বিপ্লবের ভেতর–বাহির ২ : রুহুল ও রাহেলা পর্ব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 2 minutes

বিপ্লবের ভেতর–বাহির: ২

রুহুল এবং রাহেলা। দুজনই বিবাহিত। রুহুল পেশায় একজন প্রকৌশলী। কিন্তু চাকরিতে মন নেই। রাজনীতিতে মগ্ন, তাও আবার প্রথাগত রাজনীতিতে নয়। সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য তৈরি হচ্ছেন। পিকিং-এর গরম হাওয়া তার শরীর আর মন জুরে। স্ত্রী আছে, আছে দুটি সন্তান।
রাহেলার জীবন একদমই অন্য রকম। রাহেলা অন্য মেরুর মানুষ। রাহেলারও দুই সন্তান। রাহেলার স্বামী সামরিক বাহিনীতে কর্মরত, নাম ব্রিগেডিয়ার হাকিম। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা বা এনএসআইর মহাপরিচালক।
রাহলারও এই জীবন পছন্দের নয়। রাহেলার আগ্রহ লেখালেখিতে। বেগম পত্রিকায় লেখেন। প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার মানুষ। কিন্তু রাহেলার এসব চিন্তা বা কাজে সমর্থন নেই স্বামীর। ফলে এক প্রকার গৃহবন্দী রাহেলা। এক পর্যায়ে তো বাইরে যাওয়াই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রাহেলার আসল নাম জাহানারা হাকিম। তাঁর মামাতো বা খালাতো ভাই রোকন উদ্দিন। তাঁর আরেক নাম সূর্য রোকন। মালিবাগে তখন তৈরি হয়েছে মাওসেতুং চিন্তাধারা গবেষণাগার। এই কেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। সেই সময়ে জাহানারার সঙ্গে দেখা হল রুহুলের। এই দেখা হওয়াটার একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে। ভবিষ্যতের অনেক ঘটনার পেছনে রুহুল আর রাহেলার দেখা হওয়াটার একটি প্রতিক্রিয়া আমরা পরে দেখতে পাবো।

রোকনের সাহায্যে বাসা থেকে পালালেন জাহানারা। সময়টা ১৯৬৯ সাল। এবার রুহুল আলমের প্রকৃত নাম বলি। আমাদের এই রুহুলই সিরাজ সিকদার। সিরাজ সিকদার আর জাহানারা পরস্পরকে পছন্দ করলেন, ভালবাসলেন। এবং উত্তপ্ত সেই সময়ে এক সঙ্গে থাকাও শুরু করলেন। জাহানারা নাম পালটে হলেন খালেদা। এনএসআই তখন হন্যে হয়ে খুঁজছে জাহানারাকে। একপর্যায়ে জেনে গেল খালেদাই এখন জাহানারা। আবার নাম পালটাতে হল। খালেদা এবার হলেন রাহেলা। মজার ব্যাপার হলো, তখন সিরাজ সিকদারও নতুন একটি নাম নিয়েছিলেন। সেই নামটি ছিল হাকিম ভাই। সিরাজ সিকদার পরে যখন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি গঠন করেন, তখন রাহেলার নাম হয়ে যায় জাহান, কমরেড জাহান।
হুট করে এর আগে দরিদ্র কৃষকের মেয়ে রওশন আরাকে বিয়ে করেছিলেন সিরাজ সিকদার। সেই সম্পর্ক কখনোই মধুর ছিল না। শেষপর্যন্ত টেকেওনি। অন্যদিকে জাহানারা কবিতা লিখতেন। প্রগতিশীল। দুজনের মধ্যে একটা বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হতে সময় নেয়নি। সিরাজ সিকদার ও জাহানারা মিলে পরবর্তীতে লেখালেখি করেছেন, বিপ্লবের কবিতাও লিখেছিলেন। এনএসআই তখন দুজনকেই খুঁজছে। এ কারণে রুহুল ও রাহেলাকে বার বার শেল্টার পালটাতে হয়েছিল।

 

সূর্য রোকন লিখেছেন, সিরাজ সিকদার তখন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এনএসআই সিরাজ সিকদারকে না পেয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সদস্যদের ধরে কাফকা আইনে জেলে দিয়েছিল। কাফকা মামলা হল, পরের বউকে অপহরনের অভিযোগ।
এনএসআই শেষ পর্যন্ত রুহুল ও রাহেলাকে গ্রেপ্তার করতে সফল হয়নি। এর মধ্যেই ব্রিগেডিয়ার হাকিম আরেকটি বিয়ে করেন। সব চেয়ে বড় কথা হল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সিরাজ সিকদার বরিশালের পেয়ারা বাগানে নতুন দল করেন। সেই গোপন বিপ্লবী দলে যোগ দেন জাহানারা হাকিম। পুরোটা সময় সিরাজ সিকদারের সঙ্গে ছায়ার মতো তিনি। পরে তারা পার্টির অনুমোদন নিয়ে বিয়ে করেন, তাদের একটি ছেলেও হয়।
সিরাজ সিকদারের একসময়ের সহযোগি সূর্য রোকন লিখেছেন মজার একটি তথ্য। ১৯৭৩ সালে সিরাজ সিকদার আর্মির হাতে মাদারিপুরে একবার ধরা পরেছিলেন। কিন্তু সেসময়ের বঙ্গবন্ধু সরকারের উপর বিতশ্রদ্ধ আর্মির কমান্ডার মহসিন তাদের ছেড়ে দেন। এরপর দুজন পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যান।
দিনটি ছিল ১৯৭৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিন সিরাজ সিকদার চট্টগ্রামে ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। আর সাভারে সিরাজ সিকদার খুন হন ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি। ( কেউ বলেন তাকে শেরে বাংলা নগরেই হত্যা করা হয়েছিল। বাংলাদেশে এটাকেই প্রথম ক্রসফায়ারের ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। গল্প সেই একই।পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করতে বাধ্য হয়েছিল পুলিশ। এ গল্প এখনো চলছে)। এরপর জাহানারাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কুমিল্লায় তাঁর ভাইয়ের কাছে। আর তাদের একমাত্র সন্তান অরুণকে দেওয়া হয় সিরাজ সিকদারের বাবার কাছে, ঢাকায়।
আগেই বলেছি, সিরাজ ও জাহানারার বিয়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল দলটির মধ্যে। দলের মধ্যে প্রথম বিরোধ তৈরি হয় এই বিয়ে নিয়েই। এই বিরোধের ফল হয়েছিল মারাত্বক। দলের মধ্যে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। সম্ভবত, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নিজেদের মধ্যে প্রথম খতমের ঘটনা ঘটে এই বিয়েকে কেন্দ্র করেই, পার্টির সিদ্ধান্তে। সেই ঘটনায়ও জড়িয়ে আছে আরেক প্রেম কাহিনী। সেই ঘটনা পরের পর্বে

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Comments

  1. যাযাবর

    এই পর্বও দারুণ লাগলো। অরুণের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published.