ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা কত বেতন পান, কেন পান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 5 minutes

পদোন্নতি পেয়ে ব্যাংকের এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) হয়েছেন। ভাবলেন নতুন এক প্রস্থ স্যুট বানানো যাক। গেলেন শহরের সবচেয়ে ভালো দরজির কাছে। মাপ দিয়ে এলেন। তারপর নতুন পদে যোগ দেওয়ার আগের দিন স্যুট-প্যান্ট বাসায় এনে দেখেন, কোথাও কোনো পকেট নেই। দরজিকে গিয়ে ধরলেন, পকেট নেই কেন? দরজি এক গাল হেসে বলল, আপনি না ব্যাংকে কাজ করেন? পকেট দিয়ে কী করবেন? ব্যাংকাররা কি কখনো নিজের পকেটে হাত দেয়?
নিছকই একটি রসিকতা। কিন্তু কৌতুকটা মনে পড়ে গেল রাষ্ট্রমালিকানাধীন তিন ব্যাংকের নতুন তিন এমডির নিয়োগ পাওয়ার সংবাদটি পেয়ে। সোনালী, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে এরই মধ্যে যোগও দিয়েছেন তিন নতুন এমডি। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল যে সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডিরা বেতন পাবেন সাড়ে চার লাখ টাকার কিছু বেশি, রূপালী ব্যাংকের এমডি পাবেন কিছুটা কম, ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
ব্যাংক বা বড় প্রতিষ্ঠানের এমডি ও প্রধান নির্বাহীর (সিইও) বেতন-ভাতা নিয়ে আলোচনা এখন সারা বিশ্বেই স্বীকৃত। অনেক প্রতিষ্ঠানই আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়। বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। বছর শেষে মিলিয়ে দেখা হয় কে কতটা সফল। বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এ নিয়ে শেয়ারহোল্ডাররা আলোচনা করেন। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতায় তিরস্কার জোটে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমস গত ১২ জুলাই বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিইওদের বেতন-ভাতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতন-ভাতা পাওয়া ব্যাংকের সিইও হচ্ছেন জেপি মরগান চেজের প্রেসিডেন্ট ও সিইও জেমি ডিমন। তিনি ২০১৫ সালে পেয়েছেন ২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশের টাকায় ২১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেতন ১৫ লাখ ডলার, ৫ লাখ ডলার নগদ বোনাস এবং লভ্যাংশ হিসেবে ২ কোটি ৫ লাখ ডলারের শেয়ার। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম এই বড় ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে ১২ শতাংশ এবং শেয়ারের দর বেড়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ। এই সাফল্যের কারণে এবার তঁার বেতন-ভাতা বাড়ানো হয় ৩৭ শতাংশ।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা পান গোল্ডম্যান সাকসের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লয়েড ব্ল্যাংকফেইন। তিনি পান ২ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। এরপরই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইও বিল উইনটারস, তিনি ২০১৫ সালে সব মিলিয়ে পেয়েছেন ২ কোটি ২৪ লাখ ডলার। শীর্ষ পাঁচের এরপরের দুই নাম হচ্ছে মরগান স্টানলির চেয়ারম্যান ও সিইও জেমস গোরম্যান (২ কোটি ১২ লাখ ডলার) এবং ক্রেডিট সুইস গ্রুপের সিইও তিজানে থিয়াম (২ কোটি ১১ লাখ ডলার)। এখানে বলে রাখা ভালো, ২০১৫ সালে আগের বছরের তুলনায় গোল্ডম্যান সাকসের লয়েড ব্ল্যাংকফেইনের বেতন ৪ শতাংশ এবং মরগান স্টানলির প্রধান নির্বাহীর বেতন ৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারাই এর কারণ।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতিমালাও আছে। সেখানে বলা আছে, প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা প্রদানে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা, ব্যবসায়ের পরিমাণ ও উপার্জন ক্ষমতা, ব্যক্তির যোগ্যতা ও অতীত কর্ম সফলতা, বয়স, অভিজ্ঞতা এবং সমপর্যায়ের অন্যান্য ব্যাংকের অনুরূপ পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রদত্ত বেতন-ভাতাদি বিবেচনায় আনতে হবে। এ ছাড়া উৎসাহ বোনাস প্রদান বছরে ১০ লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না।

বাংলাদেশে ব্যাংকের সিইওরা কে কত বেতন-ভাতা পান, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না। পরিচালনা ব্যয়ের একটি হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংককে দিতে হয়। সেখানে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতার হিসাব দেওয়া থাকে। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতন-ভাতা পান বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা। যেমন তালিকার ১ নম্বরে থাকা বেসরকারি একটি ব্যাংকের এমডি বছরে পান ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর পরের চার প্রধান নির্বাহী বেতন-ভাতা পান যথাক্রমে ১ কোটি ৭০ লাখ, ১ কোটি ৬৫ লাখ, ১ কোটি ৬০ লাখ এবং ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি হাতেই রয়েছে। এরপরে নাম ধরেই না হয় সবার বেতন–ভাতার তথ্য লেখা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ২০১৫ সালে পেয়েছেন ৫৭ লাখ টাকা, সোনালী ও জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী পেয়েছেন ৪৮ লাখ টাকা। তবে ২০১৫ সালে রূপালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা ছিল খুবই কম, মাত্র আট লাখ টাকা। জানা গেল, এ বছর থেকে রূপালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে।

১২ বছর আগেও সরকারি ব্যাংকের এমডি বা সিইওরা বেতন পেতেন সরকারি বেতন–কাঠামো অনুযায়ী। বিশ্বব্যাংকের ঋণে একটি সংস্কার কর্মসূচির আওতায় এই বেতন-ভাতা বাড়ানো হয় ২০০৪ সাল থেকে। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হলে এমডি নিয়োগ দেওয়া হয় চুক্তিভিত্তিক হিসেবে। ফলে বাড়ে বেতন ও ভাতা।

বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাজ্যের সাহায্য সংস্থা ডিএফআইডির অর্থায়নে ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ‘শিল্প প্রবৃদ্ধি ও ব্যাংক আধুনিকীকরণ’ প্রকল্পটি সরকার হাতে নিয়েছিল ২০০৪ সালে। কথা ছিল সোনালী ব্যাংক রেখে বাকি তিনটি ব্যাংককে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকের বেসরকারীকরণ হবে সবার আগে। ব্যাংকটির দায়-দেনার হিসাব প্রস্তুত করতে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সোনালী ও জনতায় নিয়োগ দেওয়া হয় একদল পরামর্শক এবং অগ্রণী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয় একটি ব্যবস্থাপনা টিম।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসকে। প্রতিষ্ঠানটির নয় সদস্যের একটি টিম ২০০৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে অগ্রণী ব্যাংকে কাজ শুরু করে। সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এ জন্য প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসকে দেওয়া হয় ৬৫ লাখ ৭৬ হাজার ২৬৯ ডলার বা ৩৮ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৯ টাকা। ২০০৮ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয় দফায় সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদকে আবারও ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ জন্য তাঁকে দেওয়া হয়েছিল আরও ২ লাখ ১১ হাজার ডলার বা ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

সংস্কার কর্মসূচির আওতায় পাঁচ বছরে ব্যাংক চারটি থেকে সব মিলিয়ে পরামর্শকেরা নিয়েছেন প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতেই বেসরকারীকরণ থেকে সরে এসে ব্যাংকগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নয়, ব্যাংকগুলো চালানো হয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। ফলে একের পর এক ঘটতে থাকে নানা ব্যাংক কেলেঙ্কারি। কেবল চুক্তিভিত্তিক এমডি নিয়োগের নীতিটাই বহাল থাকে। অর্থাৎ তাঁরা বেতন-ভাতা পেতে থাকেন আগের মতোই।

বেতন-ভাতা বাড়লেও এমডিরা এর বিনিময়ে কী দিয়েছেন? প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। প্রথম আলোতেই তিন ব্যাংকের বিদায়ী এমডিদের একটি আমলনামা প্রকাশিত হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের এমডি ছিলেন প্রদীপ কুমার দত্ত। হল-মার্ক কেলেঙ্কারির পর বেহাল সোনালী ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন চার বছর আগে, ২০১২ সালে। এরপরের চার বছরে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে ঋণ অবলোপন ১ হাজার ১৯ কোটি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৮ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৯৯৫ কোটি টাকা, আর ২০১৫ সালে নিট মুনাফা কমে মাত্র ৫৮ কোটি টাকা।

আইন না মানার বড় উদাহরণ ছিলেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ। ২০১০ সাল, আবদুল হামিদের দায়িত্ব নেওয়ার বছরে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৩৫১ কোটি টাকা, আর বিদায়ী বছরে তা হয় মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। ২০১০ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আবদুল হামিদ।

এম ফরিদ উদ্দিন এমডি হিসেবে রূপালী ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলেন ২০১০ সালে। ওই বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭৯০ কোটি টাকা, ছয় বছর পরে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ২০১০ সালেও রূপালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৬০ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে তা কমে হয়েছে ২২ কোটি টাকা।

এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে নতুন তিন এমডির লক্ষ্য কী হবে? ব্যাংকটিকে ভালো করা, নাকি গতানুগতিকভাবে চলতে দেওয়া? এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, কোনো ধরনের লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া ছাড়া সরকারের পছন্দ অনুযায়ী এমডি নিয়োগে ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি ভালো হবে না। এভাবে ব্যাংক চালানোর বড় ধরনের খেসারত ইতিমধ্যেই দেশকে দিতে হয়েছে। তবে এটা ঠিক, একা এমডির পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়, যদি না সরকারের সমর্থন ও অঙ্গীকার না থাকে। নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়ার আগেই সরকারের এটি ভাবার দরকার ছিল। কিন্তু এমডিদের যেভাবে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাতে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম। অথচ আর্থিক খাতে বড় বড় কেলেঙ্কারির পর এবারই সুযোগ ছিল নতুন চিন্তাভাবনার।

তাহলে শুরুর গল্পের পরের অংশটা এবার বলি। নতুন স্যুট-প্যান্ট পরে হাজির হলেন ব্যাংকের সেই নতুন এমডি। দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পরই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এমডিকে নিয়ে বৈঠকে বসল। দুই বছরের মেয়াদে এমডির টার্গেট কী হবে তা কাগজে-কলমে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। এরপর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছোট একটা উদ্দীপনামূলক ভাষণ দিলেন। বললেন, ‘প্রথম দিন এসেই বড় বড় টার্গেটের কথা শুনে ঘাবড়ে যাবেন না। আপনি যেন উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করছি।’ এই বলে তিনি ১০ লাখ টাকার একটি চেক বের করে নতুন এমডির হাতে দিলেন। তারপর নাটকীয়ভাবে বললেন, ‘আগামী দুই বছর যদি আপনি খুব ভালো কাজ করেন, ব্যাংকের মুনাফা যদি লক্ষ্য অনুযায়ী বাড়াতে পারেন, খেলাপি ঋণ যদি আরও কমে, তাহলে কথা দিচ্ছি এই চেকে তখন আমি অবশ্যই স্বাক্ষর দেব।’

সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য এই ব্যবস্থাটিই এখন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বেতন–ভাতা আরও বাড়ুক। কিন্তু ব্যাংককে কোথায় নিয়ে যেতে হবে, তারও টার্গেট ঠিক করে দিতে হবে। লক্ষ্যপূরণে পুরস্কার, না হলে তিরস্কার।

শওকত হোসেন: সাংবাদিক।

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.