফাঁস হওয়া ছিল সে রকমই একটি ঘটনা।

নিক্সন তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ছাপানো সংবাদটি আলোড়ন তুলল ব্যাপক। আদালতে হাজির হলো নিক্সন প্রশাসন। এ নিয়ে আরও নিউজ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি হলো নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ওপরে। পালালেন ডানিয়েল এলসবার্গ। গোপন আস্তানা থেকে এবার রিপোর্টটি দিয়ে দিলেন ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাংবাদিককে। পোস্ট সিদ্ধান্ত নিল ছাপাবার। বাধা এল কোম্পানির অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে। তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। এ সময় এ ধরনের রিপোর্ট ছাপা হলে আইনি জটিলতায় পড়তে হবে। এমনকি জেল হতে পারে মালিক ও সম্পাদকের। ফলে পুরো ওয়াশিংটন পোস্টই বড় ধরনের বিপদে পড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্যাথারিন ঝুঁকিটা নিলেন। ছাপা হলো পেন্টাগন পেপারের বাকি অংশ। ওই দিনই ছিল আদালতে শুনানি। শেষ পর্যন্ত জয় হলো স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের, মত প্রকাশের স্বাধীনতার। আদালত রায় দিয়ে বললেন, ‘দা ফাউন্ডিং ফাদার্স গেইভ দা ফ্রি প্রেস, দা প্রোটেকশন ইট মাস্ট হ্যাভ টু ফুলফিল ইটজ এসেনশিয়াল রোল ইন আওয়ার ডেমোক্রেসি। দা প্রেস ওয়াজ টু সার্ভ দা গভার্নড, নট দা গভর্নরস।

নিক্সন প্রশাসনের সঙ্গে আইনি যুদ্ধে জয়ের পরে সেই শেষ দৃশ্যটার কথা বলতে পারি। পত্রিকা ছাপা হচ্ছে। প্রকাশক ক্যাথরিন গ্রাহাম (অভিনয় করেছিলেন মেরিল স্ট্রিপ) বেন ব্রাডলিকে (টম হ্যাংকস) তখন বললেন, ‘জানো আমার স্বামী (তিনিও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রকাশক ছিলেন) নিউজ সম্বন্ধে সব সময় কি বলতেন? তিনি বলতেন, সাংবাদিকেরা যে নিউজটি লেখে সেটি হচ্ছে ইতিহাসের প্রথম খসড়া। আমরা সব সময় হয়তো ঠিক হই না, কিন্তু এ কাজটি আমাদের করে যেতেই হবে।’

সিনেমাটা আসলে পেন্টাগন পেপারস নিয়ে না। কারণ এ নিয়ে একাধিক সিনেমা ও ডকুমেন্টারি হয়েছে। সুতরাং একই বিষয় নিয়ে স্পিলবার্গ সিনেমা করবেন এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আসলে দা পোস্ট গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সিনেমা, কথা বলার স্বাধীনতা নিয়ে সিনেমা। ট্রাম্পের সময়ে এই সিনেমার গুরুত্ব একেবারেই আলাদা।

২.

জর্জ রামোস খুব বড় একজন মার্কিন সাংবাদিক। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল সাংবাদিকতাকে বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার একটাই পরামর্শ। আপনার যা স্বপ্ন, আপনি যা পছন্দ করেন ঠিক সেটাই করেন। আমি সাংবাদিকতাতে বেছে নিয়েছি কারণ আমি এমন এক জায়গায় থাকতে চেয়েছি যেখানে ইতিহাস তৈরি হয়।’

 

৩. সৌম্যদা, মানে আমাদের সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফ দ্য রেকর্ড বইটা হয়তো অনেকেই পড়েছেন। সেখান থেকে একটা অধ্যায়ের কিছু লাইন এখানে তুলে দিই।

‘রেস্তোরাঁ থেকে বেরোনোর আগে আমার শেষ প্রশ্ন ছিল, একজন ভারতীয় নাগরিক হওয়ার দরুন জেভিপির (জনতা ভিমুক্তি পেরামুনা-শ্রীলঙ্কার কমিউনিস্ট পার্টি, যারা বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল) চোখে আমি শ্রেণিশত্রু কিনা।

রোহন ও রাজসিংঘে দু-জনেই থমকে দাঁড়ালেন। এবং কী আশ্চর্য, দু-জনের কথাই প্রায় একসঙ্গে বেরিয়ে এল, যার মোদ্দা কথা হলো, আমি একজন সাংবাদিক, সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনাই যার ধর্ম। আর ওঁরা মনে করেন, সাংবাদিকেরা কখনোই রাষ্ট্রের বন্ধু হতে পারে না।

‘সাংবাদিকেরা রাষ্ট্রের বন্ধু হতে পারে না? কেন?’

রাজসিংঘে পনিটেল টাইট করতে করতে বললেন, ‘কারণ রাষ্ট্র হলো শোষক। রাষ্ট্রের ক্ষমতাগুলি হলো শোষণের হাতিয়ার। প্রকৃত সাংবাদিক তাঁরাই যাঁরা রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে পারেন, রাষ্ট্রকে সমালোচনা করতে ভয় পান না। যে-সাংবাদিক রাষ্ট্রের বন্ধু হয়ে যান, তিনি আর তখন সাংবাদিক থাকেন না। ধর্মচ্যুত হয়ে তিনি দালাল হয়ে পড়েন।’

ট্রাম্প সময়ে এ কথা কতটুকু মানে এখনকার বিশ্ব?

 

৪.

একাধিকবার হয়েছে। ব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ে একাধিক রিপোর্ট আমরা করেছি। এক সময় মনজুর ছিল ব্যাংক বিষয়ে সেরা রিপোর্টার। রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দায়ী করা হয়েছে। কিংবা জড়িত ছিলেন বড় কোনো ব্যবসায়ী। তখন পরিচিত এক সাংবাদিকের কাজ ছিল রাতে পার্টি করা, সাংবাদিকদের দাওয়াত দেওয়া এবং সাংবাদিকেরা পার্টিতে হাজির হয়ে দেখতেন আসলে পার্টির মূল ব্যক্তি ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা সেই ব্যবসায়ী।

সেই সাংবাদিককে এখন দেখি সৎ আর সুসাংবাদিকতা নিয়ে বেশ বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন।

৫.

ফিলিপাইনের স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোজ নিয়ে গল্পটা এখন বলি। পাশের দেশের প্রেসিডেন্ট গেছেন ফিলিপাইন সফরে। সেখানে একান্ত সাক্ষাৎকারে অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গেও কথা বলছিলেন তাঁরা। মার্কোজ একসময় জানতে চাইলেন, পাশের দেশের প্রেসিডেন্টের শখ কী। তিনি বললেন, ‘আমাকে নিয়ে আমার দেশের লোকজন অনেক কৌতুক-গল্প বানায়। আমার শখ সেই সব কৌতুক-গল্প সংগ্রহ করা।’ এবার মার্কোজকে তিনি একই প্রশ্ন করলেন। মার্কোজের সোজাসাপটা উত্তর, ‘আমার শখ, যারা আমাকে নিয়ে কৌতুক বানায়, তাদের সংগ্রহ করা।’

৬.

সবশেষে ঋতুপর্ণ ঘোষ ‘অন্য নায়ক’ নায়ক নামে একটা সিনেমা করতে চেয়েছিলেন, পারেননি। সেই গল্পটা নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলি। বানানোর ধরনটা ঋতুপর্ণ ঘোষের মতোই। সেখান থেকে একটা সংলাপ তুলে দিই।

‘পাপীরা দীর্ঘায়ু হয়

জোচ্চরের সম্পত্তি বাড়তে থাকে

আর কিছু সাধারণ অভিনেতা সুপারস্টার হয়ে যায়।

You can’t help it’

রেটিং
[Total: 2   Average: 3/5]

  • 234
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    243
    Shares

Comments

  1. অনামিকা

    ট্রাম্পের জায়গায় শেখ হাসিনার নাম বসিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু তা করার মত নৈতিক অবস্থান আপনার আছে কি?

  2. যাযাবর

    সাংবাদিকতার সঙ্গে সিনেমা এর সঙ্গে রাজনীতি জমে যে ক্ষিরমাখা লেখা পড়া হলো নিঃসন্দেহে লেখাটা পাঁচাতারা দেবার মতো। এই সিরিজটা লম্বা হোক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিত জোড়া দিয়ে একই ধরনের লেখা পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.