মিশরের দীনা, রানধা কামেল ও আরও কিছু গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 3 minutes

দীনার গল্প

মিশরে আমাদের গাইড ছিল দীনা। মিশরের মেয়ে। সে নিজেই জানালো তার বয়স ২৭, বিয়ে করেনি, কারণ একজন পারফেক্ট পুরুষ সে খুঁজে পায়নি। তবে এটা বুঝলাম তার পারফেক্ট পুরুষের খবর আছে। এক সেকেন্ডও কথা না বলে থাকতে পারে না। হয় আমাদের সাথে কথা বলছে, না হয় ড্রাইভারের সাথে, আর তা না হলে ফোনে।

দীনা বেশির ভাগ মিশরীয় মেয়েদের মতো হিজাব পড়ে না। মেয়েরা হিজাব পড়লেও দেখতে অবশ্য খারাপ লাগে না। মুখটা খুবই সুন্দর বলেই হয়তো। আরেকটা কারণ হলো, মিশরের মেয়েরা চুল ঢাকতে যতটা আগ্রহী, বুক ঢাকতে ততটা না। আর এ দিক থেকে তারা যথেষ্ট সম্পদশালী বলা যায়। ডলি পার্টনের যোগ্য অনুসারী। মরুভূমির দেশ, বৃক্ষ কম কিন্তু বক্ষের অভাব নেই।
দীনার কথাই বলি। দুপুরে খেতে গেছি এক অথেনটিক ইজিপশিয়ান রেস্টুরেন্টে। তীব্র ক্ষুধা। সবাই মোটামুটি কব্জি ঢুবিয়ে খাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি। আমার উল্টো দিকে বসলো দীনা। বসেই সে প্যান্টের বোতামটা খুলে হালকা হল। তারপরই দেখলো যে আমি তাকিয়ে আছি। মনে হলো খানিকটা লজ্জা পেয়েছে। আমি প্যান্টের বেল্ট খুলে অনেক ছেলেকে খেতে বসতে দেখেছি। কিন্তু কোনো মেয়েকে এই প্রথম দেখলাম।

সিক্রেট অব ডেজার্ট

দীনা আমাদের নিয়ে গেল মিশরের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত পারফিউমের দোকানে। এসব দোকানে বিক্রির ধরণটা আলাদা। আলাদা আলাদা বিশাল বিশাল রুম, অনেকটা বাড়ির ড্রয়িং রুমের মতো। গেলেই সেখানে বসানো হয়, চা বা পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন হয়। তারপর একজন এসে পারফিউম তৈরির কায়দা কানুন থেকে শুরু করে যাবতীয় তথ্য দেওয়া শুরু করেন। হাত বাড়িয়েই রাখতে হয়। একের পর এক ফেভারের পারফিউম হাতে মাখিয়ে দেয়। সেই সুবাস সহজে যায় না।

secrets.jpg


এক সময় বের করা হলো সিক্রেট অব ডেজার্ট। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠল দীনা। এক বাক্যে বুঝিয়ে দিল এটি হচ্ছে আসলে ইজিপশিয়ান ভায়াগ্রা। মানুষজন এটাই কিনতেই এখানে আসে। সিক্রেট অব ডেজার্ট মূলত দুটা পারফিউমের একটা প্যাকেজ। একটি ছেলেরা ব্যবহার করবে এবং এর গন্ধে মধ্যরাতে সঙ্গী মেয়েটি হবে ওয়াইল্ড ক্যাট। আর মেয়েদেরটার গন্ধে ছেলেটি হবে ক্রেজি হর্স।
মধ্যরাতে আমরা যারা এমনিতেই ক্রেজি হর্স হই তারা আর এই পারফিউম কিনলাম না।

রানধা কামেল

ভারতীয় হলে অবলীলায় বলা যেত রাধা কামেল। মিশরীয় বলে সম্ভবত রানধাই হবে। রাধা বা রানধা যাই হোক, তিনি যে একজন কামেল মহিলা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একারণেই হয়তো নামের শেষে কামেল যুক্ত আছে।
বিকেলেই দীনা ঘোষণা দিল যে আমাদের ভাগ্যটা খুব ভাল। কারণ আজ নীল নদের রিভার ক্রুজে বেলি ডান্স দেখাবে রানধা কামেল এবং এই কামেল মহিলা মিশরের সেরা বেলি ডান্সারদের একজন। মিশরে গেলে বেলি ডান্স না দেখা অপরাধের মধ্যে পড়ে। আর বেলি ডান্স হলো রিভার ক্রুজের অপরিহার্য অঙ্গ।
আমাদের বুড়িগঙ্গাকে দখল না করে যদি দুপাশ কংক্রিট দিয়ে আটকানো যেতো তাহলে এই নদীকে কোনো মতেই নীল নদের চেয়ে অসুন্দর লাগতো না। আর সেখানে রিভার ক্রুজ করলে পর্যটকও নিশ্চই কম পাওয়া যেতো না।

nn_0.jpg


নীল নদের রিভার ক্রুজ অ্যান্ড ডিনার। অত্যন্ত উচুঁমানের আয়োজন, পাঁচ তারকা বলা যায়। শুরুতে কেবল গান। বেশির ভাগ স্পানিশ গান গাইলেন তিনজন মিলে। সামনে ডান্স ফোর। দর্শকরা এসে নাচলেন প্রতিটি গানের সঙ্গে। এরপর এলো আরেকজন, ঘাগরা পড়া। অসাধারণ এক পারফরম্যান্স। একটা মানুষ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে টানা ৪০ মিনিট খালি ঘুরলো। সাথে নানা ধরণের কসরত। আর সবশেষ আকর্ষণ রানধা কামেল। আহা! এবার একক বক্ষ মেলা। ছোট একটা কাপড় দিয়ে খানিকটা ঢাকার চেষ্টাটা অবশ্য দেখার মতো। আর বেলির আন্দোলন তো আছেই।
রানধা কামেলের বেলি ডান্স। আমার ক্যামেরায় তোলা।

মাছময় মিশর

ছোটবেলায় মাছ খেতাম না, মাছের মধ্যে মাছ মাছ গন্ধ। আলেকজান্দ্রিয়া ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত। মাছ ধরা এখানকার একটা বড় পেশা। সাগরের পাশেই রেস্টুরেন্ট। এখানে মন ভরে মাছ খেলাম একদিন। সি ফুড। বরফ দেয়া মাছ রাখা থাকে। এখান থেকে মাছ বেছে নিতে হয়। তারপর তারা সেই মাছ ফ্রাই করে দেয়। প্রচুর সালাত, সামান্য রাইস আর যথেষ্ট মাছ-এই হচ্ছে তাদের খাবার। একেকজন মনে হয় ৩-৪ কেজি করে মাছ খায়। আলেকজান্দ্রিয়ায় মাছ খেয়ে মজা পেলেও তিন বেলা নিশ্চই তা ভাল লাগে না।

light.jpg

আসার আগের দিন একটা অফিসিয়াল ডিনার ছিল। কায়রোর সবচেয়ে বড় রেস্টেুরেন্টের একটি। মাছ খেয়ে খেয়ে টায়ার্ড হয়ে গেলাম। একটার পর একটা মাছ আসছেই। সব ফ্রাই। ওরা গ্রেভি খায় না। এতো মাছ কি আর খাওয়া যায়?
কথা বলে জানলাম এই রেস্টুরেন্ট প্রতিদিন ৫ টন মাছ বিক্রি করে, পাইকারী না। এখন বোঝেন কী পরিমাণ মাছ খায় তারা।

সিটি অব ডেড

কায়রো শহরের মধ্যেই একটি জায়গা। মূলত কবরখানা। আগে মিশরীয়রা কেবল সাড়ে তিন হাত জায়গায় কবর দিতো না। রীতিমত কয়েক কামরার বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হতো। এক রুমে হয়তো কবর, বাকি রুমগুলো থাকতো খালি।
মিশরে আয় বৈষম্য প্রকট। অনেক গরীব মানুষ সেখানে। থাকার জায়গা নেই। এইসব মানুষ এক সময় থাকা শুরু করলো এই কবরখানায়। পর্যটকদের এখানে ঢোকা নিষেধ। সরকারও আড়াল করে রাখতে চায় জায়গাটা, উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছে। গা হিম করা এক পরিবেশ এখানে। এর নাম সিটি অব ডেড। এ যেন এক আরেক মিশর।

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.