কিছু সিনেমার গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 11 minutes

১.

নায়কেরা সব সময় ভালো ভালো হয়ে থাকতে চান। বিশেষ করে এই উপমহাদেশে। হলিউডে এই ধারা বদলে গেছে আনেক আগে। নায়ক মাস্তান, গুন্ডামি করে-বাংলাদেশে এই ধারা সৃষ্টি করেছিলেন রাজ্জাক, রংবাজ সিনেমা দিয়ে। ভারতে সম্ভবত এই ধারার শুরুটা অশোক কুমারের হাত ধরে।

অশোক কুমারের করা সেই সিনেমার নাম সংগ্রাম। ১৯৫০ সালের পর্দা কাঁপানো সিনেমা। এক পুলিশ অফিসারের কাহিনী, যে কিনা অসৎ। সে মিথ্যা বলে, জুয়া খেলে, পছন্দ হওয়ায় একটা মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে জোড় করে বিয়েও করে। খারাপ নায়ক ভারতীয় সিনেমা জগতে সেই প্রথম। ভারতীয় সিনেমায় হিংস্রতা আর যৌনতার প্রবেশও এই সিনেমাটির হাত ধরে।

সিনেমাটি যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পেরেছিল। সংগ্রাম দেখে মানুষ তখন পুলিশ দেখলেই হাসাহাসি করত, নানা ধরণের কথা বলত। মোরারজি দেশাই তখন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী। ১৬ সপ্তাহ ধরে তখন সিনেমাটি হাউসফুল। মুখ্যমন্ত্রী সিনেমাটি নিষিদ্ধ করলেন। তারপর একদিন ডাকলেন অশোক কুমারকে। তিনি অশোক কুমারকে একজন ভাল পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করতে অনুরোধও করেছিলেন।
তবে এই ধারার সিনেমার মধ্যে ক্ল্যাসিক তকমা পেয়েছে গুরু দত্ত-দেব আনন্দের বাজি। দেব আনন্দ ও গুরু দত্ত যখন প্রতিষ্ঠা পেতে সংগ্রাম করছেন, তখন থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। দুজনের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল। যদি কখনো গুরু দত্ত পরিচালক হন তাহলে তাঁর সিনেমার প্রধান চরিত্রে নেবেন দেব আনন্দকে। আর দেব আনন্দ কখনো প্রযোজক হলে পরিচালক করবেন গুরু দত্তকে। দেব আনন্দ প্রযোজক হয়ে কথা রাখলেন। প্রথম সিনেমা ফ্লপ করল, পরের সিনেমার পরিচালক হলেন গুরু দত্ত। নাম বাজি। আবার পরে যখন গুরু দত্ত অন্য প্রযোজকের হয়ে পরিচালক হলেন, নায়ক নিলেন দেব আনন্দকে। সেই সিনেমা সিআইডি। দুটোই সুপার হিট।

বাজির নায়ক জুয়া খেলে, মানুষকে ঠকায়। ১৯৫১ সালে নায়কের এই চরিত্রদোষ দর্শকদের কাছে নতুন। ৪০ এর দশকে তখন দুনিয়াব্যাপী নতুন একটি ধারার সিনোমা তুমুল জনপ্রিয়। এর নাম Noir। হলিউড এর জনক না, তবে জনপ্রিয় করলো তারাই। সেই ধারার সিনেমা এখনও হয়, আর তাকে বলা হয় Neo-noir। সংজ্ঞাটা এরকম-

Neo-noir is a revival of the genre of film noir. The term film noir was popularized in 1955 by French critics Raymond Borde and Étienne Chaumeton. It was applied to crime films of the 1940s and 1950s, mostly produced in the United States, which adopted a 1920s/1930s Art Deco visual environment. The English translation is dark movie, indicating something sinister and shadowy, but also expressing a cinematographic style. The film noir genre includes stylish Hollywood crime dramas, often with a twisted dark wit. Neo-noir has a similar style but with updated themes, content, style, visual elements and media.

Neo-noir film directors refer to ‘classic noir’ in the use of tilted camera angles, interplay of light and shadows, unbalanced framing; blurring of the lines between good and bad and right and wrong, and thematic motifs including revenge, paranoia, and alienation.

বলিউডে এই ধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা বাজি। গুরু দত্তের পরিচালনা, সচীন দেব বর্মণের সুরে গীতা দত্তের গান, দেব আনন্দ ও গীতাবালির অভিনয়-সব মিলিয়ে এখনও বাজি দেখলে মুগ্ধ হতে হয়।

২.

আমার পছন্দ দেব আনন্দ। সময়ের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন সবসময়। হিন্দি বাণিজ্যিক সিনেমার ধারা বদলে বড় ভূমিকা ছিল তার। দেব আনন্দ সিনেমা পরিচালনা শুরু করেছিলেন ১৯৭০ সালে। ওয়াহিদা রেহমান নায়িকা। সিনেমাটি চলেনি। তবে তার মন ভেঙ্গে দিয়েছিল কোলকাতা। প্রেম পুজারি যুদ্ধের সিনেমা। প্রতিপক্ষ চীন ও পাকিস্তান। সিনেমায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ভিলেন হিসেবে দেখানোর কারণে কোলকাতায় সিনেমাটি চলতে বাধা দেয় সিপিআই (এম-এল), বিক্ষোভ করে, সিনেমার পোস্টার ছেড়া হয়। মন ঠিক করতে ও পরের সিনেমার গল্প লিখতে চলে যান নেপালে। সেখানে লেখা হয় হরে রামা হরে কৃঞ্চার কাহিনী। তখন নেপালে মাদক পাওয়া যেত সহজে। শুরু হয়েছে হিপ্পি কালচার। এরই পটভূমিতে লেখা সিনেমার গল্প।

তবে আমার আগ্রহ দম মারো দম গানটা। প্রথমে এই গানের সুর দেওয়ার কথা ছিল সচীন দেব বর্মণের। কিন্তু সিনেমার বিষয়বস্তু, মাদক, নেশা-এসব জেনে তিনি রাজী না হয়ে ছেলের দিকে ঠেলে দেন। সেই গান তো এখন ইতিহাস। শুরুতে লতা ও আশা গাইবেন এমনটি ভাবা হয়। পরে ঠিক হয় আশা ও উষা উত্থুপ গাইবেন। পরে উষাও বাদ পরেন।

গানটা নিয়ে অবশ্য দ্বিধায় ছিলেন পরিচালক দেব আনন্দ। তাঁর মনে হয়েছিল গানটি যথেষ্ট বিতর্ক তুলবে এবং সিনেমা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তিনি মূল সিনেমায় গানটি পুরো রাখেননি। বিতর্ক হয়নি, বরং দারুণ জনপ্রিয় হয়, যা এখনো আছে। শোনা যায় দেব আনন্দ জিনাতের প্রেমে পড়েছিলেন। তবে রাজ কাপুরের দেওয়া এক পার্টিতে দুজনকে একসঙ্গে দেখে মন বদল করেন দেব আনন্দ। প্রশ্ন উঠতে পারে, কি দেখেছিলেন?

দেব আনন্দকে নিয়ে বিখ্যাত গল্পটা বলি। হিন্দি সিনেমা জগতের হ্যান্ডসাম নায়কের একজন তিনি। শুরুতে তিনি সাদা শার্টের ওপর কালো স্যুট পড়তেন। এই পোশাকে নতুন এক ক্রেজ তৈরি করেন তিনি। এতটাই যে একবার দূর থেকে দেব আনন্দকে দেখে তাঁর কাছে যেতে না পেরে এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। বলা হয়, এরপর বোম্বে (এখন মুম্বাই) হাইকোর্ট কালো স্যুট পড়ার ক্ষেত্রে দেব আনন্দের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরপর নাকি দেব আনন্দ আর কখনো কালো স্যুট পড়েননি।

৩.

ম্যারাথন ম্যান ছবিটা নানা কারণে বিখ্যাত। এই সিনেমায় ডাস্টিন হফম্যান আর স্যার লরেন্স অলিভার একসঙ্গে অভিনয় করেছেন। এখানে লরেন্স অলিভার সাবেক নাজী ডাক্তার। তবে এই থ্রিলারটি বিখ্যাত আরেক কারণে। মেথড অভিনয়ের উদাহরণ দেওয়ার সময় এই সিনেমাটির কথা বলা হবেই।

‘মেথড অ্যাক্টিং হচ্ছে অভিনয়ের একটি কৌশল, যেখানে অভিনয়শিল্পী বাস্তব জীবনে তাঁর চরিত্রের মতো জীবন-যাপন করেন, এবং ঠিক সেই ধরনের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হন, যেন, তিনি তাঁর চরিত্রে অভিনয়ের সময় জীবনধর্মী অভিনয় ফুটিয়ে তোলেন’। সাদামাটা ভাবে বলা যায়, একদল অভিনেতা আছেন যারা মনে করেন অভিনয় করার আগে প্রস্তুতি নেয়া  প্রয়োজন। না খাওয়া মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করতে হলে না কম খেয়ে শরীরটাকে সেরকম বানাতে হবে।

টুটসি সিনেমা করার সময় ডাস্টিন হফম্যান মেয়ে সেজেই নাকি থাকতেন। বলা হয়, ক্র্যামার ভার্সেস ক্র্যামার সিনেমায় দুঃখের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে ডাস্টিন হফম্যান নাকি মেরিল স্ট্রিপকে শারিরীক আঘাত করেছিলেন। মার্লোন ব্রান্ডো বা ডেনিয়েল ডে লুইস মেথড অভিনেতার বড় উদাহরণ। তবে লরেন্স অলিভাররা মনে করতেন, অভিনয় করেই চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে হবে, অন্যকোনো ভাবে না। এই ধারার অভিনয়ের জনক লি স্ট্রাসবার্গ।

বিখ্যাত ঘটনাটি হচ্ছে, ম্যারাথন ম্যান সিনেমায় একটা দৃশ্য ছিল যেখানে ডাস্টিন হফম্যানের ভুমিকা ছিল তিন দিন ধরে জেগে থাকা একজন। শূটিং-এর সময় স্যার অলিভার দেখলেন ডাস্টিন হফম্যানকে অত্যন্ত টায়ার্ড লাগছে, মনে হচ্ছে অনেকদিন ঘুমায়নি। আসলেই চরিত্রের প্রয়োজনেই ঘুমাচ্ছিলেন না হফম্যান। টানা ৭২ ঘন্টা জেগে ছিলেন হফম্যান। তখন লরেন্স অলিভার সেই বিখ্যাত কথাটি বলেছিলেন, My dear boy, Why don’t you just try acting?

৪.

লুই বুনুয়েল বিশ্ব চলচ্চিচত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা নাম। স্পেনে জন্ম নেওয়া বুনুয়েল কাজ করেছেন, স্পেন, ফ্রান্স, আমেরিকা ও মেক্সিকোতে। বুনুয়েল নিয়ে লিখতে বসলে রীতিমত গবেষণা করতে হবে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে তার প্রভাব এতোটাই।
বেলে ডি জুর ফ্রেঞ্চ মুভি। মুক্তি পায় ১৯৬৭ সালে। মহাসুন্দরী ক্যাথারিন দানিউব আছেন মূল চরিত্রে। সেভেরিন সেরিজি (দানিউব) সুন্দরী গৃহিনী। স্বামী ডাক্তার, ভদ্র এবং শান্ত। সমস্যা এখানেই। সেরিজি এই শান্তভাবটায় খুশী নয়। বিশেষ করে শারিরীক সম্পর্কে ক্ষেত্রে। তাঁর রয়েছে এই সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরণের ফ্যান্টাসি।

স্বামীকে লুকিয়ে সেরিজি হাই ক্লাশ ব্রথেল হাউজে চলে যায়। নিজের নাম নেয় বেল্লে ডি জুর। সেখানে মেটে তার ফ্যান্টাসি। তবে বিপত্তি ঘটে অন্যখানে। গাংস্টার দলের তরুণ এক সদস্য মার্সেল প্রেমে পড়ে সেরিজি। প্রথমে সেরিজি বিষয়টি উপভোগ করলেও একসময়ে মহাযন্ত্রণা হয়ে দেখা দেয়। শুরু হয় নতুন সংকট।
বুনুয়েল অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে একটা মেয়ের মনস্তত্ব নিয়ে খেলেছেন। এটাকে ঠিক ইরোটিক মুভি বলা যাবে না। এমন কোনো দৃশ্যও নেই। আবার ইরোটিক মুভিও বটে। মুভিটা দেখার সময় অবশ্যই সবাইকে অনেককিছু ভাবাবে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী সিনেমা বেলে ডি জুর।

চার বোন। প্যাটরিয়া, দিদি, মিনার্ভা ও মারিয়া তেরেসা। ওদের বলা হয় মিরাবল সিসটার্স। জন্ম যথাক্রমে ১৯২৪, ১৯২৫, ১৯২৬ ও ১৯৩৫ সালে, ডমিনিক রিপাবলিকের সিরাস অঞ্চলে। বাবা এনরিক মিরাবল ও মা মারিয়া মেরসিডস রিয়েস। মিনার্ভা ও মারিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার্থে।


ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে তখন রাফায়েল ট্রুজিলার স্বৈরশাসন। মিরাবল বোনরা স্বৈরশাসক ট্রজিলোর বিরুদ্ধে নানা ধরনের আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে মিনার্ভা ছিল বেশি সক্রিয়। কারাগারেও যেতে হয়েছিল মিরাবল বোনদের। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর এই মিরাবল বোনদের বহনকারী মোটরগাড়ির দুর্ঘটনা ঘটে, তারা মারা যায়। বলা যায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদের হত্যা করা হয়। বলাই বাহুল্য ট্রজিলা ছিলেন এই ঘটনার হোতা। তার নির্দেশেই হত্যাকান্ড ঘটনো হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ট্রজিলোবিরোধী আন্দোলনকে উস্কে দেয়। এর এক বছরের মধ্যে ট্রজিলাও আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিল।

এরপর ল্যাটিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশ ২৫ নভেম্বর দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক নারী সহিংসতাবিরোধী দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছিল। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের ৫৪তম অধিবেশনে ২৫ নভেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

সেই মিরাবল বোনদের ঘটনা নিয়ে করা সিনেমার নাম ইন দ্য টাইম অব দ্য বাটারফ্লাইস ট্রজিলার নজরে পড়েছিল মিনার্ভা। কিন্তু মিনার্ভা এই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধেই আন্দোলনে নামে। গোপনে দল গঠন করা হয়। প্রথম প্রেম লিও তার নাম দিয়েছিল বাটারফ্লাই। সেই থেকে সবাই তাকে জানে বাটারফ্লাই বলে। মিনার্ভার চরিত্রে ছিলেন সালমা হায়েক।
ছবিটি দেখার পর এর প্রভাব সহজে কাটে না। এর অনেকগুলো কারণ আছে। ছবিটা দেখলেই অনেকের এরশাদ আমলের কথা মনে পড়বে। মেয়েদের প্রতি এরশাদের লালসা, স্বৈর শাসন, অত্যাচার, আন্দোলন-সবই আছে সিনেমাটিতে। বলা হয় ট্রজিলার হাতে ৫০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল ডোমিনিকান রিপাবলিকে।
একটা বাড়তি তথ্য দেই। ২০০০ সালে স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত হয় মারিও ভার্গাস য়োসা’র ঐতিহাসিক উপন্যাস La fiesta del chivo। ২০০১ সালে The Feast of the Goat নামে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের একনায়ক রাফায়েল ট্রুজিলো-এর শাসনকাল, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে য়োসা এই উপন্যাস রচনা করেছিলেন।

৬.

ফোর মান্থস, থ্রি উইক অ্যান্ড টু ডেজসমালোচকদের ব্যাপক পছন্দের ছবি। দেখার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল এ এমন কী। কিন্তু এরপর থেকেই মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগলো ছবিটা। এখনো আছে।


১৯৮৭ সালের ঘটনা। চসেস্কুর শেষ সময়। গর্ভপাত নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে জেল নিশ্চিত। দুই বান্ধবি গ্যাব্রিয়েলা ও ওটিলিয়া। গ্যাব্রিয়েলা অনাকাঙ্খিত ভাবে গর্ভবতী। সে এখন গর্ভপাত করাবে। তাকে সাহায্য করে ওটিলিয়া। তারা একটা হোটেল রুম ভাড়া করে। নিয়ে আসে জনৈক বেবকে। ওটিরিয়া ৪ মাস, তিন সপ্তাহ ও ২ দিনের গর্ভবতী। পুরো ঘটনাই এই নিয়ে। বিষয়টি সহজ হয় না। নানা ঝামেলা যুক্ত হতে থাকে। ওটিলিয়াকে শুতে হয় বেবের সাথে। নানা মানসিক টানাপোরেন শুরু হয় দুইজনের মধ্যে। এই টানাপোরেন ওটিরলিয়ার ছেলে বন্ধুর সাথেও দেখা দেয়।
সবমিলিয়ে অন্যরকম এক ছবি। পুরো ছবিটা মনের মধ্যে চাপ তৈরি করে।

৭.

কামিং হোম দেখে জন ভয়েটের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অস্কার পাওয়া সেই জন ভয়েটের মেয়ে এঞ্জেলিনা জলি। এঞ্জেলিনা জলি জাতিসংঘে বসিনিয়ার শুভেচ্ছা দূত। সেখানে যাওয়া আসার মধ্যেই তিনি কাছ থেকে দেখেছেন বসনিয়াকে। ইন দ্য ল্যান্ড অব ব্লাড এন্ড হানি সিনেমার পটভূমি বসনিয়ার যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। গল্পটা এঞ্জেলিনা জলির নিজের লেখা।

বসনিয়ার যুদ্ধ বা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার যুদ্ধ হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক যুদ্ধ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষ সংশ্লিষ্ট ছিলো, যার মধ্যে রয়েছে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং সেখানে বসবাসকৃত স্বতন্ত্র পরিচয়দাবীকৃত বসনীয় সার্ব ও বসনীয় ক্রোয়েট গোষ্ঠী, রেপুব্লিকা স্পোর্সকা ও হার্জে-বসনিয়া, যারা ছিলো যথাক্রমে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সহায়তাপুষ্ট।
এই যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যায় ও সোশালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়া ও সোশালিস্ট রিপালিক অফ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা নামের নতুন দুটো রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর মধ্যে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ছিলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, যার মোট জনগোষ্ঠীর ৪৪% মুসলিম বসনীয়, ৩১% অথোর্ডক্স সার্বীয়, এবং ১৭% ক্রোয়েশীয় ক্যাথলিক। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২-এ তাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পাস করে। কিন্তু এই ঘোষণা বসনীয়-সার্ব রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা প্রত্যাখান করে এবং নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে সার্বিয়ান সরকারের প্রধান স্লোবদান মিলসোভিচের সহায়তায় বসনীয়-সার্ব বাহিনী এবং যুগোস্লাভ পিপল’স আর্মি রাষ্ট্রটির সার্বীয় অংশ নিজেদের দখলে নিতে রিপাবলিক অফ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা আক্রমণ করে। এর পর খুব তাড়াতাড়িই সমগ্র বসনিয়া জুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়, এবং বসনিয়ার বিভিন্ন অংশের (বিশেষ করে পূর্ব বসনিয়ার) জাতিগত জনগোষ্ঠী এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। (উইকি থেকে)

১৯৯০ এর দশকের শুরুতে বলকান যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন একটানা তিন বছর আট মাস ধরে সারায়েভো ছিল এক অবরুদ্ধ শহর। শহরটি প্রধানত মুসলিম অধ্যূষিত। চারপাশের পাহাড়ের আড়াল থেকে যখন সার্বিয়ান বন্দুকধারীরা গোলাগুলি শুরু করলো, শহরের মুসলিম বাসিন্দারা তখন নিজেদের শহরেই জিম্মি হয়ে পড়ে।
তবে বসনিয়ার যুদ্ধে ছিল আরও একটি পক্ষ, এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে সার্বিয়ান এবং মুসলিমরা ছাড়াও জড়িয়ে পড়েছিল ক্রোয়েশিয়ানরাও। ১৯৯৫ সালে সংঘটিত হয়েছিল এই যুদ্ধের সবচেয়ে নারকীয় হত্যাকান্ড। স্রেব্রেনিৎসায় আট হাজার মুসলিম পুরুষ এবং বালককে হত্যা করা হয়।

জেনারেল রাটকো ম্লাদিচের নেতৃত্বে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেখানে এই অভিযান চালানো হয়, সেটি ছিল জাতিসংঘের ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল। যুদ্ধের বিশ বছর পরও বসনিয়া জুড়ে এর ক্ষতচিহ্ন এখনো স্পষ্ট। অনেক ক্ষতিগ্রস্থ অনেক ভবন সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধের ভয়ানক স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেন নি অনেক মানুষ।

বসনিয়ায় জাতিগত দ্বন্দ্বের নিরসন হয়েছে সেটাও বলা যাবে না, তার আঁচ এখনো টের পাওয়া যায়। বসনিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূত পিটার সোরেনসনের ভাষায়, এই যুদ্ধ ধ্বংস করেছিল মানুষে মানুষে বিশ্বাস, এত ভয়ংকর একটা ঘটনা কোনদিনই ভোলা যাবে না, মুছে ফেলা যাবে না। (বিবিসি থেকে)

এবার সিনেমায় যাই। ডেনিয়েল বসনিয়ান সার্ব আর আজলা বসনিয়ান মুসলিম। যুদ্ধের আগে দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল কেবল। তারপর শুরু হয় যুদ্ধ, সময়টা ১৯৯২। সার্বরা ঝাপিয়ে পড়ে মুসলিমদের ওপর। আজলাকে বন্দি করে আনা হয় আরও অনেকের সঙ্গে। মূলত যৌনক্রিতদাসী বানানোর হয় তাদের।
সেখানেই আবার দেখা হয় ডানিয়েলের সঙ্গে। তার বাবা সার্ব জেনারেল। ডানিয়েল রক্ষা করে আজলাকে। তবে আজলাকে সব সময় রক্ষা করতে পারে না ডানিয়েল। তাই আজলা পালায়, আবার ধরাও পড়ে। প্রতি আক্রমন করে বসনিয়ার মুসলমানরা। আসে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী বাহিনী। কিন্তু কমে না সার্বদের হত্যাযজ্ঞ।
ডানিয়েলের বাবা মানতেই পারে না যে, একজন মুসলিম মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে তার ছেলে। ফলে ধর্ষিত হয় আজলা। তারপরেও প্রেম থেকে যায়।

এটাই মূল কাহিনী। শেষটা আর বলছি না। কারণ প্রেমের জয়-এ ধরণের অতিসরলীকরণ করা হয়নি সিনেমাটিতে। আগ্রহীরা শেষটা দেখে থমকে যাবেন। ইন দ্য ল্যান্ড অব ব্লাড এন্ড হানি এখানেই অন্যরমক। ডানিয়েল একবারও ভোলে না যে, সে সার্ব। আজলাও ভুলতে পারে না যে সে বসনিয়ান মুসলিম। মূল পরিচয় থেকে কেউই সরে আসেনি সিনেমাটিতে। ছবিটি গোল্ডেন গ্লোবের জন্য মনোনীত হয়েছিল। সার্বরা একদমই পছন্দ করেনি এটি। ভাল লেগেছে ইন দি ল্যান্ড অব ব্লাড এন্ড হানি।

৮.

রাজনীতি বা গৃহযুদ্ধের পটভূমির সিনেমা আমার প্রিয় ভয়েস ইনোসেন্টস সে রকম এক সিনেমা। এল সালভাদরের গৃহযুদ্ধ চলেছিল ১২ বছর। ১৯৭৯ তে শুরু, শেষ ১৯৯০। এর মধ্যে মারা যায় ৭৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে অনেক নারী আর শিশুও ছিল।


দেশটির সরকার ছিল সামরিক সরকার। বলাই বাহুল, তাদের সমর্থক ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাঁচটি বাম গেরিলা গ্রুপ এক জোট হয়ে সামরিক সরকারের বিপক্ষে নেমেছিল। সেই সময়ের কাহিনী ভয়েস ইনোসেন্টস।
গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল শিশুদের ব্যবহার। ১২ বছর হলে ধরে নিয়ে যেত আর্মি, হাতে তুলে দিত অস্ত্র। অসংখ্য শিশু মারা গেছে এভাবেই।


চাভার বাবা ওদের ফেলে চলে গেছে আমেরিকায়। মা, এক বোন আর আরেক ভাই নিয়ে চাভা থাকে। তার বয়স ১১ পার হয়েছে। ১২ হলেই নিযে যাবে। স্কুলে আর্মি আসে। যাদের বয়স ১২, তুলে নিয়ে যায়।
ভয়াবহ সেই যুদ্ধের অসাধারণ এক সিনেমা এটি। যুদ্ধের ভয়াবহতা, চাভার বেচে থাকা, যুদ্ধে যাওয়া, অনেক শিশুর করুণ পরিণতি চোখে পানি নিয়ে আসে।
এরকম ভয়াবহ সিনেমা খুব কমই আছে।

৯.

রাইনো সিজন আরেক ধারার সিনেমা। সাহিল একজন কবি, ইরানের। সাহিলের স্ত্রী, মিনা একজন কর্ণেলের মেয়ে। তাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয় ইরানের বিপ্লবের পর। ক্ষমতা দখল করে খোমেনি। কবিতা লেখার দায়ে জেলে যেতে হয় সাহিলকে। তাঁর ৩০ বছরের জেল হয়। মিনার হয় ১০ বছর।


৩০ বছর পর ছাড়া পেয়ে স্ত্রীকে খুঁজতে থাকে সাহিল। মিনা এর মধ্যে চলে গেছে তুরস্কে। স্ত্রীর জন্য সাহিল যায় ইস্তাম্বুলে। পথে পরিচয় হয় এক পতিতা মেয়ের সঙ্গে।
গল্পে আছে আরেকজন। সে ছিল এক সময়ে মিনাদের বাসার ড্রাইভার। কিন্তু পছন্দ করে মনিবের মেয়েকে। ঘটনাক্রমে সরকার বদল হলে সেই ড্রাইভার হয়ে যায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন। নানা ধরণের ঘটনা ঘটে।
মিনার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মনিক বেলুচ্চি। ছবিটা বিশাল এক ধাক্কা দেয়। সুতরাং যারা দেখবেন তারা সেই মানসিকতা নিয়েই দেখবেন।

১০.

এ হিস্টরি অব ভায়োলেন্স আমার খুবই প্রিয় আরেক সিনেমা। সিনেমাটি ২০০৫ সালের। ডেভিড ক্রোনেনবার্গ-এর ইষ্টার্ণ প্রমিস দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এটা তারও আগের সিনেমা। টম স্টল একটা রেস্তোরাঁ চালায়। নিরীহ মানুষ, সুখি সংসার। একদিন তার রেস্টুরেন্টে ডাকাত পড়ে। আত্মরক্ষায় দুই ডাকাতকেই দক্ষ হাতে খুন করে টম। এরপরই ঘটনা ঘটতে থাকে। খুঁজে খুঁজে হাজির হয় অনেকে। বলা হয় টমের অতীত আসলে অন্যরকম। সংসারে দেখা দেয় টানাপোড়েন।


উইলিয়াম হার্ট অল্প সময়ের জন্য অভিনয় করেছেন। কিন্তু অসাধারণ। যেমন এড হ্যারিস। ভায়োলেন্স নির্ভর, কিন্তু ভীষণ অন্যরকম এক সিনেমা।

১১.
দি বোম্বের টকিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। ভারতীয় সিনেমা জগতের আজকের এই অবস্থানের বড় কৃতিত্ব এই প্রতিষ্ঠানটির। হিমাংশু রায়, রাজনারায়ন দুবে আর দেবিকা রানী-এই তিনজন ছিলেন এর মূল প্রতিষ্ঠাতা। বোম্বে টকিজ দক্ষ ও যোগ্যদের জড়ো করেছিলেন ভাল ভাল সিনেমা করার জন্য। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় বোম্বে (এখন মুম্বাই) যান ১৯৩৮ সালে। তিনি ছিলেন বোম্বে টকিজের অন্যতম চিত্রনাট্যকার। সেখানে তাঁর যাওয়ার একটা গল্প আছে, ছাড়ারও আছে।


হিমাংশু রায় ঠিক করেছিলেন চিত্রনাট্যের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কাউকে আনবেন। প্রথমে কথা বলা হল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু তিনি রাজী হলেন না। কারণ তিনি কেবল সাহিত্যিকই থাকতে চান, আর তাঁর সাহিত্যের রসদ সংগ্রহের জায়গা বীরভূম, বোম্বে নয়। এরপর তিনি নাম বললেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তারপর যোগ দিলেন ব্যোমকেশের লেখক। লিখতে শুরু করলেন কঙ্গন ও আজাদের মতো বিখ্যাত হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য।
এবার তাঁর বোম্বে টকিজ ছেড়ে দেওয়ার গল্পটা বলি। প্রায় ১০ বছর ছিলেন তিনি সেখানে। তাঁর বড় ছেলের নাম ছিল বেনু। সেই বেনু একদিন বড় একটি ওষুধ কোম্পানির চিফ কেমিস্টের চাকরি পেলেন। চাকরিকে স্থায়ী হওয়ার পরেরদিনই শরদিন্দু ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘বাবা, তুমি এখন থেকে আমাকে খাওয়াতে পারবে তো?’ ছেলে অবাক হয়ে এই প্রশ্নের কারণ জানতে চাইলে শরদিন্দু বললেন, ‘এই বোম্বে টকিজের কাজের জন্য মনের মতো সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারছি না। তুমি আমাকে খাওয়াবার ভার নিলে আমি ষোলো আনা সাহিত্য সেবা করতে পারবো।’
তারপর সেইদিনই বোম্বে টকিজ ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

 

 

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.