বিপ্লবের ভেতর-বাহির (শেষ পর্ব) : কে ধরিয়ে দিয়েছিল সিরাজ সিকদারকে?

  • 183
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    186
    Shares

বিপ্লবের ভেতর-বাহির: শেষ পর্ব

সিরাজ সিকদার নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন শেখ কামালও। বলা যায় তিনি গুলি খেয়ে মরতে বসেছিলেন। আর ব্যাংক ডাকাতের একটা তকমা দীর্ঘদিন ধরে শেখ কামালের নামের সঙ্গে জুড়ে বসেছিল। এখনো হয়তো কেউ কেউ তা বিশ্বাসও করেন। অনেকের জানা সেই গল্পটা আগে বলি।
সময়টা ছিল ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের দিবাগত রাতে। সারা শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সিরাজ সিকদারের দল ঢাকায় সরকারি বিরোধী লিফলেট প্রচার ও হামলা করবে। এই আশঙ্কায় সাদা পোশাকে পুলিশ রাতে সিরাজ সিকদারের দলবলের খোঁজে টহল দিতে থাকে। ওই রাতেই সিরাজ সিকদারকে ধরতে বন্ধুদের নিয়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসে বের হন বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামাল। পুলিশ টহল দিলেও তারা সিরাজ সিকদারের বাহিনীকে ভয় পেত। এ সময় সাদা পোশাকের পুলিশ সাদা রঙের মাইক্রোবাসটি দেখতে পায়। আতঙ্কিত পুলিশ কোনো ধরনের সংকেত না দিয়েই মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিতে আহত হন কামালসহ ছয়জন। শেখ কামালকে সেই রাতেই পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেখ কামালের কাঁধে গুলি লেগেছিল। সার্জেন্ট কিবরিয়া গুলি করেছিলেন। আর ঘটনাস্থল ছিল মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে।

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব) বীরবিক্রম তাঁর বইতে এ নিয়ে লিখেছেন,
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব কামালের ওই রাতের অবাঞ্ছিত ঘোরাফেরায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মনঃক্ষুণ্ন হন। প্রথমে তিনি তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানান। পরে অবশ্য গিয়েছিলেন। আরও জানা যায়, অল্পের জন্য শেখ কামালের শ্বাসনালিতে গুলি লাগেনি। তবে এই ঘটনার জন্য বঙ্গবন্ধু পুলিশ বাহিনীকে কোনোরকম দোষারোপ করেননি।’

কিন্তু চালু মিথ হচ্ছে শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়েছিলেন। অনেক মিথ আছে সিরাজ সিকদারকে নিয়েও। এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার পর যে দুটি দল মুজিব সরকারকে চরম বিপাকে ফেলছিলে তার মধ্যে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি অন্যতম। আরেকটি দল হচ্ছে জাসদ। তবে সরকারের দমন নীতি জাসদের তুলনায় সর্বহারা দলের ওপরই ছিল বেশি তীব্র।
১৯৭৩ সাল হচ্ছে সর্বহারা পার্টির স্বর্ণসময় আর ৭৪ ছিল বিকাশের সময়। সদস্য সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে ওই বছরে। এতে পার্টির লাভ-ক্ষতি দুটোই হয়। কারণ বিকাশের সুযোগে নানা ধরনের অবাঞ্ছিত মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটে। এর ফলাফল পরবর্তীতে ভালো হয়নি।
সিরাজ সিকদার ছাড়াও আরেকজন ছিলেন সরকারের ত্রাস। তিনি হলেন, লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিন। এনায়েতউল্লাহ খানের হলিডে পত্রিকায় তিনি ১৯৭২ সালের আগস্টে সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করে একটি লেখা লিখেছিলেন। একজন কর্মরত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা হয়েও লেখাটি তিনি নিজের নামেই লিখেছিলেন। সেই লেখার সবচেয়ে কঠোর লাইনটি ছিল, ‘শেখ মুজিবকে ছাড়াই আমরা যুদ্ধ করেছি এবং যুদ্ধে জয়ী হয়েছি।’ এরপরেও জিয়াউদ্দিনকে তেমন কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়নি। বরং তিনিই চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন সিরাজ সিকদারের দলে। দলে তাঁর নাম ছিল হাসান। এই জিয়াউদ্দিন সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর দলে কর্তৃত্ব বজায় রাখতে দলের মধ্যেই ব্যাপক খুনোখুনি করেছিলেন।
সিরাজ সিকদারের উত্থানের পেছনে সে সময়ে রক্ষী বাহিনীর একটা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। রক্ষী বাহিনীর অত্যাচারের কারণে অনেকেই সর্বহারার সমর্থক হয়েছিলেন। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সে সব এলাকায় রক্ষী বা অন্যান্য সরকারি বা কারও কারও ব্যক্তিগত বাহিনীর অত্যাচার বেশি ছিল, সেসব স্থানেই সর্বহারা দলের বিকাশ দ্রুত হয়েছে। যেমন, মুন্সিগঞ্জে শাহ মোয়াজ্জেমের এক বিশাল ব্যক্তিগত বাহিনী ছিল, তারা মুন্সিগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করায় এখানে সর্বহারা দলের শক্তিও যথেষ্ট বেড়েছিল। সরকারও সে সময় সিরাজ সিকদারকে নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ বিব্রত ছিল।
১৯৭৩ সালের নভেম্বরে ছাত্র ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

‘যারা রাতের বেলায় গোপনে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, সাধারণ মানুষকে হত্যা করে তাদের সঙ্গে ডাকাতদের কোনো পার্থক্য নেই। রাতের অন্ধকারে গোপন হত্যা করে বিপ্লব করা যায় না। তোমরা যে পথ ও দর্শন বেছে নিয়েছ তা ভুল। আমরা গণতন্ত্র দিয়েছি ঠিক। কিন্তু কেউ যদি রাতের বেলায় নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করতে পারে, তাহলে জনগণের সরকার হিসাবে আমাদেরও তাদের গুলি করে হত্যা করার অধিকার আছে।’

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ সে সময়ে সমালোচিত হয়েছিল। বলা হয়েছিল এটি আসলে গুলি করে হত্যার আদেশ।জানা যায়, সিরাজ সিকদারকে ধরার জন্য আর্মিকে বলা হলেও তারা খুব আগ্রহ দেখায়নি। তবে সিরাজ সিকদারের প্রতি পুলিশ বা রক্ষী বাহিনীর তেমন কোনো সহানুভূতি ছিল না। কারণ, সর্বহারা দলের অন্যতম টার্গেট ছিল এরাও। ফলে শেষ পর্যন্ত ধরা পরতেই হয় সিরাজ সিকদারকে।
১৯৭৫ সালের প্রথম দিনটি ছিল সর্বহারা পার্টির জন্য বিষাদের একটি দিন। ওই দিনই ধরা পরেন সিরাজ সিরকদার। কীভাবে ধরা পড়েছিলেন তিনি। গল্পকারের দৃষ্টিতে সেই কাহিনি এ রকম:

‘শহরে, গ্রামে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে আগে থেকেই প্রবল চাপের মুখে রেখেছেন সিরাজ শিকদার। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবার পর তার তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দেন সিরাজ শিকদার। ‘৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে হরতাল ডাকে সর্বহারা পার্টি। বোমা ফাটিয়ে, লিফলেট বিলি করে আতঙ্ক তৈরি করে তারা। দেশের নানা এলাকায় তাদের ডাকে হরতাল সফলও হয়। রক্ষীবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন খুঁজছে সিরাজ শিকদারকে। সরকারের মোস্ট ওয়ান্টেড মানুষ তিনি। কিন্তু তার নাগাল পাওয়া দুষ্কর। কঠোর গোপনীয়তায়, নানা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ান। নিরাপত্তার জন্য এমনকি নিজের দলের ভেতর কারও আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
১৬ ডিসেম্বর হরতাল সফল হওয়ার পর আরও ব্যাপক কর্মসূচি নেবার পরিকল্পনা নিয়ে সিরাজ শিকদার তখন তার পার্টি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে লাগাতার মিটিং করছেন চট্টগ্রামে। একেক দিন থাকছেন একেক গোপন আস্তানায়। ১৯৭৫ সালের প্রথম দিন, ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে হালিশহরের কাছে এক গোপন শেল্টার থেকে একজন পার্টি কর্মীসহ সিরাজ শিকদার যাচ্ছিলেন আরেকটি শেল্টারে। বেবিট্যাক্সি নিয়েছেন একটি। সিরাজ শিকদার পড়েছেন একটি দামি ঘিয়ে প্যান্ট এবং টেট্রনের সাদা ফুল শার্ট, চোখে সান গ্লাস, হাতে ব্রিফকেস। যেন তুখোড় ব্যবসায়ী একজন। বেবি ট্যাক্সিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একজন অপরিচিত লোক এসে তার কাছে লিফট চায়, বলে তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, ডাক্তার ডাকা প্রয়োজন, সে সামনেই নেমে যাবে। শিকদার বেশ কয়েকবার আপত্তি করলেও লোকটির অনুনয়-বিনয়ের জন্য তাকে বেবিট্যাক্সিতে তুলে নেন। চট্টগ্রাম নিউমার্কেটের কাছে আসতেই অপরিচিত লোকটি হঠাৎ লাফ দিয়ে বেবিট্যাক্সি থেকে নেমে ড্রাইভারকে পিস্তল ধরে থামতে বলে। কাছেই সাদা পোশাকে বেশ কয়েকজন অপেক্ষমাণ পুলিশ স্টেনগান উঁচিয়ে ঘিরে ফেলে বেবিট্যাক্সি। স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ধর্ষ বিপ্লবী, যথেষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও তার দলের সদস্যেরই বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে।
সিরাজ শিকদারকে হাতকড়া পড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ডাবল মুরিং থানায়। সেদিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ ফকার বিমানে তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা। তাকে রাখা হয় মালিবাগের স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসে। সরকারের ত্রাস, বহুল আলোচিত, রহস্যময় এই মানুষটিকে এক নজর দেখবার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্য, আমলাদের মধ্যে ভিড় জমে যায়।
৩ জানুয়ারি সারা দেশের মানুষ পত্রিকায় পড়ে, ‘‘বন্দী অবস্থায় পালানোর সময় পুলিশের হাতে নিহত হন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত একটি গুপ্ত চরমপন্থী দলের প্রধান সিরাজুল হক শিকদার ওরফে সিরাজ শিকদার’’। ছাপানো হয় সিরাজ শিকদারের মৃতদেহের ছবি।’

ধরা পড়ার পরের দিন সরকার একটি প্রেসনোট জারি করে। সেখানে বলা হয়,

‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত আত্মগোপনকারী চরমপন্থী দলের নেতা সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ সিকদারকে পুলিশ গত ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার করে। সেই দিনই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দেন এবং তার দলীয় কর্মীদের কিছু গোপন আস্তানা এবং তাদের বেআইনি অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দেখিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশের সঙ্গে যেতেও সম্মত হন। তদনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে একদল পুলিশ যখন তাকে পুলিশ ভ্যানে করে গোপন আস্তানার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি সাভারের কাছে পুলিশ ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। পুলিশ তার পলায়ন রোধের জন্য গুলিবর্ষণ করে। ফলে সিরাজ সিকদারের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়।’

আগ্রহী পাঠকেরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, সরকারি এই প্রেসনোটের বক্তব্য ও ভাষার সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে ক্রসফায়ারের পর র‌্যাব ও পুলিশ যে প্রেসনোট দেয়, তার সঙ্গে অনেক মিল আছে। ৩ তারিখের পত্রিকায় সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে আরও কিছু কথা ছাপা হয়েছিল:

‘সিরাজ সিকদার তার গোপন দলে একদল ডাকাতের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। এদের দ্বারাই তিনি গুপ্তহত্যা, থানা, বন বিভাগীয় দপ্তর, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ইত্যাদির ওপর হামলা, ব্যাংক লুট, হাট বাজার, লঞ্চ, ট্রেন ডাকাতি, রেল লাইন উপড়ে ফেলে গুরুতর ট্রেন দুর্ঘটনা সংঘটন এবং জনসাধারণের কাছ থেকে জবরদস্তি টাকা আদায়-এই ধরনের উচ্ছৃঙ্খল অপরাধের মাধ্যমে দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করেছিলেন।’

মজার ব্যাপার হলো, বলা হয় সিরাজ সিকদারের বুকে গুলি ছিল। অথচ পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি লাগার কথা পেছনে। এ বিষয়ে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব) তাঁর বইতে লিখেছেন,

‘ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠানে পুলিশের তৎকালীন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে সিরাজ সিকদার প্রসঙ্গে কথা বললে তিনি হঠাৎ বলে বসেন, কর্নেল সাহেব, আমাদের এবং আপনাদের যুদ্ধের মধ্যে তফাত এটাই।’

অর্থাৎ পেছন থেকে গুলি করার কথা একপ্রকার স্বীকার করে নিয়েছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তাটি। সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক আগে, এখন যেখানে রেডিওর অফিস, সেখানেই গুলি করা হয়েছিল সিরাজ সিকদারকে।
‘বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে অ্যান্থনী মাসকেরেনহাস লিখেছেন:

‘ঘটনাচক্রে মাওপন্থী সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কাছাকাছি এক এলাকা থেকে (টেকনাফ) শেষ পর্যন্ত পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হলেন। জাকারিয়া চৌধুরীর (সিরাজ সিকদারের ছোট বোন, ভাস্কর শামীম সিকদারের স্বামী) মতে, তাকে পাহারা দিয়ে ঢাকায় আনা হলো শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করানো জন্য। শেখ মুজিব তাকে তার আয়ত্তে আনতে চাইলেন। কিন্তু সিকদার কোনো রকম আপস রফায় রাজি না হলে মুজিব পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে বলে দিলেন।
জাকারিয়া বলল, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখ-বাঁধা অবস্থায় রমনা রেস কোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। তারপর (২ জানুয়ারি ১৯৭৫) গভীর রাতে এক নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই সময় সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় যে, পালানোর চেষ্টাকালে সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
সিকদারের বোন, জাকারিয়ার স্ত্রী শামীম জানায়, সিরাজের দেহের গুলির চিহ্ন পরিষ্কার প্রমাণ করে যে, স্টেনগান দিয়ে তার বুকে ছয়টি গুলি করে তাকে মারা হয়েছিল।
সিরাজ সিকদারকে, শেখ মুজিবের নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছে বলে সারা দেশে রটে গেল।
১৯ বছরের যুবতী শামীম তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
সে আমাকে বলেছিল, আমি সর্বহারা পার্টির কাছ থেকে একটা রিভলবার পেয়েছিলাম এবং এই হত্যাকারীকে হত্যা করার সুযোগের সন্ধান করছিলাম।
শামীম বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাস্করদের একজন। গত বছরই কেবল সে তার ভাস্কর্যের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করে। তার ধারণা, সে নিশ্চয়ই মুজিবকে গুলি করার দূরত্বে পেয়ে যাবে।
শামীম মুজিবের সঙ্গে দেখা করার জন্য বহুবার আরজি পেশ করেছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে। তারপর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগে তার এক প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ জানাল। মুজিব আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হলেন।
সে স্মৃতিচারণ করে বলল, আমি ভয়ানক বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলাম। আমি শত চেষ্টা করেও তাঁকে (শেখ মুজিব) আমার গুলির আয়ত্তে আনতে পারলাম না।
শামীম সিকদার জাকারিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। শেষে তাদের বিয়ে হলে স্বামীর সঙ্গে শামীম বিদেশে চলে যান।’
সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন বসে। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করানোর পর তার দ্বিতীয় বিপ্লব, বাকশাল প্রসঙ্গে শেখ মুজিব অধিবেশনে বলেন,
‘স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর যারা এর বিরোধিতা করেছে, যারা শত্রুর দালালি করেছে, কোনো দেশেই তাদের ক্ষমা করা হয় নাই। কিন্তু আমরা করেছি। আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছি, দেশকে ভালোবাসো। দেশের স্বাধীনতা মেনে নাও। দেশের কাজ করো। কিন্তু তারপরও এদের অনেকে শোধরায়নি। এরা এমনকি বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে বিদেশ থেকে টাকা নিচ্ছে। ওরা ভেবেছে, আমি ওদের কথা জানি না! একজন রাতের আঁধারে মানুষ মেরে যাচ্ছে, আর ভাবছে তাকে কেউ ধরতে পারবে না। কোথায় আজ সিরাজ সিকদার? তাকে যখন ধরা গেছে, তখন তার সহযোগীরাও ধরা পড়বে।’

বলে রাখা ভালো, চট্টগ্রাম থেকে সিরাজ সিকদারকে ধরা হয়েছিল তাঁর একজন সহযোগীসহ। তাঁর নাম ছিল আকবর। ধরা পড়ার এক মাস পরে এই আকবরের লাশ পাওয়া গিয়েছিল বরিশালে, তারই নিজের বাড়ির সামনে।
হয়তো কাকতালীয়। তাও উল্লেখ করা যায়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বহারা পার্টি পুরোপুরি এক ব্যক্তি নির্ভর হয়ে পড়ে। ওই সময়ে দলে এক সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই একমাত্র সদস্য হলেন সিরাজ সিকদার। এই একক নেতৃত্ব নিয়েই দলের মধ্যে গ্রুপিং ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ধরা পড়েন তিনি এবং নির্মমভাবে নিহত হন। সিরাজ সিকদারের হত্যা নিয়ে একটি মামলা হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সিরাজ সিকদার পরিষদের সভাপতি শেখ মাহিউদ্দিন আহমদ মামলাটি করেছিলেন।
মামলার আসামিরা হলেন : ১. সাবেক পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ২. আবদুর রাজ্জাক এমপি, ৩. তোফায়েল আহমেদ এমপি, ৪. সাবেক আইজিপি ই এ চৌধুরী, ৫. সাবেক রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক কর্নেল (অব.) নূরুজ্জামান, ৭. মোহাম্মদ নাসিম এমপি গং। আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২ ও ১০৯ নম্বর ধারায় অভিযোগ করা হয়েছিল। আরজিতে বলা হয়: ‘আসামিরা মরহুম শেখ মুজিবের সহচর ও অধীনস্থ কর্মী থেকে শেখ মুজিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও গোপন শলা-পরামর্শে অংশগ্রহণ করতেন এবং ১ নং থেকে ৬ নং আসামি তৎকালীন সময়ে সরকারের উচ্চপদে থেকে অন্য ঘনিষ্ঠ সহচরদের সঙ্গে শেখ মুজিবের সিরাজ সিকদার হত্যার নীলনকশায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা এ লক্ষ্যে সর্বহারা পার্টির বিভিন্ন কর্মীকে হত্যা, গুম, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি করতে থাকেন।’
সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার ও হত্যার বিবরণ দিয়ে আরজিতে বলা হয়, ‘মরহুম শেখ মুজিব ও উল্লিখিত আসামিরা তাঁদের অন্য সহযোগীদের সাহচর্যে সর্বহারা পার্টির মধ্যে সরকারের চর নিয়োগ করেন। এদের মধ্যে ই এ চৌধুরীর একজন নিকটাত্মীয়কেও চর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এভাবে ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে অন্য একজনসহ সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করে ওই দিনই বিমানে করে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকার পুরোনো বিমানবন্দরে নামিয়ে বিশেষ গাড়িতে করে বন্দীদের পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের মালিবাগের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সিরাজ সিকদারকে আলাদা করে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর বিশেষ স্কোয়াডের অনুগত সদস্যরা গণভবনে মরহুম শেখ মুজিবের কাছে সিরাজ সিকদারকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। সেখানে শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলীসহ আসামিরা, শেখ মুজিবের পুত্র মরহুম শেখ কামাল এবং ভাগনে মরহুম শেখ মণি উপস্থিত ছিলেন।’
আরজিতে আরও বলা হয়, ‘প্রথম দর্শনেই শেখ মুজিব সিরাজ সিকদারকে গালিগালাজ শুরু করেন। সিরাজ এর প্রতিবাদ করলে শেখ মুজিবসহ উপস্থিত সবাই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সিরাজ সে অবস্থায়ও শেখ মুজিবের পুত্র কর্তৃক সাধিত ব্যাংক ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্ম, ভারতীয় সেবা দাসত্ব না করার, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শেখ মুজিবের কাছে দাবি জানালে শেখ মুজিব আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। সে সময় ১ নং আসামি মাহবুব উদ্দিন তাঁর রিভলবারের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে সিরাজ সিকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শেখ কামাল রাগের মাথায় গুলি করলে সিরাজ সিকদারের হাতে লাগে। ওই সময় সব আসামি শেখ মুজিবের উপস্থিতিতেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলেন। এর পর শেখ মুজিব, মনসুর আলী এবং ২ থেকে ৭ নং আসামি সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১ নং আসামিকে নির্দেশ দেন। ১ নং আসামি মাহবুব উদ্দিন আহমদ আসামিদের সঙ্গে বন্দী সিরাজ সিকদারকে শেরে বাংলা নগর রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়ে যান। এর পর তাঁর ওপর আরও নির্যাতন চালানো হয়। অবশেষে ২ জানুয়ারি আসামিদের উপস্থিতিতে রাত ১১টার দিকে রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরেই সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে ১ নং আসামির সঙ্গে বিশেষ স্কোয়াডের সদস্যরা পূর্বপরিকল্পনা মতো বন্দী অবস্থায় নিহত সিরাজ সিকদারের লাশ সাভারের তালবাগ এলাকা হয়ে সাভার থানায় নিয়ে যায় এবং সাভার থানা-পুলিশ পরের দিন ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণ করে।’
সিরাজ সিকদারের হত্যা নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১৯ মে সংখ্যার বিচিত্রায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। সেটির কথা অনেকের লেখায় আছে। কিন্তু প্রতিবেদনটি পাওয়া যায়নি। কারও কাছে থাকলে হয়তো আরও কিছু জানা যেত।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ধরা পড়লেন সিরাজ সিকদার? সন্দেহ নেই নিজের দলের লোকেরাই ধরিয়ে দিয়েছিল সিরাজ সিকদারকে। এর আগে অনেক চেষ্টা করেও ধরা যায়নি সিরাজ সিকদারকে।
হালিম দাদ খান লিখেছেন,

‘চুয়াত্তরের শেষার্ধে মুজিব সেনাবাহিনীকে নক্সালদের মূলোৎপাটনের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেজর ফারুক এ নির্দেশ পালনে উৎসাহী না হয়ে বরং এদের কাউকে ধরতে পারলেও ছেড়ে দিয়েই অধিক আনন্দ পেতেন।’

কেবল সেনাবাহিনীই নয়, আওয়ামী লীগের মধ্যেও কিছু সিরাজ সিকদারের সমর্থক ছিলেন। এ ক্ষেত্রে চমকে যাওয়ার মতো একটি তথ্য দিতে পারি। ফজলুল হক রানা ছিলেন সর্বহারা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর মধ্যে তাদের যোগাযোগ ছিল। অনেক তরুণ অফিসারদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। তবে পার্টির পহেলা কাতারের সহানুভূতিশীল হিসাবে তিনি নাম বলেছেন বিশেষ একজন ব্যক্তির। সেই ব্যক্তিটি হলেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ এবং আত্মীয় (বোনের স্বামী)।
ফজলুল হক রানা বলেছেন,

‘আবদুর রব সেরনিয়াবাত ছিলেন মনে-প্রাণে ভারতবিদ্বেষী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে ভারত ৭ দফা গোলামি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করলে তখন থেকেই সেরনিয়াবাদ ভারতের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ……….আর এভাবেই জনাব সেরনিয়াবাত আমাদের পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন এবং নানাভাবে আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করেন।’

রানা সবশেষে বলেছেন, সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর এই যোগাযোগগুলো নষ্ট হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর সঙ্গেও। সেনাবাহিনীর অনেক অফিসারদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল দলের।
সর্বহারা পার্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা রইসউদ্দিন আরিফসহ দুজনকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল দল থেকেই। আসুন দেখা যাক, তিনি কি বলেছেন:

‘সে সময়কার সিলেট অঞ্চলের পরিচালক পার্টির তৎকালীন নেতৃস্থানীয় ক্যাডার কমরেড মনসুর নানা কারণে পার্টি নেতৃত্বের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এ ক্ষোভকে কেন্দ্র করে পার্টির ভেতরে সংগ্রাম পরিচালনার উদ্দেশ্যে মনসুর কিছু প্রস্তাব এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তার এ প্রস্তাব ও পরিকল্পনার বিষয়টি অবহিত করার জন্য তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক কমরেড ইকরামকে একটি চিঠি পাঠান। কিন্তু ইকরামকে লেখা এ চিঠি খানি ভুলবশত অন্য একটি প্যাকেটে পার্টির অন্য নেতার হাতে চলে যায়। ফলে মনসুর বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান। এই বিব্রতকর অবস্থার একপর্যায়ে মনসুর দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সিলেট থেকে অতি দ্রুত চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রাম এসেই নাটকীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেন কমরেড সিরাজ সিকদারকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়ার। জানা যায়, একপর্যায়ে কমরেড সিকদারের বৈঠকের স্থান ও যাতায়াতের পথের বিবরণ দিয়ে ছোট্ট একখানা চিরকুট লিখে ডবলমুরিং থানায় পাঠান। সেই চিরকুটের সূত্র ধরেই পুলিশ কমরেড সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করে।’

এবার আমরা ফিরে যেতে পারি পুরোনো কিছু কথায়। দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিলেন সিরাজ সিকদার নিজেই। দলে কেউ বিদ্রোহ করলে তাকে বহিষ্কার বা অন্য কোনো পথ অবলম্বন না করে খতম করার ধারাটি শুরু করেছিলেন সিরাজ সিকদার নিজেই। ফজলু-সুলতান গ্রুপকে খতম করার মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায় শুরু হয়েছিল। আবার স্মরণ করতে পারি রইসউদ্দিন আরিফের সেই কথাগুলো।

‘পার্টিতে বাহাত্তর সালে ফজলু খতম হয়েছিল আকস্মিকভাবে। পার্টির স্থানীয় কর্মী ও গেরিলারা কেন্দ্রের অনুমোদন ছাড়াই ফজলুকে খতম করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি পরে ফজলু খতমের বিষয়টিকে অনুমোদন করে এবং এহেন কাজকে অভিনন্দিত করে। অথচ আমার মতে সে সময়ে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সঠিক করণীয়টি ছিল একদিকে ফজলু-সুলতান চক্রের পার্টি বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সংগ্রাম জোরদার করা এবং একই সঙ্গে ফজলু খতমের ঘটনাকে নিন্দা করা। পার্টি যদি সেদিন এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালনে সক্ষম হতো, তাহলে সর্বহারা পার্টির ইতিহাস লিখিত হতো ভিন্নভাবে।’


চট্টগ্রামের মনসুর জানতেন দলে বিদ্রোহ বা বিক্ষুব্ধ হওয়ার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ফলে যখন সে জানল তার চিঠিটি অন্য হাতে পড়েছে তখন তার জন্য আর কোনো বিকল্প ছিল না। নিজে বাঁচার জন্যই যে মনসুর সিরাজ সিকদারকে ধরিয়ে দিয়েছিল তা দলের ভেতর থেকেই স্বীকার করা হয়। ফলে পুরোনো কথাটাই আবার বলি, ফজলু-সুলতান গ্রুপকে খতম করা না হলে হয়তো সর্বহারা পার্টির ইতিহাস অন্যরকম হতো, হয়তো বেঁচে থাকতেন সিরাজ সিকদার। হয়তো বেঁচে থাকতেন কবি হুমায়ুন কবিরসহ আরও অনেকেই।
কথা আরেকটু আছে। মনসুর একাই কি সিরাজ সিকদারকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। না কি দলের আর কেউ ছিলেন। সন্দেহ করার মতো অনেক আলামত কিন্তু আছে। যেমন, সিরাজ সিকদার ধরা পড়েন ১ জানুয়ারি, ১৯৭৫ দুপুর ২টায়। আর সরকারি ভাবে তাঁর মৃত্যুর কথা জানানো হয় পরের দিন রাতে। এই সময়ের মধ্যে সর্বহারা দলের কোনো তৎপরতাই ছিল না। দলের মূল নেতা ধরা পড়েছেন জেনেও সেই তথ্য দলের মধ্যে জানানো হয়নি। নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। অথচ যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা দলটির ছিল। এ ক্ষেত্রে স্মরণ করি, কর্নেল তাহের ধরা পড়ার পর জাসদ কর্তৃক ভারতের হাইকমিশনার সমর সেনকে জিম্মি করার চেষ্টার কথা। কেউ কেউ বলেন, পুলিশের সঙ্গে একটা সমঝোতা হয়েছিল দলের কারও কারও সঙ্গে। পুলিশকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানো পর্যন্ত দলের পক্ষ থেকে সবাইকে জানানো হবে না।
পার্টির চট্টগ্রাম অংশের এসব ভূমিকার কারণে দলের মধ্যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয় পরে। চট্টগ্রামের নেতাদের খতম করা হয়েছিল ব্যাপকভাবে। অনেক নিরীহ পার্টি কর্মীও খতম হন। তাদের অপরাধ ছিল সিরাজ সিকদার ধরা পড়েছিলেন চট্টগ্রামে। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিল অনেক দিন। এমনকি মনসুরকেও কিছুদিনের মধ্যেই খতম করা হয়েছিল।
লেখাটা শুরু করেছিলাম সিরাজ সিকদারের প্রথম বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে। এর পরের পর্ব ছিল জাহানারা হাকিমের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক, একসঙ্গে থাকা ও বিয়ে নিয়ে। আগেই বলেছি সিরাজ সিকদারের বিবাহ বিচ্ছেদ ও আবার বিয়ে করার ফল পার্টির জন্য মোটেই ভালো হয়নি। এর একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাবটি সবশেষে বলি। ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ বইয়ে লেখা আছে,

‘পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছিল, সিরাজ সিকদারের ওই দিনের মিটিং ও পথ-নির্দেশিকা তারা পায় পুলিশের কাছে মেয়েলি হাতের লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে। ধারণা করা হয়, এই মহিলাটি সিরাজ সিকদারের স্ত্রীও হতে পারেন। দলের ভেতরে তখন তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা ছিল।’

সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর জাহানারা হাকিমের আর কোনো তৎপরতা দলে ছিল না।
সিরাজ সিকদার গ্রেপ্তার হন ১৯৭৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামে। এই তথ্য আমরা সবাই জানি। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি প্রেসনোট থেকে সবাই জানেন যে, সিরাজ সিকদার নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার ও নিহত হওয়ার মাঝখানের ঘটনার কোনো বিবরণী এখন পর্যন্ত কেউ দেননি। সিরাজ সিকদার হত্যা মামলার বিবরণীতে অনেক কিছু লেখা আছে, কিন্তু এর সত্যতা নিশ্চিত নয়। বিবরণীর মধ্যে যে অতিরঞ্জন আছে তা বুঝতে কষ্ট হয় না।

শেষের আগে
সিরাজ সিকদার ধরা পড়েছিল পুলিশের হাতে। কিন্তু তাকে রাখা হয়েছিল শেরে বাংলা নগরের রক্ষী বাহিনীর কার্যালয়ে। এরপর কি হয়েছিল? আনোয়ার উল আলম ছিলেন রক্ষী বাহিনীর একজন উপপরিচালক। তিনি একটি বই লিখেছেন। রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা নামের বইটিতে অনেক অজানা কাহিনি আছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন তথ্যও আছে। সেটি হচ্ছে সিরাজ সিকদার কীভাবে ধরা পড়েছিলেন, কে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।এটাই সম্ভবত কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর প্রথম দেওয়া বিবরণ।
বই থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সবাই জানতেন যে দলের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজ সিকদার ধরা পড়েছিলেন। পার্টির মধ্য থেকেও অনুসন্ধান করা হয়েছিল। এমনকি সন্দেহজনকদের নির্মমভাবে খতমও করা হয়েছিল। তবে আনোয়ার উল আলম নতুন একটি তথ্য দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর ঢাকায় এনে প্রথমে সিরাজ সিকদার ছিলেন পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাজারবাগে, হোয়াইট হলে (এখন সেটি নেই)। এরপর গভীর রাতে আনা হয় শেরে বাংলা নগরে, রক্ষী বাহিনীর কার্যালয়ে। তবে এ দায় নিতে চায়নি রক্ষী বাহিনী। তবে লেখক জানাচ্ছেন, স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি ই এ চৌধুরীর অনুরোধে সিরাজ সিকদারকে সেখানে আনা হয়েছিল। এবার লেখকের জবানিতে শুনুন,

‘নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে দেখি, সিরাজ সিকদার মাটিতে বসে আছেন। একটা টেবিলে তাঁকে সকালের নাশতা দেওয়া হয়েছে। তিনি খাননি। কক্ষের ভেতরে একটা বিছানা ও একটা ছোট টেবিল। কোনো চেয়ার নেই। আমরা তিনটি চেয়ার আনার ব্যবস্থা করি। তার একটিতে বসতে দিই সিরাজ সিকদারকে। সরোয়ার (সরোয়ার হোসেন মোল্লা-রক্ষী বাহিনীর সে সময়ের উপপরিচালক-অপারেশন) তাকে জিজ্ঞেস করলাম সিগারেট খাবেন কি না। তিনি হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলে সরোয়ার তাঁকে একটা সিগারেট ও ম্যাচ দেয়। সিরাজ সিকদার দেশলাই জ্বালিয়ে সিগারেট ধরান। কয়েকবার টান দিয়ে একটু স্বাভাবিক হন। এর আগে বসে ছিলেন বেশ গম্ভীর ভাব নিয়ে। আমরা তাঁকে নাশতা খেতে বলি। তিনি নাশতা খেতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। আমরা দুজন যে তাঁর সঙ্গে এত ভালো আচরণ করছি, তিনি তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁর কথায় বোঝা গেল, তিনি নিশ্চিত, তার অনুপস্থিতিতেই তাঁর সহকর্মীরা বাংলাদেশে বুর্জোয়া সরকারকে উৎখাত করে সর্বহারাদের সরকার গঠন করতে পারবে। তিনি বারবার একটি কথাই বলছিলেন, ‘‘আই নো মাই ফেইট ডিসাইডেড’’।’

সরকার বেশ সতর্ক ছিল। কারণ সর্বহারা পার্টি সিরাজ সিকদারকে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করতে পারে। এমনকি ভারতীয় হাইকমিশনার বা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ওপর হামলার আশঙ্কাও ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা হচ্ছে পার্টি ছিল একদম চুপ। দলের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই কি? এই প্রশ্নটি আমি আগেও করেছি। আনোয়ার উল আলম বলছেন একটি নাম, বিশ্বাসঘাতকের নাম। আগেও বলেছি, ব্যক্তিগত নানা ঘটনা সে সময় সর্বহারা পার্টিকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছিল। সর্বহারা পার্টি ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে বিপ্লব করতে চেয়েছিল। অথচ ব্যক্তিগত নানা ঘটনায় দলটিতে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি ঘটনাও কম ছিল না। অভ্যন্তরীণ নানা কোন্দল ছাড়াও সিরাজ সিকদারের দুই বিয়ে থাকলেও অন্যকে বিয়েতে নিরুৎসাহিত করার ঘটনাও পার্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
আনোয়ার উল আলমের বইটি এই বক্তব্যকেই সমর্থন করে। তিনি লিখেছেন,

‘আসলে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কিছুটা নারীঘটিত কারণে সিরাজ সিকদার ধরা পড়েন।’

কথা হচ্ছে বইটির লেখকের তথ্যের উৎস কি। তিনি জানিয়েছেন, ই এ চৌধুরীর কাছ থেকে তিনি সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তারের কাহিনি জানতে পেরেছিলেন। ই এ চৌধুরী ছিলেন এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। সুতরাং এই তথ্য সঠিক ভাবার যথেষ্ট কারণ থাকছে। বইটিতে এ বিষয়ে আছে,

‘সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন রবিন নামের একজন প্রকৌশলী। তাঁর একজন প্রেমিকা ছিল। সিরাজ সিকদারের দুজন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাঁর দৃষ্টি পড়ে রবিনের ওই প্রেমিকার ওপরে। এ নিয়ে তাঁদের দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। তাঁরা তখন সিলেট ছিলেন। এরপর তাঁরা দুজন সিলেট থেকে আলাদাভাবে চট্টগ্রামে রওনা হন। কিন্তু রবিন সিলেট থেকে চট্টগ্রামের পথে ঢাকায় আসেন এবং তাঁর একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর মাধ্যমে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রবিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সাদা পোশাকে কুমিল্লা থেকেই সিরাজ সিকদারকে ও তার কুরিয়ারকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা হদিস পায়নি। চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা সিরাজ সিকদার ও তাঁর কুরিয়ারকে সন্দেহ করে। সিরাজ সিকদার স্টেশন থেকে একটা স্কুটার নিলে সাদা পোশাকের কর্মকর্তারা তাঁর পিছু নেয় এবং একপর্যায়ে তাঁকে সন্দেহজনক ব্যক্তি হিসেবে গ্রেপ্তার করে। পরে রবিনই নিশ্চিত করেন, পুলিশ যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, তিনি-ই সিরাজ সিকদার।’

বইটিতে আনোয়ার উল আলম সবশেষে আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,

‘সিরাজ সিকদারের সিলেট থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার সঠিক তথ্য দেওয়ায় সরকার কয়েক দিন পর পুরস্কারস্বরূপ রবিনকে তাঁর স্ত্রী বা প্রেমিকাসহ কানাডায় পাঠিয়ে দেয়।’

আমরা জানি যে পুলিশের কাছে একটি মেয়েলি হাতে লেখায় সিরাজ সিকদারের পথের নির্দেশনা এসেছিল। সেটি কি তাহলে রবিনের সেই প্রেমিকার? এতদিন মনে করা হতো, চিঠিটি সিরাজ সিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রীর লেখা। আবার রবিন যদি মূল বিশ্বাসঘাতক হন, তাহলে অযথা প্রাণ গিয়েছিল সন্দেহভাজন মনসুরের। রবিনের প্রকৃত নাম তার সহবিপ্লবীরা জানবেন। হয়তো একদিন তাও জানা যাবে।

সহায়ক গ্রন্থ:
১. এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব) বীরবিক্রম, মাওলা ব্রাদার্স
২. কথামালার রাজনীতি ১৯৭২-৭৯, রেজোয়ান সিদ্দিকী, প্রতীক
৩. বাংলাদেশের রাজনীতি, ১৯৭২-৭৫, হালিম দাদ খান, আগামী প্রকাশনী
৪. কুসুমিত ইস্পাত, হুমায়ুন কবির, বইপড়ুয়া
৫. বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির গতিধারা, ১৯৪৮-৮৯, জগলুল আলম, প্রতীক
৬. বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নারী মুক্তিযোদ্ধারা, মেহেরুন্নেসা মেরী, ন্যাশনাল পাবলিকেশন্স
৭. বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিকথা, অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ-রাজনীতি হত্যা-ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা, রইসউদ্দিন আরিফ, পাঠক সমাবেশ
৮. আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন সমগ্র: বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিতর্কিত অধ্যায়, রইসউদ্দিন আরিফ, পাঠক সমাবেশ
৯. বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, আশরাফ কায়সার, মাওলা ব্রাদার্স
১০. সিরাজ সিকদার রচনা সমগ্র, শ্রাবণ প্রকাশনী
১১. বাংলাদেশ ১৯৭১, তৃতীয় খণ্ড, মাওলা ব্রাদার্স
১২. সিরাজ সিকদার: ভুল বিপ্লবের বাঁশিওয়ালা, অমি রহমান পিয়ালের ব্লগপোস্ট, সামওয়ারইন ব্লগ ও আমার ব্লগ
১২. সিরাজ সিকদার: অন্য আলোয় দেখা, বিপ্লব রহমানের ব্লগপোস্ট, উন্মোচন
১৩. সিরাজ সিকদার ও তাঁর সর্বহারা পার্টি, কালের কণ্ঠ, আরিফুজ্জামান তুহিনের একাধিক লেখা
১৪. কথ্য ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র
১৫. ভালোবাসার সাম্পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মাওলা ব্রাদার্স
১৬. নৃশংসতায় দুই কবি-শিক্ষক, জাফর ওয়াজেদ, নতুন দেশ
১৭. ক্রাচের কর্নেল, শাহাদুজ্জামান, মাওলা ব্রাদার্স
১৮. আহমদ ছফার ডায়েরি, সম্পাদনা-নুরুল আনোয়ার, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি
১৯. রুহুল ও রাহেলা, সূর্য রোকন (এটি অনলাইনে পাওয়া যায়)
২০. গণতন্ত্রের বিপন্ন ধারায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, মেজর নাসির উদ্দিন, আগামি প্রকাশনী
২১. রক্ষীবাহিনীর সত্য মিথ্যা, আনোয়ার উল আল, প্রথমা প্রকাশনী।

রেটিং
[Total: 6   Average: 3.5/5]

  • 183
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    186
    Shares

Comments

  1. যাযাবর

    অসাধারণ একটি ব্লগ পড়ার অভিজ্ঞতা হলো।

  2. শরীফ শমশির

    লেখা গুলো একসাথে কিভাবেপাওয়াযাবে। লেখা খুব ভালো।

  3. Post
    Author
  4. সুশান্ত সিনহা

    গল্পে গল্পে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জানা হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.