বাংলা ভাষায় অর্থনীতি চর্চা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 8 minutes

বঙ্গদেশে অর্থনৈতিক চিন্তার পথিকৃত রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কৃষকদের দুরবস্থা, সরকারি রাজস্বনীতিতে ত্রুটি, সরকারি ব্যয়ের আধিক্য, ভারত থেকে বৃটেনে সম্পদের বহির্গমন ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনার পথ খুলে দিয়েছিলেন রামমোহন রায়। কিন্তু রামমোহন রায় অর্থনীতি সম্বন্ধে বাংলায় কিছু লিখেছিলেন বলে জানা নেই, যদিও অন্যান্য নানা বিষয়ে তাঁর বাংলা রচনায় শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজন-স্বীকৃত।
ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত একটি স্মারক বক্তৃতায় হুবহু এ কথাই বলেছিলেন। স্মারক বক্তৃতার বিষয় ছিল বাংলায় অর্থনীতি বিস্তার ও চর্চার ইতিহাস। বক্তৃতাটি হাতে নিয়ে নিয়ে একজন সাংবাদিক হিসাবে প্রথম যে কথাটি মনে হয়েছিল, তা হচ্ছে রেফারেন্স তো পাওয়া গেলো। কিন্তু হতাশ হতেও সময় লাগেনি। কারণ পুরো বক্তৃতাটাই সঙ্গত কারণে ভারতের প্রেক্ষাপট থেকে লেখা। আর বক্তৃতাটি দেওয়াও হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। এরপরে পদ্মা নদীর পানি অনেক গড়িয়েছে, যদিও সেতু হয়নি।
তারপরেও স্মারক বক্তৃতাটি থেকে পাওয়া কিছু তথ্য দেওয়া থেকে লোভ সামলানো যাচ্ছে না। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রথম বিষয় হিসেবে অর্থনীতি পড়ানো শুরু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯০৭ সালে। এর আগে ইতিহাসের পাঠক্রমে অর্থনীতির একটি বিশেষ পত্র থাকতো। এ কারণেই হয়তো আগে অর্থনীতির ইতিহাস নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছিলেন ইতিহাসের ছাত্ররা। আরেকটি তথ্য দেওয়া যেতে পারে। বাংলা ভাষায় অর্থনীতি নিয়ে সবচেয়ে ভাল এবং তুলনাহীন যে বইটিকে বলা হয় তার নাম দেশের কথা। লেখক সখারাম দেউস্ক। ১৯০৩ সালে এটি প্রকাশ করা হয়েছিল এবং চার বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার কপি বিক্রি হয়। সখারাম দেউস্ক পেশায় সাংবাদিক ছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটিও আছে ভবতোষ দত্তের বক্তৃতায়। তিনি বলেছেন, যে দুজন মনস্বী উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় অর্থনীতির সমস্যা নিয়ে মূল্যবান নিবন্ধ লিখেছিলেন, তাঁরা কেউই মূলত অর্থনীতিবিদ নন। এঁরা হলেন, ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এঁদের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর নাম। পাণ্ডিত্য, বিচক্ষণ বিশ্লেষণশক্তি ও নিপুন প্রকাশভঙ্গি ছাড়াও এদের তিনজনেরই ছিল পল্লী অঞ্চলের সমস্যা সন্বন্ধে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা বঙ্কিমচন্দ্র লাভ করেছিলেন জেলায়-মহাকুমায় প্রশাসকের কাজ করে, ভূদেব স্কুল-পরিদর্শক রূপে এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারি ও শ্রীনিকেতনের কাজ পরিচালনা করে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসার আগে আরেকটি কথা বলা যেতে পারে। বাংলা ভাষায়ই আসলে অর্থনীতির চর্চার ইতিহাস খুব একটা ভাল নয়। সুতরাং বাংলাদেশের অবস্থা খুব বেশি ভাল হওয়ার সুযোগ নেই। এ কথাটি কিন্তু লেখার উপসংহার নয়। বরং সতর্ক ভূমিকা। প্রশ্ন হচ্ছে কেন বাংলা ভাষায় অর্থনীতির চর্চা কম। এমন নয় যে, এখানে কৃতি অর্থনীতিবিদ নেই। অনেকেই আছেন। অনেকেই বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব অঙ্গনে নাম করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে প্রায় সকলেরই লেখার ভাষা ইংরেজি। এর একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ভবতোষ দত্ত। তাঁর ভাষায়, ‘ইংরেজিতে লেখার প্রধান কারণ প্রশস্ততর ক্ষেত্রের পাঠকমণ্ডলীর প্রতি লেখকের দৃষ্টি।’ এই লাইনটির একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাই ড. আকবর আলি খানের একটি বইয়ের ভূমিকায়। তিনি লিখেছেন, ‘প্রথমত, বাংলায় অনেক প্রবাদপ্রতিম অর্থনীতিবিদ জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে এঁরা (সম্ভবত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মোহে) বাংলা ভাষায় লেখার তাগিদ অনুভব করেননি। দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষায় অর্থনৈতিক পরিভাষার দৈন্য রয়েছে। তৃতীয়ত, জন্মগতভাবে বাঙালিরা বামপন্থী। বাংলায় অর্থনীতি নিয়ে যা প্রকাশিত হয়, তার সিংহভাগই হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে ডান-বামের ঝগড়া আর খিস্তি-খেউর।’
বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় অর্থনীতি নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে তাকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে অর্থনীতি নিয়ে পাঠ্য বই রচনা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, পত্রিকা, ম্যাগাজিনে অর্থনীতি বিষয়ে লেখালেখি এবং সেগুলো বই আকারে প্রকাশ করা। আর সর্বশেষটি হচ্ছে মৌলিক ও গবেষণাধর্মী লেখা।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অর্থনীতি যাদের বিষয় ছিল তাদের সবাইকেই বাংলা ভাষায় লেখা বই পড়তে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তিনি হলেন আনিসুর রহমান। তাঁর লেখা ‘অর্থশাস্ত্র পরিচয়’ বইটিই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পাঠ্যবই। অধ্যাপক আনিসুর রহমান দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তবে এই আনিসুর রহমান সর্বশেষ আনন্দ মোহন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। এর বাইরেও অনেকেই অর্থশাস্ত্র নিয়ে পাঠ্য বই লিখেছেন, কিন্তু সেগুলো খুব বেশি আলোচনায় আসেনি।
একটা স্বীকোরক্তি মনে হয় শুরুতেই বলা উচিৎ ছিল। বাংলা ভাষায় অর্থনীতি নিয়ে যত বই বের হয়েছে, যত ধরণের লেখালেখি হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায় না। তবে মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেল অনলাইনে বই বিক্রির সাইট রকমারি ডটকমে গিয়ে। বাংলা একাডেমী থেকে বের হয়েছিল আধুনিক ব্যাষ্টিক অর্থনীতি, ১ম খন্ড। লেখক, এম আজিজুর রহমান। এর দ্বিতীয় খন্ডটি প্রকাশ পেয়েছিল কি না তা আর জানা গেল না। তবে নাম দেখেই বলে দেওয়া যায়, এই বই শিক্ষার্থীদের জন্যই।
চট্টগ্রামের অধ্যাপক হরেন্দ্র কান্তি দে গাণিতিক অর্থনীতি নিয়ে দু’টি বই লিখেছিলেন। বাংলা একাডেমী এর প্রকাশক। এছাড়াও ব্যাষ্টিক অর্থনীতি নিয়েও তাঁর বহুল পাঠ্য একটি বই রয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক মনতোষ চক্রবর্তীও ব্যাষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে ভাল মানের পাঠ্যবই লিখেছেন। আরও দুটি নাম বলতে হবে। মনোরঞ্জন দে এবং জহিরুল ইসলাম শিকদারও একাধিক পাঠ্য বই লিখেছেন।
তবে একটা ব্যতিক্রমের কথা বলাই যায়। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দেশের একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এবং জ্বালানিখাত সহ বিভিন্ন বিষয়ে একজন সক্রিয় আন্দোলনকারী। তাঁর একটি বই আছে, সেটির নামও অর্থশাস্ত্র পরিচয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত বইটি একেবারেই মৌলিক অর্থনীতি নিয়ে লেখা। অর্থশাস্ত্রের ধারণা, ভোক্তা, চাহিদা তত্ত্ব, উৎপাদন, বাজার, প্রতিযোগিতা, বৈষম্য, বাণিজ্য তত্ত্ব, এসব বিষয় আছে বইটিতে। শিক্ষার্থীরা ছাড়াও যারা অর্থনীতি বাংলা ভাষায় বুঝতে চান তাদের জন্যও এই বই। বাংলা ভাষায় পাঠ্য বই নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ।
বাংলা ভাষায় এখন ভাল পরিভাষাও নেই। বাংলা একাডেমী এক সময় অর্থনীতির পরিভাষা বের করেছিল। কিন্তু বইটি এখন আর পাওয়া যায় না। বাংলা একাডেমীর উচিৎ বইটি হালনাগাদ করে আবার প্রকাশের ব্যবস্থা করা। কারণ এই পরিভাষার অভাবেই অনেকেই বাংলায় লেখালেখিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। অমর্ত্য সেন তাঁর এক বইয়ে কিছু পরিভাষা দিয়েছিলেন। আকবর আলি খানও পরার্থপরতার অর্থনীতি বইয়ে কিছু পরিভাষা দিয়েছিলেন। এছাড়া অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমানের ‘ব্যবসায় পরিভাষা’ বইটিও পরিভাষার চাহিদা অনেকটা মেটাবে। আর আছে মুনীর তৌসিফের ‘অর্থ-বাণিজ্য শব্দকোষ’, যা মূলত বিভিন্ন বিষয়ে টীকার মতো। এর বাইরে সঠিক পরিভাষা পাওয়ার তেমন কোনো ভাল ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই।
এবার দ্বিতীয় ভাগ নিয়ে আলোচনা। এই গ্রুপের সংখ্যাই বাংলাদেশে বেশি। অর্থাৎ পত্র পত্রিকায় অনেকেই আজকাল অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন। অনেক কলাম লেখেন। অনেকে পাক্ষিক বা সাপ্তাহিকে লেখেন, সেগুলো ঠিক কলাম না। অর্থনীতির ঘটনাপ্রবাহের এক ধরণের বিশ্লেষণ থাকে সেইসব লেখায়। এ ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক বিচিত্রার কথা বলা যায়। একটু পুরোনো যারা তাদের নিশ্চই মনে থাকবে, বিচিত্রায় একটি করে বড় প্রতিবেদন থাকতো। প্রচ্ছদ কাহিনীর বিষয়বস্তগুলো থাকতো আকর্ষণীয় কোনো বিষয় নিয়ে। অর্থনীতি নিয়ে বিশ্লেষণী লেখা যেমন থাকতো তেমনি ছিল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এসব লেখা নিয়ে অনেকেই পরে বই বের করেছেন।
পত্রিকায় লেখালেখি আর সেখান থেকে বই বের করার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার যেমন আছেন, তেমনি সাংবাদিকেরাও আছেন। ব্যাংকারদের মধ্যে প্রধান দুটি নাম মামুন রশিদ এবং ফারুক মঈনউদ্দীন। আর সাংবাদিকদের মধ্যে আসজাদুল কিবরিয়ারও একাধিক প্রকাশনা রয়েছে। আরেকজন সাংবাদিকের কথাও বলা প্রয়োজন। অজয় দাশগুপ্ত অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত কলাম নিয়ে বই তাঁরও রয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ের তিন দশক এবং সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য দুটি বই। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি এখন পাওয়া যায় না। তবে বৈদেশিক ঋণের শৃঙ্খল নিয়ে এটি একটি অত্যন্ত ভাল রেফারেন্স। এছাড়া এক সময় পত্র-পত্রিকায় লিখে অর্থনীতিকে অনেকটাই জনপ্রিয় করেছিলেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিরূপাক্ষ পাল। আবার সরকারি আমলা আনু মাহমুদ নামেও প্রচুর লিখেছেন।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ একজন নামি ব্যাংকার। তিনিও পত্রিকায় লেখালেখি করেন। চাকরি জীবন বা ব্যাংকিং জীবন নিয়ে তাঁর নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাংকিং সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা প্রকাশিত বইটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকজন ব্যাংকারের কথা বলা যায়। তিনি সৈয়দ আশরাফ আলী। সর্বশেষ একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তবে তাঁর বিশেষ পরিচিতি আছে ব্যাংকিং বিষয় নিয়ে লেখালেখির কারণে। তাঁর লেখা ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন’ একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। এটাকে এক ধরণের পাঠ্যবইয়ের সমতুল্য বলা যায়। কারণ, যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নের খুটিনাটি জানতে চান, বুঝতে চার বৈদেশিক মুদ্রার কেনাকাটার বিষয়টি তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য বইটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এখনকার গভর্ণর ড. আতিউর রহমান এক সময় বিচিত্রায় নিয়মিত লিখতেন। বাংলা ভাষায় অর্থনীতির বই লেখার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃত হিসাবে তাঁর নামটি আগেই থাকবে। বিভিন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও জার্নালে লেখার সংকলন হিসাবে বই যেমন তিনি প্রকাশ করেছেন, তেমনি বেশ কিছু গবেষণাধর্মী অর্থনীতির বইও তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে বাজেট সংক্রান্ত বইগুলো উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলা চলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদও অনেক আগে থেকেই পত্র পত্রিকায় নিয়মিত ভাবে অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন। সেসব লেখা নিয়ে তাঁর একাধিক বই আছে। এর বাইরে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বইটি সম্ভবত শেয়ারবাজার নিয়ে লেখা। ১৯৮৭ সালের কথা। তখন শেয়ারবাজার নিয়ে তেমন আলোচনা হতো না। কেবল দৈনিক সংবাদ পত্রিকার ভেতরে এক কোণায় কয়টি কোম্পানির লেনদেনের বিবরণ ছাপা হতো। সে সময়েই আমরা আবু আহমেদ স্যারের কল্যানে জেনে যেতাম শেয়ারবাজারের অনেক খবর। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দ্বিতীয় বর্ষে তিনি সামষ্টিক অর্থনীতি পড়াতেন। তখন এটাও জেনেছিলাম যে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কৌশল নিয়ে তাঁর লেখা একটা বাংলা বইও আছে। সাংবাদিক জীবনে সেই বইটি সংগ্রহ করলেও এখন আর খোঁজ নেই। তবে আজকাল শেয়ারবাজার নিয়ে ব্যাপক আলোচনার কারণেই হয়তো অধ্যাপক আবু আহমেদ বইটি পরিমার্জন করে নতুন করে প্রকাশ করেছেন। নাম, জেতার কৌশল। বাংলায় লেখা শেয়ারবাজার নিয়ে এটিই সম্ভবত সেরা বই। ৯০ এর দশকে ব্যাংকার, গল্পকার ও অনুবাদক ফারুক মঈনউদ্দীন এবং বিচিত্রার এক সময়ের সাংবাদিক সমর রায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের কলা-কৌশল নিয়ে দুটি বই লিখেছিলেন। সেগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। এর বাইরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে আরও অনেক অনেক বই লেখা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে আলোচনা না করাই ভাল।
মতিউর রহমান এক সময় একতার সম্পাদক ছিলেন। এরশাদের সময়ে তিনি তাঁর পত্রিকায় ঋণ খেলাপিদের নিয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। রিপোর্টারও ছিলেন তিনিই। এখন পর্যন্ত ঋণ খেলাপিদের নিয়ে এটাই সেরা কাজ। ওই প্রথম জানা গিয়েছিল ঋণ খেলাপিদের দৌরাত্ম। আজকে যারা দেশের কোটিপতি বলে পরিচিত, বুক ফুলিয়ে হাঁটেন, তাদের সবার একটা আমলনামা পাওয়া যায় রিপোর্টগুলোতে। এরশাদ সামরিক আইন জারি করেই ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আসল উদ্দেশ্য ছিল এসব লোককে ব্যবহার করা। তা তিনি করেওছিলেন। প্রথমে ঋণ খেলাপিদের কান্ডকীর্তি নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা হয়। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। পরে দেখা গেল এরা সবাই জাতীয় পার্টির নেতা-মন্ত্রী। সেই সব ঋণ খেলাপিদের নিয়ে রিপোর্টগুলোর সংকলন ‘ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী’। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত এই বইটির সহ লেখক ছিলেন সৈয়দ আজিজুল হক।
পত্রিকার কলাম থেকে বই প্রকাশের তালিকা খুব ছোট না। কলামের সমস্যা হচ্ছে এগুলো সমসাময়িক কোনো ঘটনা প্রেক্ষিতে লেখা হয়, পরে আর এর উপযোগিতা থাকে না। আবার কিছু লেখা সবসময়ের জন্যই প্রযোজ্য। দেশের অনেক অর্থনীতিবিদ আজকাল কলাম লেখেন। সেগুলো বই হয়েও বের হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ধরে এবার আলোচনা করা যায়। অধ্যাপক মইনুল ইসলাম, ড. বিনায়ক সেন, অধ্যাপক অনুপম সেন এবং সাবেক ব্যাংকার আর এম দেবনাথও অর্থনীতি নিয়ে অনেক লেখালেখি করেন। বিশেষ করে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবসা ও বাণিজ্যে বাঙালি’ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য বই।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান নানা কারণে আলোচিত একজন অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভেও তাঁর অবদান আছে। দুই পাকিস্তান তত্ত্ব দিয়ে যে কয়জন তরুণ অর্থনীতিবিদ স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে রেহমান সোবহান একজন। তিনি ভাল বাংলা বলতে পারেন না। তবে বাংলা ভাষায় তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু লেখা পাওয়া যায়। সেগুলো সবই অনুবাদ করা। এসব লেখা পাওয়া যায় আমার বন্ধু আমার সমালোচক বইটিতে। বিশেষ করে পরনির্ভরশীলতা নিয়ে তাঁর লেখাগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যখনই আলোচনা হবে, তখনই মনে করতে হবে।
আরেকজন খ্যাতিমান ও আলোচিত অর্থনীতিবিদ আখলাকুর রহমান। তিনি এক সময়ে মাক্সীয় অর্থনীতি নামে একটি বই লিখেছিলেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ আরেকজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ। সদ্য প্রয়াত এই অর্থনীতিবিদের বই জাতীয়তাবাদের অর্থনীতি। এটি মূলত বিভিন্ন সময়ে লেখা অথবা দেওয়া স্মারক বক্তৃতাগুলোর সংকলন। অর্থনীতির বিশ্লেষণধর্মী বইটিও অর্থনীতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য একটি প্রকাশনা। অধ্যাপক আনিসুর রহমান আরেকজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। আÍনির্ভর উন্নয়নের চিন্তা নিয়ে তার অনেক লেখা রয়েছে। সেসব লেখা নিয়ে তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য বাংলা বই রয়েছে। যেমন, অপহৃত বাংলাদেশ ও উন্নয়ন জিজ্ঞাসা। অর্থনীতির পাঠকরা এই বই দুটি পড়লে ভিন্ন এক বাংলাদেশের দেখা পাবেন।
অর্থনীতি নিয়ে অধ্যাপক এম এম আকাশও লেখালেখি করেন। ১৯৮৭ সালে সিপিবি অর্থনীতি নিয়ে একটি বড় আকারের সেমিনার করেছিল। বিখ্যাত সব অর্থনীতিবিদরা সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর পেপার পড়েছিলেন। সেই সব পেপার নিয়ে পরে ড. আবদুল গফুরের সম্পাদনায় প্রকাশ হয়েছিল বই, বাংলাদেশের অর্থনীতি: সংকটের স্বরূপ। আগ্রহীরা এটিও খুঁজে পেলে ভাল কিছু রেফারেন্স পাবেন। পুরোনো আরেকটি বইয়ের কথা বলা যায়। আবুল মাল আবদুল মুহিত বর্তমান অর্থমন্ত্রী। যদিও তিনি অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন না। তবে কর্মক্ষেত্রে অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেছেন। সময়ের কারণে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য বই আছে। এরশাদ পতনের পর পর প্রকাশিত সেই বইয়ের নাম বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও জাতীয় ঐকমত্য। সম্ভবত এরশাদের মন্ত্রী হওয়ার পাপমোচন হিসাবে এরশাদ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ অর্থনীতির একটা বিশ্লেষণ নিয়ে করেছিলেন এই বইয়ের মাধ্যমে।
আরেকজন অর্থনীতিবিদের কথা আবারও বলা প্রয়োজন। তিনি অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সম্ভবত বাংলা ভাষায় অর্থনীতি নিয়ে সর্বাধিক বই তিনি লিখেছেন। অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন। রাজনৈতিক অর্থনীতি যেমন স্থান পায়, তেমনি তাত্ত্বিক অর্থনীতি ও এর বিশ্লেষনও থাকে। পুঁজির আন্তর্জাতিক করণ ও অনুন্নত বিশ্ব, বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি ও প্রকৃতি, বাংলাদেশের কোটিপতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বই।
আরও কয়েকটি বিশেষ বইয়ের কথা না বললে লেখাটি অপূর্ণ থেকে যাবে। যেমন, ২০০৩ সালে প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহার ‘ভাবনা অর্থনীতির: বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও অন্যান্য’ বইটি যথেষ্ট আলোচিত। আবার বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমানের ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ও উন্নয়ন: স্বাধীনতার ৪০ বছর’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই। অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফারুক অনেক আগে লিখেছিলেন ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত বইটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস নিয়ে সম্ভবত প্রথম বই। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ‘পথের বাধা সরিয়ে নিন মানুষকে এগুতে দিন’ অবশ্যই একটি ব্যতিক্রমি বই।
এবার তিনটি উল্লেখযোগ্য বই নিয়ে কিছু কথাবার্তা। রিজওয়ানুল ইসলাম দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আইএলও তে কাজ করেছেন। পিএইচডি করেছেন অমর্ত্য সেনের তত্বাবধানে। দেশের বাইরে থেকেও লেখালেখি করেছেন বাংলায়। তাঁর লেখা বইটির নাম উন্নয়নের অর্থনীতি। পাঠ্য বই না, কিন্তু যারা উন্নয়ন অর্থনীতি পড়েন তাদের কাছে পাঠ্য বইয়ের মতোই মনে হবে। আবার যারা উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে ভাবেন, বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবেন-তারাও বিশেষ ভাবে উপকৃত হবেন বইটি পড়ে। উন্নয়ন ভাবনার বিবর্তন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বিভিন্ন তত্ত্ব-সবই রয়েছে বইটিতে। লেখকের মৌলিক ভাবনাও পাওয়া যায় বইয়ে। অন্যান্য দেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার কথাও লেখা আছে। বাংলা ভাষায় অর্থনীতি নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকাশিত সেরা বইয়ের একটি উন্নয়নের অর্থনীতি।
ড. মাহবুব হোসেন গ্রামীণ দারিদ্র্য ও কৃষি অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এক সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ছিলেন। এখন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক। অধ্যাপক আব্দুল বায়েস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। দুজনে একটি বই লিখেছেন, ‘গরিব দেশে গরিব মানুষ: বাংলাদেশ।’ বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে এটি অবশ্যই একটি সেরা বই। মৌলিক গবেষণাধর্মী এই বইটি সবার জন্য। মূল বিষয় দারিদ্র্য, বৈষম্য ও প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতির মানুষরা যেমন পড়ে বুঝবেন, অর্থনীতির মানুষ না তারাও ভাল বুঝবেন। সহজ ভাষায় লেখা। আরও সহজ করার জন্য অনেক গল্পের উদাহরণও আছে। সব মিলিয়ে গরিব দেশের গরিব মানুষ অর্থনীতির অন্যতম সেরা প্রকাশনা।
‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ সদ্যই প্রকাশ পেয়েছে। লেখক সাবেক সচিব ড. আকবর আলি খান। ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, পরে পিএইচডি করেছেন অর্থনীতিতে। অর্থনীতির অঙ্গনকে তিনি প্রথম চমকে দিয়েছিলেন পরার্থপরতার অর্থনীতি বইটি লিখে। বৈঠকী ঢঙ্গে লেখা অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি বই। সেখানে অর্থনীতির নানা প্রবণতার একটা চিত্র ছিল। কবিতা-গান-গল্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি সহজ ভাষায় বুঝিয়েছিলেন অর্থনীতি। এবারের বইটিকে আরও ভাল বলা যায়। অর্থনীতিতে এখন নানা ধরণের তত্ব রয়েছে। সেসব তত্ব নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে। নানা ধরণের তত্ত্বের প্রয়োগও ঘটছে। এসব তত্ত্ব দিয়ে বা প্রয়োগ করে অর্থনীতিবিদরা নোবেল পাচ্ছেন, অর্থনীতিকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অর্থনীতির নানা আলোচিত তত্ত্ব ও প্রয়োগ নিয়ে একটা গবেষণামূলক বই এটি। ড. আকবর আলি খানের কৃতিত্ব হচ্ছে বইটি লেখা হয়েছে সহজ ভাষায়, বৈঠকি মেজাজে। কেবল বাংলা ভাষায়ই না, সব ভাষার ক্ষেত্রেই এটি একটি উল্লেখযোগ্য বই হয়েই টিকে থাকবে বললে সম্ভবত ভুল হবে না।

(কামাল ভাই আর ফিরোজ ভাইয়ের চাপে একপক্ষ পত্রিকার জন্য লেখাটা লিখেছিলাম। একটু একাডেমিক টাইপ লেখা। অবশ্য পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সঙ্গে এখানে বাড়তি কিছু তথ্য যোগ করা হয়েছে। তবে আমার জানা মতে এ বিষয়ে বাংলাদেশে এটাই প্রথম লেখা। তাই একটা রেকর্ড রাখার জন্য ব্লগে দেয়া হলো। সবার খুব গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই।)

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.