বিশাল বাজেটের সত্য-মিথ্যা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 5 minutes

এডওয়ার্ড জন ডালটন ১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই থেকে ১৯৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তখনো তিনি বাজেট বক্তৃতা শেষ করেননি, তার আগেই দ্য স্টার পত্রিকার সন্ধ্যাকালীন সংস্করণে বাজেট হুবহু ছাপা হয়ে মানুষের হাতে চলে যায়। বাজেট ফাঁস হওয়ার এই দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন ডালটন। বাজেট ফাঁস নিয়ে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ওই একটাই। তবে বাজেট ফাঁস নিয়ে মজার আরও কিছু ঘটনা আছে। ১৯৩৬ সালে ব্রিটেনেরই এক মন্ত্রী জিমি থমাস বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের এক সদস্য এবং ব্যবসায়ীদের কাছে বাজেটের তথ্য ফাঁস করে দেওয়ায় পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। বলা হয়, তিনি নাকি গলফ খেলার সময় ‘টি আপ’ বলে চিৎকার দিয়েছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে চায়ের ওপর শুল্ক বাড়ছে।
বাজেটের তথ্য গোপন রাখাটাই রীতি। এ কারণে সাধারণত ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের লেনদেনের পরেই বাজেট উপস্থাপন করা হয়। মূলত শুল্ক পরিবর্তনের তথ্য ব্যবসায়ীরা আগেভাগে জেনে গেলে রাষ্ট্রের জন্যই বিপদ। একশ্রেণির ব্যবসায়ী চেষ্টা করেন বাজেটের তথ্য আগেভাগে জেনে নিতে। আর গণমাধ্যমও চেষ্টা করে বাজেট ফাঁস করার কৃতিত্ব নিতে। অবশ্য বাজেট ফাঁস কতটা কৃতিত্বের, সে বিতর্কও আছে—বিশেষ করে নৈতিক দিক থেকে। একজন সংবাদকর্মীর কৃতিত্ব অনেক ব্যবসায়ীর অবৈধ মুনাফার কারণ হতে পারে।

১৯৯৬ সালে ব্রিটেনেরই রক্ষণশীল দলের অর্থমন্ত্রী কেনেথ ক্লার্কের বাজেট আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডেইলি মিরর বাজেট আগাম পেয়েও প্রকাশ না করে নৈতিকতার কথাটি মাথায় রেখে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। তবে গণমাধ্যমের জন্য ভালো কাজটি করেছিলেন ব্রিটেনের আরেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন (২০০৭-১০)। সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার একটি নীতি চালু করেছিলেন, যাতে গণমাধ্যম বাজেট রিপোর্ট ভালোভাবে করতে পারে। কথা ছিল গণমাধ্যম রিপোর্ট তৈরি করে রাখলেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরে তা প্রকাশ করা যাবে। এখানেও বিপত্তি ঘটেছিল একবার। ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকাটির বাজেট সংখ্যার প্রথম পাতার ছবি তুলে ওই পত্রিকাটিরই এক সাংবাদিক টুইটারে প্রকাশ করে দেন। অথচ তখনো বাজেট বক্তৃতা শুরু হয়নি। সেটি ছিল ২০১৩ সালের ঘটনা। এ জন্য ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হয়।

আমাদের এখানেও একটা সময়ে বাজেট গোপন রাখার চেষ্টা ছিল। কিন্তু এখন আর সেটি নেই। এখন তো বাজেটের মৌলিক কাঠামো আগেভাগে সরকারিভাবেই প্রচার করা হয়। এবারের বাজেট কত টাকার হবে—এ কথা তো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই একাধিকবার বলেছেন। সম্ভবত বিশাল অঙ্কের একটা বাজেট দেওয়ার আত্মপ্রসাদ থেকে তিনি এর আকারের কথা বলে দেন। যদিও কত টাকার বাজেট তা ফাঁস হলে অর্থনীতিতে কোনো বিপদ তৈরি হয় না। এ থেকে ব্যবসায়ীরা অন্তত কোনো সুবিধা পান না। যদিও পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বাজেটের আকার নিয়ে এত কথাবার্তা হয় বলে কখনো চোখে পড়েনি। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, বাজেটের পরের দিন ভারতের পত্রপত্রিকায় খুঁজেও বাজেটের আকার জানা যায় না। কেননা, কত কোটি টাকার বাজেট, তাতে সাধারণ মানুষের কিছুই যায়-আসে না। বরং কার জন্য বাজেটে কী আছে, সেটাই আসল বিষয়।

এবার বাজেটের আকার নিয়ে বিতর্কের মজার দিকটি বলি। ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেটকে সমালোচনা করা হচ্ছে উচ্চাভিলাষী বলে। অর্থমন্ত্রী নিজেও তা বলেন। বাজেটটি কি আসলেই অনেক বড়? হ্যাঁ বা না দুই উত্তরই কিন্তু দেওয়া যায়। বিষয়টি হচ্ছে আমি কোনটি বলতে চাই।

আসুন, আমরা প্রথমে এটিকে বিশাল এক বাজেট বলি। স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের প্রথম বাজেটটি ছিল ৭০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। এমনকি ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বাজেটটি ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকার। সে তুলনায় এবারের বাজেট নিঃসন্দেহে অনেক বড়। সুতরাং অর্থমন্ত্রী গর্ব করতেই পারেন।

আসুন, এবার বলি এ বাজেটটি মোটেই বড় নয়। এ ক্ষেত্রে আমরা বাজেটকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে তুলনা করতে পারি। দেখা যাচ্ছে এই অর্থমন্ত্রীরই দেওয়া ২০০৯-১০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল জিডিপির ১৬ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট জিডিপির ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর নতুন বাজেট ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও শেষ পর্যন্ত তা সংশোধন হয়ে ১৬ শতাংশের ঘরেই থাকবে। বাজেট বাস্তবায়নের প্রবণতা সে কথাই বলে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে কী করে বলি বাংলাদেশের বাজেট অনেক বড়?

আরেকটি তথ্য দিলে ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হবে। আর সেটি হচ্ছে জিডিপির তুলনায় সরকার যে অর্থ খরচ করে, তা এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ দিই, তারা খরচ করে ৪০ শতাংশের বেশি। পাশের দেশ ভারতের সরকারি ব্যয় দেশটির জিডিপির প্রায় ২৭ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২৮ শতাংশ, এমনকি সাব-সাহারার আফ্রিকার বাজেট তাদের জিডিপির ২৩ শতাংশ। সুতরাং বলাই যায়, আমরা যতই আত্মপ্রসাদ লাভ করি না কেন, আমাদের বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট।

মাঝামাঝি পথ নিয়ে বলা যায় আমাদের বাজেটটি প্রয়োজনের তুলনায় ছোট হলেও বাস্তবায়ন ক্ষমতার তুলনায় বড়। প্রশ্ন হচ্ছে কেন অর্থমন্ত্রীকে ক্ষমতার তুলনায় বড় বাজেট করতে হচ্ছে। অঙ্কটা পরিষ্কার। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় এবার ব্যয় হবে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা, অবসর-ভাতা ও আনুতোষিকে খরচ আরও প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা, সুদ পরিশোধে ব্যয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, সাহায্য ও মঞ্জুরি আরও প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। এসব বরাদ্দ কিছুতেই কমাতে পারবেন না অর্থমন্ত্রী। আবার বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির। মোট বিনিয়োগ ঠিক রাখতে অর্থমন্ত্রীকে বাড়াতে হচ্ছে সরকারি বিনিয়োগ। ফলে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার উন্নয়ন বাজেট তৈরি করতে হচ্ছে, ব্যয়ের গুণগত মান যা-ই হোক।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাজেটের আকার যে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে সেটি আসলে অনিবার্য। এভাবে বলা যায়, সরকারের বাজেটের ব্যয়ের কাঠামোটি আসলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। আর এ কারণেই বাজেট বেড়ে যাচ্ছে। এখানে আত্মপ্রসাদের সুযোগ কম। বরং সুদ পরিশোধ ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, সেটি অনেক দুশ্চিন্তার।

ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ নেই, আবার আয়ও বাড়ছে না। এটা আসলেই লজ্জার যে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বে সর্বনিম্ন বাংলাদেশেই। কয়েক বছর ধরে অর্থমন্ত্রী এই অনুপাত বাড়ানোর চেষ্টা করলেও খুব সফল হননি। এবার ভরসা করেছিলেন নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আইনের ওপর। সম্ভবত অর্থমন্ত্রী নতুন মূসক আইন ধরেই রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন মূসক আইন এক বছর পিছিয়ে দিলেও আয়ের প্রাক্কলন একই রাখা হয়েছে। আর এতেই বিপদটা তৈরি হয়েছে। কর আয়ের নতুন কোনো খাত তৈরি না করেই ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে—যাঁরা নিয়মিত ও সৎভাবে কর দেন, তাঁদের ওপরেই চাপছে করের বোঝা। সম্ভবত এ কারণেই এবারের বাজেটকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন সমর্থন দেয়নি। আর যাঁরা কর দেন না বা কম দেন, তাঁদের কাছ থেকে আদায়ের চেষ্টা খুব বেশি নেই। সেটি হলে সৎ করদাতারা অন্তত খানিকটা স্বস্তিতে থাকতে পারতেন। বাজেটের আকার যে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে সেটি আসলে অনিবার্য। এভাবে বলা যায়, সরকারের বাজেট ব্যয়ের কাঠামোটি আসলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। আর এ কারণেই বাজেট বেড়ে যাচ্ছে

আমাদের বাজেটের সমস্যা আরেকটি আছে। দেখা গেছে আমরা বাজেটের আকার নিয়ে যতটা উৎসাহী, বাজেটের আসল তথ্য নিয়ে ততটা নয়। আমরা বাজেটের পরিসংখ্যান ফাঁস করি ঠিকই, কিন্তু বাজেট উপস্থাপনের সময় রাজস্ব কার্যক্রমের অনেক কিছুই বলি না। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই সম্ভবত অর্থবিলে পরিবর্তনের সংখ্যা বেশি। আয়কর আইনেই আছে ৪৮টি পরিবর্তন। এমন অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে একজন ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীকে আগের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। কিন্তু বাজেট বক্তৃতা
পড়ে সেটি বুঝতে পারা যায় না। সরকার থেকে কয়েক বছর ধরে নিজে নিজে কর বিবরণী জমা দিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তনগুলো যদি খোলামেলা বলে না দেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে তা সম্ভব। বাজেটে যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য দুই হাজার কোটি রাখা হয়েছে, তা বলতেই বা কী সমস্যা? সমালোচনার ভয়ে? দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় না বলা কথাও কিন্তু কম নয়। এই লুকোচুরি কেন? রবীন্দ্রনাথকে ধার করে বলি, বুঝি গো আমি বুঝি গো তব/ছলনা-/যে কথা তুমি বলিতে চাও/সে কথা তুমি বল না।

অনেক কিছু গোপন করলেও অর্থমন্ত্রী বাজেট নিয়ে তাঁর উচ্চাভিলাষকে একেবারেই গোপন করেননি। আমাদের শিল্পানুরাগী অর্থমন্ত্রী যে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন, অত্যন্ত আশাবাদী একজন মানুষ—এ কথা একাধিকবার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি লিখেছিলেন, জগতে সকলি মিথ্যা, সব মায়াময়,/স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়। উচ্চাভিলাষ অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। আবার বড় স্বপ্ন না দেখতে পারলে বড় হওয়াও যাবে না। সমস্যা হচ্ছে স্বপ্নের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে সেটি। ফলে বাজেট পেশের সময় অনেক আশা ও স্বপ্নের কথা বলা হলেও অর্থবছর শেষে দেখা যায় বাজেটটি ছিল আসলেই অহেতুক উচ্চাভিলাষী। ফলে অর্থমন্ত্রীকেই নিজ হাতে তাঁর দেওয়া বাজেটেরই বড় ধরনের সংশোধন করতে হয়।

রাজস্ব আয়ের বাধা, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সংকট—এসব সমস্যার সমাধান না করে প্রতিবছর নিয়ম করে স্বপ্ন দেখলে তা হবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সেই কবিতাটির মতো—

জল পড়ে, পাতা নড়ে, এই নিয়ে পদ্য

লিখে ফেলে ভাবলাম, হল অনবদ্য।

ছাদ ছিল ফুটো তা ত পারিনিকো জানতে

জেগে উঠে বসে আছি বিছানার প্রান্তে।

জুন ২৭, ২০১৬

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.