ভ্যাটের খোঁচা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 4 minutes

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অকপটে অনেক কিছুই বলেন। শিক্ষার্থীদের ওপর ভ্যাট কেন—এ নিয়ে তিনি কিন্তু আসল কারণটি ঠিকই বলে দিয়েছেন। গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘নতুন রাস্তাঘাট আমরা আর করছি না। বিদ্যমান সড়কের মান ভালো করছি। স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া আরও অনেক খাত থেকে আমাদের ওপর হুকুম আসছে, সে খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। সে টাকাটা কোথা থেকে আসবে? সেটার জন্য রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। আর রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন জায়গায় খোঁচা দিতে হয়। তেমনই একটি হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ।’

আসল কথা হচ্ছে, সরকার তার ব্যয় অনেক বেশি বাড়িয়ে ফেলেছে। আর এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে এখানে-সেখানে খোঁচা মারা ছাড়া অর্থমন্ত্রী বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে বিকল্প তেমন কিছু নেই। একটু ব্যাখ্যা করে বলি। চলতি অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য হচ্ছে ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। আর এই লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, বাজেটের এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী। প্রশ্ন উঠতেই পারে, অর্থমন্ত্রী কেন এত বড় রাজস্ব পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, যেখানে দেশে এর আগে সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ রাজস্ব আদায় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল ২০০৭-০৮ অর্থবছরে। মনে রাখতে হবে, সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল ছিল সেটি।
মূল আলোচনার আগে বাজেট প্রণয়ন পদ্ধতি নিয়ে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত বাজেট আর রাষ্ট্রীয় বাজেটের মধ্যে বড় একটা পার্থক্য আছে। আর সেটি হচ্ছে ব্যক্তি আগে আয়ের পরিকল্পনা করে, সে অনুযায়ী ব্যয়ের বাজেট তৈরি করে। রাষ্ট্র করে ঠিক উল্টোটা। আগে ব্যয়ের পরিকল্পনা, তারপরেই আয়ের উৎস খোঁজা। এটাই নিয়ম।
সরকারের বাজেট পরিকল্পনাটি মূলত শুরু হয় জানুয়ারি মাসে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাজেট নিয়ে একটি অনুবিভাগ এবং বাজেট ও পরিকল্পনা নামে আরেকটি অধিশাখা আছে। তাদের কাজ হচ্ছে দেশের জাতীয় বাজেট নিয়ে যাবতীয় কাজ করা। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের সম্ভাব্য চাহিদা চাওয়া হয়। সন্দেহ নেই, বিশাল বিশাল চাহিদাপত্র আসে, সেখান থেকেই ঠিক করা হয় নতুন অর্থবছরের বাজেট। যেমন ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট হচ্ছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার। এর পরের কাজ মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। ব্যয়ের হিসাবটি তাদের দিয়ে আয়ের উৎসগুলো বের করতে বলা হয়। বিপত্তির শুরু এখান থেকেই। বিশেষ করে সবাইকে খুশি করার নীতি নিলে বাজেটটি হয়ে পড়ে বিশাল। এতে হিমশিম খেতে হয় এনবিআরকে। আর রাজস্ব আয়ের চাপ পড়ে করদাতাদের ওপর। বেতন-ভাতায় যদি ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়, তাহলে এর বিনিময়ে সাধারণ নাগরিকেরা কী সেবা পাচ্ছে, তা অবশ্যই জানতে হবে

 

সরকারের ব্যয় কোথায় বাড়ে? এর একটি অংশ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি। সরকার অনেক কথা বললেও বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবিরই বলা যায়, নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে কম। ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় জিডিপিতে বিনিয়োগের হার ঠিক রাখতে এডিপির পরিমাণ কিছুটা বাড়াতে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে। যেমন এবারের এডিপি ৯৭ হাজার কোটি টাকা। তবে ধরে নেওয়া যায়, শেষ পর্যন্ত কাটছাঁট করে এই এডিপি বাস্তবায়িত হবে ৮৫ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার মতো। বাজেটের বাকি প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার পুরোটাই হচ্ছে অনুন্নয়ন ব্যয়। এই অর্থ কমানোর সাধ্য অর্থমন্ত্রীর নেই। বরং ক্রমেই এটি বাড়ছে, ক্ষেত্রবিশেষে বৃদ্ধি পাওয়াটা নিয়ন্ত্রণহীন বলা যায়। কারণ, অনুন্নয়ন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশই হচ্ছে বেতন-ভাতা। অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে এবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। এতে এক লাফে চলতি অর্থবছরে ব্যয় বাড়বে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট খরচ হবে প্রায় সাড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে বাড়বে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কেবল বেতন-ভাতা দিতেই ব্যয় হবে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা।
এরপর রয়েছে সুদ পরিশোধ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে প্রতিবছর ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করতে হয়। ঋণ নেওয়ার পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে, এতে বাড়ছে সুদ পরিশোধের চাপ। এবার এ জন্য ব্যয় করতে হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আরও রয়েছে ভর্তুকি, মঞ্জুরি, অনুদান ইত্যাদি। এতেও ব্যয়ের পরিমাণ বিশাল।
এই যে অনুন্নয়ন ব্যয়ের এত বিশাল চাপ, এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? সরকারের কাছে আলাদা কোনো গৌরী সেন নেই। সরকারের জন্য গৌরী সেন হচ্ছে জনগণ, যাঁরা কর দেন। এমনিতেই আমাদের দেশে কর দেন খুব কম মানুষ। যাঁরা দেন না, তাঁদের কাছ থেকে আদায় করার সাহস এনবিআরের নেই। ফলে মূলত যাঁরা দেন, তাঁদের ওপরই করের বোঝা পড়ে বেশি। আর একবার যদি সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, সেখান থেকে সহজে পিছিয়েও আসতে পারে না এনবিআর। নানা কৌশলে তা রেখে দিতে হয়। আগে হলে না হয় আমদানি শুল্ক বাড়ানো যেত। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সেটি আর সম্ভব নয়। বরং আমদানি শুল্ক কমাতে হচ্ছে। আয়করের বেশির ভাগ অংশই আদায় হয় উৎসে। সুতরাং অর্থমন্ত্রী বা এনবিআরের হাতে ভ্যাটের খোঁচা ছাড়া আর কোনো পথ জানা নেই।
ব্যয়ের চাপ সামলাতে রাজস্ব আদায়ে সরকার কতটা মরিয়া, তার উদাহরণ দিই। মুঠোফোনে ব্যবহৃত সিমের ওপর ৩০০ টাকা কর বসায় এনবিআর। মুঠোফোন অপারেটররা দীর্ঘদিন ধরে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। এতে নাকি নতুন গ্রাহক বাড়ছে না। অপারেটরদের ভর্তুকি দিয়ে সিম বিক্রি করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার পর অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেটে এই শুল্ক কর কমিয়ে ১০০ টাকা করেছেন। সন্দেহ নেই, এতে এনবিআরের রাজস্ব আয় বেশ খানিকটা কমে যাবে। তাহলে কীভাবে অর্জিত হবে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা? বাজেট পাসের দিন দেখা গেল, মুঠোফোন ব্যবহারের ওপর ১ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে। এর উল্লেখ কিন্তু বাজেটে ছিল না। বলা হলো, এতে সরকারের আয় বাড়বে ১৪০ কোটি টাকা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সিম কার্ডের ওপর কর কমানো হলেও সারচার্জ ঠিকই বসল ভোক্তার ওপর। যে কর আগে অপারেটররা দিয়ে দিত, তা এখন ভোক্তা দিচ্ছে।
আরও মজার ঘটনা ঘটেছে চিনি নিয়ে। বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ না করেই অপরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক টনপ্রতি দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে চার হাজার টাকা এবং পরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক সাড়ে চার হাজার থেকে বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করা হয়। অথচ বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বললেন, এ রকম কিছু তিনি বক্তৃতায় বলেননি। তাহলে কীভাবে এল? সংবাদ সম্মেলনেই এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান অর্থমন্ত্রীকে তখন জানান, ‘স্যার, রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী আপনার বক্তৃতায় এটা রাখা হয়নি, তবে ছকে রয়ে গেছে।’ এরপর ৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ৩০০ বিধিতে চিনির ওপর শুল্ক আরোপ ভুল বলে বিবৃতি দেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। গত ২৬ আগস্ট এনবিআর অপরিশোধিত, পরিশোধিত সব ধরনের চিনির ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) বসিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। অর্থাৎ, চিনির ওপর শুল্ক ঠিকই বসল। কারণ রাজস্ব সরকারকে আদায় করতেই হবে।
এটা ঠিক, আমাদের কর দিতে হবে। তা না হলে সরকার কীভাবে চলবে? দেশের অগ্রগতি কীভাবে হবে? মানুষ কর দেবে, কিন্তু করের টাকা কোথায় খরচ হবে, সেটি জানা যেমন জরুরি, তা দৃশ্যমান করাটাও প্রয়োজন। বেতন-ভাতায় যদি ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়, তাহলে এর বিনিময়ে সাধারণ নাগরিকেরা কী সেবা পাচ্ছে, তা অবশ্যই জানতে হবে। বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ঋণ নিয়ে যদি ৩৫ হাজার কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হয়, তাহলে ঋণের অর্থ কোথায় কোথায় খরচ হলো এবং তা দিয়ে দেশ কী পেল, তা-ও পরিষ্কার হতে হবে। সরকারের ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক সন্দেহ আছে বলেই কর দিতে এত অনীহা।
সবশেষে কর নিয়ে পুরোনো গল্পটাই বলি। ছোট্ট ছেলেটা বিধাতার কাছে রোজ প্রার্থনা করে, ‘বিধাতা আমাকে মাত্র পাঁচ শটা টাকা দাও। আমার আর কিছু চাই না।’ কিন্তু টাকা আর আসে না। তারপর বুদ্ধি করে একদিন সে বিধাতাকে একটা চিঠি লিখল। সেই চিঠি ডাকঘরে পড়ে রইল কিছুদিন। তারপর একদিন সহৃদয় কোনো একজন পড়ে থাকা চিঠিটা খুলে পড়লেন এবং পাঠিয়ে দিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। আশ্চর্য ঘটনা হলো, চিঠিটা শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর হাতেই পড়ল। তিনিও মজা করে ২০০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন, সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর একটা স্বাক্ষর। ২০০ টাকা পেয়ে খুশি হলো ছেলেটি। হাত তুলে মোনাজাত ধরে বলল, ‘বিধাতা, টাকাটা অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে কেন পাঠালে, তিনি তো ৩০০ টাকা ট্যাক্স কেটে রেখেছেন।’

১৭ সেপ্টেম্বর,২০১৫ প্রথম আলোয় প্রকাশিত

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.