সুরের মাঝে অসুর তুমি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 4 minutes

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কিছু দেশ আছে কম উন্নত। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী এরা স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি। এসব দেশের বড় লক্ষ্য হচ্ছে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়া। ১৯৭৫ সালে এলডিসিভুক্ত হয় বাংলাদেশ। ২০২১ সালে এসে সেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পেল বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে বড় অর্জন।

এ রকম একটি অর্জন উৎসবের সঙ্গে বরণ করতে হয়। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় পর হাজির হয়েছিলেন সাংবাদিকদের সামনে। তবে সংবাদ সম্মেলনটি যখন চলছিল, তখন দেশ বিক্ষুব্ধ আরেক ঘটনায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি জেলে মারা যান লেখক মুশতাক আহমেদ। কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিনি বন্দী ছিলেন ১০ মাস ধরে। এর পরের রাতে, ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পায় এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ। সংগত কারণেই উন্নয়ন ও অর্জনের সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিকের প্রশ্নে ঘুরেফিরেই এসেছিল মুশতাকের মৃত্যু ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গটি। উন্নয়নের আলোচনায় মৃত্যুর মতো বিষয় চলে আসাটা কয়েকজন সাংবাদিকের পছন্দ হয়নি। এ যেন সুরের মাঝে অসুরের প্রবেশ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য বলেছিলেন, ‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর।’ স্বাধীনতার ৫০ বছর বয়সে বাংলাদেশের এ অর্জন অবশ্যই সীমার মধ্যে অসীম, কিন্তু আপন সুরটা ঠিক বাজল না। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র এক জায়গায় মিলল না বলেই হয়তো। অর্থনীতিতে এক ধাপ এগিয়ে গেলেও কেবল মতপ্রকাশের অপরাধে জেলের ভেতরে মৃত্যুর ঘটনা উন্নয়ন আগে, না গণতন্ত্র—এ আলোচনা নতুন করে সামনে নিয়ে এল। যদিও এ বিতর্কের কোনো অর্থ নেই। কেননা, বিশ্বব্যাপী এ নিয়ে একাধিক সমীক্ষা বা গবেষণা হয়েছে। কোনোটিতেই বলা হয়নি যে উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে। বরং গণতন্ত্রকেই সবাই এগিয়ে রাখেন।

২০০৫ সালে গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের প্রায় সব দেশকে নিয়ে বড় একটি সমীক্ষা করে। সমীক্ষায় সারা বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষই বলেছিল, গণতন্ত্রই সর্বোৎকৃষ্ট শাসনপন্থা। তবে ৪৮ শতাংশ বলেছিল, তাদের দেশে যে নির্বাচন হয়, তা সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে কি না, এ নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে। কেবল ৩০ শতাংশ বলেছিল, তারা গণতন্ত্র থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে। ২০১৫ সাল ছিল সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের সময়সীমা। এ সময়সীমা সামনে রেখে ২০১৪ সালে জাতিসংঘ ১৯৪টি দেশের সাড়ে সাত লাখ মানুষের ওপর একটি জরিপ করে। বিশ্বের নাগরিকেরা সেখানে পাঁচটি অগ্রাধিকারের কথা বলেছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের সুযোগ, সৎ ও দায়বদ্ধ সরকার এবং সুলভে পুষ্টিকর খাদ্য। একই সময়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশের সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে আরেকটি জরিপ করা হয়। সেই জরিপে সরকারগুলোর ৩১টি অগ্রাধিকারের মধ্যে ২৪ নম্বর ছিল সুশাসন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের চাওয়া আর সরকারের চাওয়ার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।

সাত বছর আগে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফে কাজ করা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ আনা লেকভাল। নাম ডেভেলপমেন্ট ফার্স্ট, ডেমোক্রেসি লেটার? (আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র?)। বইটিতে তিনি ‘হাইব্রিড রেজিম’-এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর কিছু প্রবণতার কথা বলেন। গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মাঝখানের ধূসর এক অবস্থানে থাকা দেশগুলোকে বলে হাইব্রিড রেজিম। প্রবণতাগুলো হলো দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, নির্বাচনের গুরুত্বকে খাটো করা, বিপক্ষ দলকে নিয়ন্ত্রণ, তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসনকে খাটো করা এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা।

বইটিতে অন্যের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন আনা লেকভাল। কথাটি হচ্ছে, ‘আনাড়িরাই কেবল নির্বাচনের দিন নির্বাচনে কারচুপি করে।’ আসলে হাইব্রিড রেজিমের দেশগুলো নির্বাচনে কারচুপির আয়োজন আগে থেকেই করে রাখে, নির্বাচনের দিন কিছু করতে হয় না। এখন বলে রাখি, যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতিবছর গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে। আর সেই সূচকে বাংলাদেশ হাইব্রিড রেজিমেরই অন্তর্ভুক্ত। এই যে গণতন্ত্রের মধ্যেই একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে থাকা, স্বৈরতান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থার মাঝামাঝিতে অবস্থান, এটাই তো সুরের মাঝে অসুর।

আলোচনাটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়েও হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বিষয় এলডিসি থেকে উত্তরণ হলেও সাংবাদিক কান উন্মুখ ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জেলে মুশতাক আহমেদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন শোনার জন্য। কিন্তু কেউ কেউ (সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাংবাদিকেরা) হয়তো ভাবছিলেন, উন্নয়নের পথে থাকতে হলে এ রকম কিছু ঘটনা ঘটবেই। আর উন্নয়ন তো হচ্ছেই, তাহলে এত কথা বলার দরকারই বা কী। সুতরাং এ রকম এক অর্জনের দিনে মুশতাকের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন করাটাই তো সুরের মাঝে অসুর।

গ্রন্থটিতে আনা লেকভাল কিন্তু লিখেছেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম। অনেকেই বলে থাকেন, একজন মানুষের যত ধরনের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার রয়েছে, এর মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যেই অন্য সব অধিকার পাওয়া সম্ভব। কেননা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলে মানুষ সরকারের ভুলত্রুটি দেখিয়ে দিতে পারে, সঠিক কাজটি করতে সরকারকে চাপে রাখতে পারে। ঠিক এ কারণেই কর্তৃত্ববাদী সরকার বা হাইব্রিড রেজিমে থাকা দেশগুলোর লক্ষ্যই থাকে গণমাধ্যমকে দমিয়ে রাখা।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তখন বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারসহ মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন। নরওয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফাল্যান্ড ও মার্কিন অর্থনীতিবিদ জ্যাক আর পার্কিনসন ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ: দ্য টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট নামে একটি বই বের করেছিলেন লন্ডন থেকে। সেখানে তাঁরা বলেছিলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়নের পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি তার উন্নয়ন সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে, যেকোনো দেশই উন্নতি করতে পারবে। তাঁরা আরও বলেছিলেন, পাকিস্তানের দুই অংশ মিলে একটি ভালো অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারবে, কিন্তু আলাদা হয়ে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না।

বাংলাদেশের এসব সমালোচক হয়তো সে সময় এ দেশটিকেই সুরের মাঝে অসুর ভেবেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। গত এক যুগে অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অর্জন বিস্ময়কর। কিন্তু এই সুরের মাঝেও অসুর আছে। দেশের আর্থিক খাত সেই অসুর। শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি দিয়ে। তারপর হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। আর্থিক খাতে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটেছে। ধ্বংস করা হয়েছে বেসিক ও ফারমার্স ব্যাংককে, চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। আর্থিক খাত দেখভাল করার দায়িত্ব যে বাংলাদেশ ব্যাংকের, বড় সমস্যা সেখানেও। গত এক যুগের অর্থনীতির অগ্রগতি নিয়ে যতবার আলোচনা হবে, ততবার বলতে হবে ব্যাংক বা আর্থিক খাতের সুশাসনের অভাবের কথা, কেলেঙ্কারির কথা, অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেওয়ার কথা।

আক্ষরিক অর্থেই এবার বরং সুর-অসুরের মধ্যে থাকা যাক। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এর ডেপুটি গভর্নর ছিলেন সিতাংশু কুমার (এস কে) সুর চৌধুরী। অবসর নেওয়ার পরও সরকার ও ব্যবসায়ীদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন সুরকে ছাড়তে চায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে আবার তিনি ফিরে আসেন, ব্যাংক সংস্কারের উপদেষ্টা থাকেন ২০২০ পর্যন্ত। অত্যন্ত প্রভাবশালী ডেপুটি গভর্নর ছিলেন তিনি। আর এখন জানা যাচ্ছে, সবকিছু অত্যন্ত ভালোভাবে ‘ম্যানেজ’ও করতে পারতেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম তাঁর যোগ্য সঙ্গী। তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান। দেখা যাচ্ছে ঘুষের বিনিময়ে অনিয়ম ঢাকা যায় বলেই প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের পক্ষে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়েছে। যে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল লুটপাট বন্ধ করা, তারাই বরং হলো লুটপাটের সহযোগী।

একসময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা ছিল অনেক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোচনা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে। সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ে এখনকার আলোচনার বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক দুই গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ও সালেহউদ্দিন আহমেদ এ ঘটনায় অস্বস্তিতে আছেন ও বিব্রত হয়েছেন। তবে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা বিব্রত, তা অবশ্য জানা যায়নি।

সুর থাকলে কখনো কখনো বেসুরও থাকবে। কিন্তু সুরের নামে অসুর থাকলেই বিপদ। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি অসুর বধ করা সম্ভব হবে, উন্নয়ন ততটাই টেকসই হবে।

প্রকাশ: প্রথম আলো, ০৯ মার্চ ২০২১

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.