অদক্ষতা ও অবহেলায় অর্থ চুরি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 19 minutes

শুরুতেই দিনপঞ্জি
১৫ মে, ২০১৫—ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার স্ট্রিট শাখায় সন্দেহভাজন চার ব্যক্তির নামে চারটি আলাদা ব্যাংক হিসাব খোলা হয়।
৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬—যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হিসাব থেকে হ্যাকাররা ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার স্থানান্তরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে ৩৫টি নির্দেশনা পাঠানো হয়। এর জন্য আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফটকে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ৩০টি নির্দেশনা আটকে দিলেও পাঁচটি নির্দেশনা কার্যকর করে নিউইয়র্ক ফেড। চারটি নির্দেশনার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে আর একটি নির্দেশনার মাধ্যমে ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়।.
৫ ফেব্রুয়ারি—সুইফটের মাধ্যমে যেসব আর্থিক লেনদেন করা হয়, তার একটি নিশ্চিতকরণ বার্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিদিন প্রিন্ট হয়। ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা দেখতে পান, প্রিন্টার মেশিনে সুইফটের স্বয়ংক্রিয় বার্তা প্রতিবেদন প্রিন্ট হয়নি। জোবায়ের ও তাঁর সহকর্মীদের একই প্রতিবেদন সনাতন পদ্ধতিতে প্রিন্ট করতে ২৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
একই দিনে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে উইলিয়াম গোর নামে আরেকটি হিসাব খোলা হয়। পাশাপাশি একই ব্যাংকে জেসি ক্রিস্টোফার ল্যাগরোসাস নামে খোলা একটি হিসাব থেকে ২ কোটি ২৭ ডলার তুলে নেওয়া হয়। পরে সেই অর্থ জমা হয় উইলিয়াম গোর হিসাবে।
বর্তমানে ফিলিপাইনে এ ঘটনার যে তদন্ত চলছে, তা থেকে জানা গেছে, ৫ ফেব্রুয়ারি রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো নিজের গাড়িতে করে ওই দিন বিপুল অর্থ সরিয়েছেন।
৬ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা জোবায়ের বিন হুদা এদিন কার্যালয়ে এসে দেখেন সুইফট সিস্টেমটি যথাযথভাবে কাজ করছে না। পরে বিকল্প উপায়ে সিস্টেমটি চালু করে বেশ কিছু নিশ্চিতকরণ বার্তা দেখতে পান, যেগুলো এসেছিল নিউইয়র্ক ফেডের কাছ থেকে।
৮ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন, পাঁচটি অনুমোদিত সুইফট বার্তার মাধ্যমে নিউইয়র্ক ফেডের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরানো হয়েছে। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার গেছে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে। আর ২ কোটি ডলার গেছে শ্রীলঙ্কার প্যান এশিয়ান ব্যাংকিংয়ে। আরও ৮৫ কোটি ডলার স্থানান্তরের নির্দেশনা আটকে দেওয়া হয়েছে। ওই দিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেড, ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মেলোন, সিটিগ্রুপ, ওয়েলস ফার্গো, ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক ও শ্রীলঙ্কার প্যান এশিয়ান ব্যাংকের কাছে অর্থের লেনদেন বন্ধের বার্তা পাঠানো হয়।
৯ ফেব্রুয়ারি—রিজাল ব্যাংকের চারটি হিসাব থেকে ৫ কোটি ৮১ লাখ ডলার জমা করা হয় একই ব্যাংকের উইলিয়াম গোর হিসাবে। এদিন ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়, চারটি হিসাবের লেনদেন আটকে দিয়েছে, কিন্তু ততক্ষণে ওই সব হিসাব থেকে সিংহভাগ অর্থই সরিয়ে ফেলা হয়।
৫ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি—এই কয়েক দিনে রিজাল ব্যাংকের উইলিয়াম গোর হিসাব থেকে অর্থ চলে যায় ম্যানিলাভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের কাছে। প্রতিষ্ঠানটি ওই অর্থ ফিলিপাইনের স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তর করে। এরপর সেই অর্থের ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্লুমবেরি রিসোর্ট করপোরেশনে, ২ কোটি ১২ লাখ ডলার ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানিতে আর ৩ কোটি ৬ লাখ ডলার পাঠানো হয় ওয়েক্যাং জু নামের এক ব্যক্তির কাছে।
১১ ফেব্রুয়ারি—ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে যে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন থেকে অন্যত্র চলে গেছে। এদিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো তেতাংকোর কাছে ফোন করে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা চান।
১৬ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রতিনিধিরা ফিলিপাইনের ম্যানিলায় গিয়ে সে দেশের এএমএলসির সঙ্গে বৈঠক করে।
১৭ ফেব্রুয়ারি—শ্রীলঙ্কার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউইয়র্ক ফেড শাখায় ২ কোটি ডলার ফেরত দেয়।
২৯ ফেব্রুয়ারি—পাঁচটি ব্যাংক হিসাব জব্দ করার জন্য ফিলিপাইনের এএমএলসির পক্ষ থেকে আদালতে মামলা করা হয়। এদিন অর্থ চুরির ঘটনাটি নিয়ে ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
১ মার্চ—ফিলিপাইনের আদালত ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ দেন।
৭ মার্চ—বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনাটি জানায়। এদিন দেশের সংবাদমাধ্যমে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
১১ মার্চ—ফিলিপাইনের এএমএলসি অর্থ পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে রিজাল ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোর বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসে অভিযোগ দায়ের করে।
১৩ মার্চ—বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষণা দেন, ব্যর্থতার দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৫ মার্চ—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। ফিলিপাইনের সিনেট এ বিষয়ে শুনানি শুরু করে। তাতে রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো তান সিনেটের অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। আর ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো রুদ্ধদ্বার শুনানির অনুরোধ করেন। এদিন ফিলিপাইনের শেয়ারবাজারে রিজাল ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৫ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায়।
১৭ মার্চ—মায়া সান্তোস দেগুইতো রুদ্ধদ্বার শুনানিতে সাক্ষ্য দেন। পরে তাঁর আইনজীবী জানান, রিজাল ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে এদিন রিজাল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে মায়া সান্তোসকে দায়ী করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধ উপেক্ষা করে মায়া অর্থ স্থানান্তর করেছেন।
১৮ মার্চ—ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো তেতাংকো বলেন, অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিন রিজাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন সে দেশের ব্যবসায়ী উইলিয়াম গো।
২১ মার্চ—শ্রীলঙ্কার বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) শালিকা ফাউন্ডেশনের ছয় পরিচালকের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন দেশটির আদালত। এই শালিকা ফাউন্ডেশনের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভের ২ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল।
২২ মার্চ—রিজাল ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস ও তাঁর সহকারী অ্যাঞ্জেলা তোরেসকে ব্যাংকের চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
২৩ মার্চ—রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় নিউইয়র্কের ফেডের গাফিলতি রয়েছে কি না এবং সে বিষয়ে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে একজন আইনজীবী নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিন সিঙ্গাপুর থেকে ফিলিপাইনে ফেরেন অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযুক্ত সে দেশের ব্যবসায়ী কিম ওয়ং। এ ছাড়া এ ঘটনায় রিজাল ব্যাংক দুঃখ প্রকাশ করে এবং ব্যাংকটির চেয়ারম্যান লরেঞ্জো তান ছুটিতে যান।
–ব্লুমবার্গ অবলম্বনে

শুরুর কথা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই। নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অরক্ষিত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন দায়িত্বহীন। আর চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটানো হয় সুইফট সার্ভারের সঙ্গে স্থানীয় নেটওয়ার্ক জুড়ে দিয়ে। এর ছয় মাসের মধ্যেই গোপন সংকেত বা পাসওয়ার্ড জেনে নিয়ে চুরি হয় ৮ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৬২৩ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১০ কোটি টাকা)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি হয় প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক দিন পরে চুরির তথ্য জানতে পারলেও তা গোপন রাখে আরও ২৪ দিন। আর বিষয়টি অর্থমন্ত্রীকে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় ৩৩তম দিনে।
বিষয়টি জানাজানি হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একই বছরের ১৫ মার্চ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংক মতিঝিল থানায় মামলা করে এবং পরের দিন মামলা হস্তান্তর করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির কাছে।
ফরাসউদ্দিন কমিটি কাজ শুরু করে ২০ মার্চ থেকে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে, একই বছরের ৩০ মে তদন্ত প্রতিবেদন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে পেশ করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার ফরাসউদ্দিন কমিটির সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এমনকি অনুসন্ধান শেষ করে অভিযোগপত্রও দেয়নি সিআইডি। এ কারণে দেশের মানুষ আজও জানতে পারেনি তাদের কষ্টার্জিত অর্থ চুরি যাওয়ার নেপথ্যের মানুষগুলো কারা। বাংলাদেশের কেউ রিজার্ভ চুরির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল কি না, কিংবা কারও দায়িত্বহীনতা বা অবহেলায় চুরি হয়েছে কি না, তাও জানা যায়নি। এমনকি কারও কোনো শাস্তিও হয়নি। সবাই আছেন বহাল তবিয়তে। কেউ কেউ পদোন্নতিও পেয়েছেন।
ঘটনার প্রায় তিন বছর পরে, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মামলা নিউইয়র্কে চলবে কি না, সে নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। অন্যদিকে, ফিলিপাইন এ নিয়ে বিশেষ সিনেট কমিটির শুনানি হয়েছে, মামলাও করা হয়েছে। একজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু যাদের অর্থ চুরি গেল, সেই বাংলাদেশ দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। আবার চুরি যাওয়া অর্থও উদ্ধার করতে পারেনি। ভবিষ্যতে অর্থ উদ্ধার হবে—এমন সম্ভাবনার কথাও এখন আর কেউ বলছেন না।
ফরাসউদ্দিন কমিটির মূল প্রতিবেদন ২৭ পৃষ্ঠার। তদন্ত কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং সদস্যসচিব হিসেবে কাজ করেন তৎকালীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব গকুল চাঁদ দাস। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার বিবরণ ও বিশ্লেষণ, এ নিয়ে বিতর্ক এবং দায়দায়িত্ব নির্ধারণ ছাড়াও বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এ নিয়ে গত প্রায় সাড়ে তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও উঠেছিল। কিন্তু প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়নি বলে কমিটির পর্যবেক্ষণ আমলে আনা হয়নি, সুপারিশও মানা হয়নি।
অথচ আবুল মাল আবদুল মুহিত তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়ে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ১ জুন সাবেক অর্থমন্ত্রী এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিবেদনটি অনেক বিষয়ের ওপরে মন্তব্য করেছে এবং সে বিষয়টি সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন সিকিউরিটি নিয়ে চিন্তাভাবনা বা পদক্ষেপ খুবই দুর্বল। সে জন্য আমার মনে হলো যে কিছু কিছু বিষয়ে অতি সত্বর কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্মচারী সম্বন্ধে বক্তব্য আছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অন্ততপক্ষে তদন্ত শুরু করে সাময়িক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা বোধ হয় খুবই প্রয়োজনীয়। সে জন্য তদন্ত প্রতিবেদনটির কপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করা ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে প্রদান করার আশু ব্যবস্থা নিতে হবে।’
চিঠি লেখা ছাড়াও সাবেক অর্থমন্ত্রী রিজার্ভ চুরি এবং তদন্ত প্রতিবেদন বিষয়ে জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে একই বছরের ১২ বা ১৪ জুন একটি বিবৃতিও দিতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাও করা হয়নি।
তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সামগ্রিক বিষয়ে গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকার তদন্ত কমিটি নিয়োগ দিয়েছে। কমিটি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কেবল সরকারই দিতে পারে।


যেভাবে ঘটনা ঘটে
বিশ্বব্যাপী ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে লেনদেন করতে সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা সুইফট ব্যবহার করে। বিশেষ ধরনের বার্তা প্রেরণের মাধ্যমে এই লেনদেন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে সুইফট বার্তার মাধ্যমে অর্থ হস্তান্তরের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আটজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের (এবিডি) আওতাধীন একটি কক্ষে (যাকে ব্যাক–অফিস বলা হয়) এই বার্তা লেনদেন চলে। এটি বিশেষ একটি সংরক্ষিত জায়গা, এখনো কঠোর নিরাপত্তা থাকার কথা।
তদন্ত প্রতিবেদনে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতের ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বার্তা প্রেরণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত আটজনের একজন হলেন সহকারী পরিচালক শেখ রিয়াজউদ্দিন। ওই রাত সোয়া সাতটায় তিনি সুইফট সিস্টেম থেকে বের হওয়ার (লগআউট) আগে প্রচলিত নিয়ম মেনে ১৮টি বার্তার মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ককে (নিউইয়র্ক ফেড) ৩১ কোটি ৯৭ লাখ ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার স্থানান্তর করার নির্দেশনা পাঠান। মূলত, মুদ্রাবাজারে বিনিয়োগ করার জন্য এই অর্থ নিউইয়র্ক ফেড থেকে স্থানান্তরের বার্তা দেওয়া হয়। বার্তা পাঠিয়ে রাত ৮টা ৩ মিনিটে তিনি অফিস ত্যাগ করেন।
ওই দিন ছিল বৃহস্পতিবার। শেখ রিয়াজউদ্দিন অফিস ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে তাঁরই ব্যবহার করা নাম (ইউজার আইডি) ও গোপন সংকেত (পাসওয়ার্ড) থেকে রাত ৮টা ৩৬ মিনিট থেকে ভোররাত ৩টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত সময়ে নিউইয়র্ক ফেডকে ৩৫টি বার্তা পাঠিয়ে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ৬ হাজার ৮৮৬ ডলার স্থানান্তরের আদেশ যায়। এর মধ্যে মিশেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার এম ল্যাগোস, আলফ্রেড সান্তোস-ভেরগারা, এনরিকো টেওডোরা ভাসকয়েজ এবং রালফ ক্যাম্পো পিকাচির নামে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনে (আরসিবিসি) খোলা ব্যাংক হিসাবে ৮ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৬২৩ ডলার এবং শ্রীলঙ্কার শালিখা ফাউন্ডেশনের নামে আরও ২ কোটি ডলার স্থানান্তরের আদেশ দেওয়া হয়। ইংরেজি ‘ফাউন্ডেশন’ বানানে ‘ও’ অক্ষরটি ছিল না। এই ভুল বানানের কারণে শালিখা ফাউন্ডেশনের নামে পাঠানো অর্থ স্থানান্তর হওয়ার আগেই আটকে যায়, যা পরে ফেরত আসে। কিন্তু ফিলিপাইনে পাঠানো চারটি হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হয়ে যায়। ফিলিপাইনে রালফ ক্যাম্পো পিকাচির হিসাবেও অর্থ স্থানান্তর হয়নি। অর্থাৎ ৩৫টি বার্তার মধ্যে শেষ পর্যন্ত চারটি কার্যকর হয়, একটি বানান ভুলের কারণে ফেরত আসে, আর বাকি ৩০টি বার্তার ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সন্দেহ হলে তা স্থানান্তর না করে বাংলাদেশকে ফিরতি বার্তা পাঠায়। যদিও এই ফিরতি বার্তা বাংলাদেশ জানতে পারে দুই দিন পরে। কারণ, বৃহস্পতিবার রাতে কেউ ছিলেন না, শুক্রবার কেউ গুরুত্ব দেননি, শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনাটি জানতে পারে। ফিলিপাইনের ব্যাংক হিসাব থেকে অবশ্য ওই অর্থ সরিয়ে ফেলা হয় ৯ ফেব্রুয়ারি।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চুরির উদাহরণ। রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে জড়িতরা দিনক্ষণ নির্ধারণ করেছে খুব চমৎকার করে। ২০১৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি (শুক্র ও শনিবার) ছিল বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে সাপ্তাহিক ছুটি, আর ৬,৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের সাপ্তাহিক ও চীনা নববর্ষের ছুটি। এ তথ্য উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘লম্বা এই ছুটির সুযোগে যে অর্থ চুরি করা যাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও এত বুদ্ধি আছে বলে তা মনে হয় না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢিলেঢালা কাজের ধরন অপরাধীদের কাজের সুবিধা করে দিয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে জানল
চুরির পরের দিন ছিল শুক্রবার। তবে ছুটির দিন হলেও অল্প সময়ের জন্য লেনদেনের ব্যাক–অফিস খোলা হয়। শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টায় সবার আগে অফিসে আসেন অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের (এবিডি) যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা। এরপর আসেন যুগ্ম পরিচালক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, সহকারী পরিচালক শেখ রিয়াজউদ্দিন এবং রফিক আহমদ মজুমদার। পরের তিনজন অফিস ত্যাগ করেন দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে।
সুইফট বার্তা পাঠানো হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার একটি অনুলিপি বা কপি প্রিন্ট হয়ে যায়। তবে এবিডির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বদরুল হক খান তদন্ত কমিটিকে জানান, এই চারজন অফিসে এসে বার্তা লেনদেনের প্রিন্টার খুলতে পারেননি। তবে তাঁরা কেউই এ তথ্য ঊর্ধ্বতন কাউকে জানাননি। তাঁদের দাবি, প্রায়ই প্রিন্টার খারাপ হয়ে থাকে। তবে শেষ কবে খারাপ হয়েছিল, তদন্ত কমিটিকে সেই তথ্য কেউ জানাতে পারেননি। ফলে, এই বক্তব্য তদন্ত কমিটি গ্রহণ করেনি।
এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইফট বার্তা পাঠানোর ক্ষমতাপ্রাপ্ত আট কর্মকর্তা ছুটির দিনেও অফিসে আসতে পারেন। মূলত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কর্মকর্তাই ছুটির দিনে বা নিয়মিত অফিসের পরে দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করলে ভাতা পান। ওই চার কর্মকর্তার কাছে বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে দুই ঘণ্টার অতিরিক্ত ভাতাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় ওঠে। কেননা, বিকল্প পদ্ধতিতে (ম্যানুয়াল) সুইফট বার্তা প্রিন্ট করা যেত, তবে তাতে অনেক সময় লেগে যেত।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিএম বদরুল হক খান শনিবার অফিসে আসেন সকাল ১০টা ২৭ মিনিটে। এর ৪৭ মিনিট পরে জুবায়ের হুদা প্রিন্টারের সমস্যার কথা জানান। দুপুর সোয়া ১২টায় বিকল্প প্রিন্টার চালিয়ে দেখা যায় যে সুইফট মাধ্যমে নিউইয়র্ক থেকে ১৯৯টি বার্তা এসেছে। তবে ব্রাউজারের মাধ্যমে সুইফট সিস্টেমে ঢোকা যাচ্ছিল না, ‘এরর মেসেজ’ আসছিল। এ কারণে বার্তা পড়া যায়নি। এরপর নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তখন নিউইয়র্ক ফেড বন্ধ ছিল। এরপরে বেলা ১টা ৩১ মিনিটে যেকোনো ধরনের অর্থ স্থানান্তর বন্ধ এবং ইতিমধ্যে অর্থ পাঠানো হলে তা ফেরত আনার জন্য ই-মেইল ও ফ্যাক্সের মাধ্যমে নিউইয়র্ক ফেডে বার্তা পাঠানো হয়। তখনো প্রিন্টার ছিল অচল। এ কারণে বেলা ২ টাকা ৫৪ মিনিটে সুইফটের কাছে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়। এরপর তাদের পরামর্শে সুইফট সার্ভার থেকে স্থানীয় নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করলে প্রিন্টার সচল হয়। এ সময়ই প্রথম রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা জানতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।
শুক্রবার সারা দিন ও সারা রাত অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরে শনিবার বেলা সাড়ে তিনটায় জিএম বদরুল হক খান রিজার্ভের অর্থ চুরির তথ্য প্রথম জানান ডেপুটি গভর্নর (ডিজি–১) মো. আবুল কাসেমকে। তিনি এরপর গভর্নর আতিউর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম এরপর বদরুল হক খানকে জানান যে গভর্নর সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।


২৪ দিন অর্থ চুরির তথ্য গোপন 
পদত্যাগের আগে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন আতিউর রহমান। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর গুলশানের বাসভবনে। ফাইল ছবিবৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ চুরির তথ্য ২৪ দিন পর্যন্ত সরকারের কাছে গোপন রেখেছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমান।

ফরাসউদ্দিন কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে এ নিয়ে বলেছে, অর্থ চুরির তথ্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন করার কোনোই যৌক্তিকতা নেই, বরং গর্হিত অপরাধ। আর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়কে না জানানোটা অসদাচরণ।

রিজার্ভ চুরি হয়েছিল ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই চুরির বিষয়ে নিশ্চিত হয় ৬ ফেব্রুয়ারি, শনিবার দুপুরে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী কাউকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়নি। এর কারণ জানতে চেয়েছিল তদন্ত কমিটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম তথ্য গোপনের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ৪ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাতে চুরি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তা ধরা পড়ে ৬ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। অর্থ চুরির ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পরে শনিবার দুপুরে তিনি বিষয়টি গভর্নর আতিউর রহমানকে জানান এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে জিডির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে পাঠানোর জন্য তিনি বলেন। কিন্তু গভর্নর তাঁকে জানান, জিডি করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা হয়রানির শিকার হবেন এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। আর অর্থমন্ত্রী কোথায় কী বলে ফেলেন ঠিক নেই। এমনকি অভ্যন্তরীণ তদন্তও গোপনে করার জন্য তিনি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
তদন্ত কমিটির কাছে তথ্য গোপন রাখার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন আতিউর রহমান। তিনি বলেছেন, তাঁর বন্ধু ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো এম তেরেঙ্গার সঙ্গে তিনি টেলিফোনে কথা বলেছেন। ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তাঁকে বলেছেন, জানাজানি হলে অপকর্মকারীরা পালিয়ে যাবে; বরং গোপন থাকলে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ফরাসউদ্দিন কমিটির মন্তব্য হচ্ছে, একজন বিদেশি কর্তৃপক্ষের পরামর্শ ও অনিশ্চিত আশ্বাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বিষয়টি কোনো আইনানুগ কর্তৃপক্ষকে, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের দ্য ইনকুয়ারার পত্রিকায় বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির সংবাদ প্রকাশিত হলে ১ মার্চ গভর্নর গোয়েন্দা সংস্থাকে জানান। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীকে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠান এবং ৭ মার্চ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।
সরকারকে না জানানোর বিষয়ে ব্যাখ্যা পেতে আতিউর রহমানকে কমিটির সঙ্গে যেকোনো দিন, যেকোনো স্থানে সাক্ষাতের অনুরোধ করেছিল ফরাসউদ্দিন কমিটি। কিন্তু এ অনুরোধ তিনি রাখেননি। এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘মিডিয়া তাঁর ওপর চড়াও হয়ে যাবে, তাই বাসভবনের বাইরে তিনি যেতে চান না।’
তদন্ত কমিটি সামগ্রিক বিষয়টি অযৌক্তিক, গর্হিত অপরাধ এবং অসদাচরণ বলে মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, এসব গুরুতর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অন্য সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নির্লিপ্ততা সত্যিই বিস্ময়কর।
এ নিয়ে সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সব শেষে তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘স্বাধীনতার ৪৪ বছরে ১২ জন অর্থমন্ত্রী ও ১০ জন গভর্নর কাজ করেছেন। অর্থমন্ত্রী-গভর্নর মতান্তর, এমনকি মনান্তর আগেও ঘটেছে। তবে এবার এটি যেভাবে দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে, তা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত, অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং দেশের সুশাসন ও সুনামের জন্য মারাত্মক নেতিবাচক।’
যেভাবে ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়
ফরাসউদ্দিন কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে সুইফট বার্তার মাধ্যমে অর্থ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, কোনো বিপত্তি ছাড়াই ১৯৯৫ সাল থেকে অর্থ লেনদেনের বার্তা পাঠানো হয়ে আসছে। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সিদ্ধান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এরপরই ঘটে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা।
আর সেই সিদ্ধান্ত হচ্ছে যেকোনো ধরনের আন্তব্যাংক লেনদেন নির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার নাম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএস। সুইফটের সঙ্গে এই আরটিজিএস সংযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তখন বড় অনুষ্ঠান করে এ ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়েছিল। আর সমস্যার শুরু হয় এরপর থেকেই।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মার্চে সুইফট ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন সুইফট ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আনিস এ খান সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএস সংযুক্তির প্রস্তাব দেন। সুইফটের পক্ষ থেকেও এক ই-মেইলে এ ব্যাপারে ‘ওকালতি’ করা হয়। এরপর গভর্নর আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির সভায় এবং পরবর্তী সময়ে পরিচালনা পর্ষদের সভায় সুইফটের সঙ্গে বিবি-আরটিজিএস সংযুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির মন্তব্য হচ্ছে এ প্রক্রিয়ায় সুইফটকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় পাঁচ হাজার কম্পিউটার ও শুরুতে সংযোগ নেওয়া তিনটি ব্যাংকের (মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট, ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংক এনএ) সব কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি বিপজ্জনক লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (এলএএন) তৈরি করা হয়। আর আশ্চর্যের কথা যে প্রকল্পটি প্রণয়ন, পরিকল্পনা কমিশনে এর অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী কমিটিতে অর্থ বরাদ্দের সময়, এমনকি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের সময় কারও মনে এ প্রশ্ন জাগেনি যে এ সংযুক্তি কতখানি প্রয়োজনীয়, কী এর প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা এবং এর ফলে সুইফটের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা অরক্ষিত হয়ে পড়বে কি না।
সুইফট ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তৎকালীন সভাপতি আনিস এ খান এ নিয়ে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘৮০ টির মতো দেশে এমন ব্যবস্থা চালু আছে। আর এর মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যভাবে লেনদেনব্যবস্থা হবে বলে এ সুযোগ চেয়েছিলাম। বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে তিনটি ব্যাংককে এ সুযোগ দিয়েছিল।’

চাকরি চেয়ে ই–মেইল করেছিল হ্যাকাররা
চাকরি চেয়ে ই-মেইল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে ঢুকেছিল হ্যাকাররা। রিজার্ভের অর্থ চুরি করার লক্ষ্য নিয়ে দুই বছর আগে থেকেই তারা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এর পেছনের মূল ব্যক্তিটি হলেন উত্তর কোরিয়ার নাগরিক পার্ক জিন হিয়ক।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির অনুসন্ধান করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা এফবিআই। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে একটি ফৌজদারি মামলার নথিতে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে। এফবিআইয়ের এই রিপোর্ট ধরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা বিবিসি।
এফবিআই যা পেয়েছে
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাটির নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংককে লক্ষ্য বানিয়ে আসছে হ্যাকাররা। মূলত, রিজার্ভ চুরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে চারটি ই–মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল।এগুলো হলো: watsonhenny@gmail.com, yardgen@gmail.com, rasel.aflam@gmail.com এবং rsaflam@gmail.com।
২০১৫ সালের শুরুতে জন্মবৃত্তান্ত বা সিভি সংযুক্ত করে পাঠানো এসব ই-মেইলে চাকরির জন্য মৌখিক পরীক্ষার আবেদন জানানো হয়। নথি অনুযায়ী, yardgen@gmail.com জিমেইল অ্যাড্রেস থেকে প্রথম ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬ জন কর্মকর্তা এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি আরও ১০ জনকে একই ধরনের ই–মেইল করা হয়। এসব ই-মেইলেও জন্মবৃত্তান্ত দেখার জন্য এমন একটি লিংক দেওয়া হয়, যাতে ক্লিক করলে অন্য একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যাবে।
ই–মেইলে লেখা ছিল:
‘আমি রাসেল আহলাম
আপনার প্রতিষ্ঠানের একজন অংশ হওয়ার ব্যাপারে আমি খুবই উৎসাহী এবং আশা করছি একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আমি আমার বিষয়টি আপনাকে বিস্তারিত জানাতে পারব।
এখানে আমার রিজিউম এবং কাভার লেটার দেওয়া হলো। রিজিউম এবং কাভার লেটারের ফাইল <http://www. [DOMAIN REDACTED]. com/CFDOCS/Allaire_Support/rasel/Resume. zip>
আপনার সময়ের জন্য এবং বিবেচনার জন্য আপনাকে অগ্রিম ধন্যবাদ।’
এরপর একই বছরের ১১ আগস্ট rsaflam@gmail.com থেকে বাংলাদেশের আরেকটি ব্যাংকে প্রায় একই ধরনের ই–মেইল পাঠানো হয়। পরের দিন একই ধরনের ই-মেইল পাঠানো হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ২৫ জন কর্মকর্তার কাছে।
বিবিসি জানায়, এফবিআই বলছে, ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে yardgen@gmail.com অ্যাড্রেস থেকে আসা ‘Resum.zip’ ফাইলটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত তিনটি কম্পিউটার থেকে ডাউনলোড করার চেষ্টা করা হয়। আর এভাবেই ২০১৫ সালের মার্চের মধ্যে ই–মেইলে পাঠানো ম্যালওয়্যারটি সফলভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে। এই ম্যালওয়্যার ফাইল স্থানান্তর, জিপ ফাইল তৈরি করতে সক্ষম ছিল।
এফবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, এর এক বছর পর, ২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্যাংকের নেটওয়ার্কের মধ্যে কিছু নাড়াচাড়া শুরু হয়। এগুলোর মধ্যে একটি নাড়াচাড়া ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেমের দিকে। আর এভাবে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার টার্মিনালে অনুপ্রবেশ করে লেনদেনের সুইফট বার্তা পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল, যেন মনে হবে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব কম্পিউটার সিস্টেম থেকে পাঠানো।
বিবিসি জানায়, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ স্থানান্তরের পরে ৬ ফেব্রুয়ারি হ্যাকাররা সুইফট সার্ভার থেকে বার্তাগুলো ডিলিট করতে আরেকটি ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে। তবে ম্যালওয়্যারটি সব কটি বার্তা মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়। ফলে হ্যাকারদের রেখে যাওয়া প্রমাণ এফবিআইয়ের নজরে আসে।

সুইফট নিয়েও সন্দেহ
ফরাসউদ্দিন কমিটি সুইফটের কার্যকলাপ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইফটের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি মি. রেড্ডি ও মি. অথরেশ আরটিজিএসের সঙ্গে সুইফটের সংযোগ ঘটান একান্ত নিজের মতো করে। তাঁরা নতুন এই প্রক্রিয়া চালানোর নির্দেশাবলিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও কাছে হস্তান্তর করেননি। এমনকি সংযুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে কারিগরি অসুবিধা দেখা দিলে ভিপিএন (ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সংযোগকালে সুইফটের ভাইরাস প্রতিরোধক (অ্যান্টিভাইরাস) অকার্যকর করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তা পুরোটাই মূলোৎপাটন করে দেন। এ ছাড়া সুইফট সার্ভার সর্বক্ষণ অন বা খোলা রাখার জন্য হার্ডওয়্যার সিকিউরিটি মডিউল বা এইচএসএম কার্ড কখনো সরানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এই এইচএসএম কার্ড সুইফট সার্ভারকে সারাক্ষণ চালু বা লাইভ রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। কার্ডটি বিযুক্ত করা থাকলে কোনোক্রমেই ৪ ফেব্রুয়ারি বার্তা পাঠিয়ে রিজার্ভের অর্থ চুরি করা সম্ভব হতো না। এ নিয়ে তদন্ত কমিটির মন্তব্য হচ্ছে, ‘এসব গুরুতর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অন্য সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নির্লিপ্ততা সত্যিই বিস্ময়কর।’
আবার ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে আরটিজিএস নিয়ে কাজ করতে আসেন সুইফট প্রতিনিধি এম নিলাভান্নান। তদন্ত প্রতিবেদনে এ নিয়ে বলা হয়েছে, শুরু থেকেই নিলাভান্নানকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাঁকে কাজ করতে দিতে অনেকেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি তিন দিনই কাজ করেছেন যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা এবং উপপরিচালক সালেহীন আবদুল্লাহর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে। তদন্ত কমিটি মনে করে, একা একা কাজ করার সময় নিলাভান্নান আইডি ও পাসওয়ার্ড মুখস্থ, কপি অথবা ছবি তুলে রাখতে পারেন।
এ নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সুইফটের কাছে মন্তব্য চেয়ে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে কি না পাল্টা প্রশ্ন করে ফিরতি ই–মেইল পাঠানো হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। প্রকাশ করা হয়নি জানানোর পর সুইফটের কাছ থেকে আর উত্তর আসেনি।

কার কতটা দায়
বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা প্রত্যক্ষভাবে রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ তদন্ত কমিটি খুঁজে পায়নি। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণকাঠামো ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে তাড়াহুড়ো, ব্যাক-অফিসে গান শোনা, জন্মদিনের অনুষ্ঠান আয়োজন, আড্ডা দেওয়া, ফেসবুকে চ্যাটিং, কম্পিউটারে গেম খেলা ইত্যাদিতে জনসাধারণের সম্পদ সংরক্ষণে গাফিলতি, খামখেয়ালি ও অদক্ষতার ছাপ স্পষ্ট।
রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত সাইবার অপরাধী বা হ্যাকাররা এ রকম এক অবস্থার মধ্যেই সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএস সংযুক্ত করায় একধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার (ম্যালিসিয়াস সফটওয়্যার) ঢুকিয়ে পাসওয়ার্ড চুরি করা সহজ হয়েছে। মূলত, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। ভিন্ন একটি দেশে অর্থ চুরির উদ্দেশ্যে একটি ম্যালওয়্যার তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে সুইফটে লেনদেনের বার্তা পাঠানোর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ রিয়াজউদ্দিন এবং মইনুল ইসলামের ব্যবহৃত নাম বা ইউজার আইডি এবং গোপন সংকেত বা পাসওয়ার্ড জেনে যায়। সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএস সংযুক্ত স্থাপন (২০১৫ সালের আগস্ট-অক্টোবর) সময়ে ম্যালওয়্যার ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়। তদন্ত কমিটির সন্দেহ, এ কারণেই হয়তো সুইফট কর্মকর্তারা আরটিজিএস সংযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও কাছে বুঝিয়ে দেননি।
২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিকস সাইবার সিকিউরিটির (ডব্লিউআইসিএস) রাকেস আস্তানাকে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রিজার্ভ চুরির পরে জরুরি তাগিদে দেশে এসে রাকেস আস্তানা ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথম সুইফট ব্যবস্থায় ম্যালওয়্যারের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এরপরই বিশ্বের অন্যতম সেরা সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফায়ারআই ম্যানডিয়ান্টকে অনুসন্ধান কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছে তদন্ত কমিটি। ফায়ারআই অনুসন্ধান করে বলেছে, প্রথম সাইবার ম্যালওয়্যার আক্রমণ সম্ভবত শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ। আর এই ম্যালওয়্যার ঢুকেছে সুইফট-আরটিজেএস সংযোগের মাধ্যমেই।
তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, শুক্রবার অর্থ চুরির বিষয়টি ধরতে পারলে নিউইয়র্ক ফেডে দ্রুত বার্তা পাঠিয়ে অর্থ স্থানান্তর ঠেকান সম্ভব হতো। একইভাবে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংককেও অর্থ পরিশোধ বন্ধ করা যেত। এমনকি সরকারকে জানানো হলে সরকারি পর্যায়ে ফিলিপাইন সরকারের কাছে বিষয়টি দ্রুত উত্থাপন করে অর্থ হস্তান্তর ঠেকানো সম্ভব ছিল। অর্থাৎ রিজার্ভ চুরির তথ্য গোপন না করলে পরিস্থিতি বরং ভিন্ন হতে পারত।
প্রসঙ্গত, পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে ফেলা হয় ৯ ফেব্রুয়ারি। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ চুরি যাওয়া বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছিল ৬ ফেব্রুয়ারি। সুতরাং ওই দিনই অর্থ চুরির বিষয়টি প্রকাশ করা হলে রিজাল ব্যাংক থেকে অর্থ সরানো ঠেকানো যেত বলে মনে করা হয়।

নিউইয়র্ক ফেড ও রিজাল ব্যাংকের ভূমিকা
৪ ফেব্রুয়ারি রাতে অর্থ হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩৫টি বার্তা পাঠানো হয়েছিল নিউইয়র্ক ফেডকে। এর মধ্যে ৩০টি বার্তায় অর্থ পরিশোধ নিয়ে সন্দেহ হলে নিউইয়র্ক ফেড অর্থ স্থানান্তর না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বার্তা পাঠায়। সাধারণত বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর হয় বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে, আর ব্যক্তির নামে পাঠানো হয় অল্প অঙ্কের অর্থ। পাঠানো ৩৫টি বার্তার মধ্যে ৩৪টি ছিল ব্যক্তির নামে। বাংলাদেশ থেকে কোনো জবাব আসার আগেই নিউইয়র্ক ফেড পাঁচটি বার্তা তামিল করে অর্থ পাঠিয়ে দেয়। ফরাসউদ্দিন কমিটি মনে করে, সন্দেহ হওয়ার পরেও অর্থ স্থানান্তর করার দায়দায়িত্ব নিউইয়র্ক ফেডের ওপরেও বর্তায়।
ব্যাংক খাতে দুর্নীতি বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করে নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনার সিটি প্রেস। তারা গত ২৪ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, ইউএস ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির দায়দায়িত্ব ও ভূমিকা জানতে নিউইয়র্ক ফেডকে একাধিকবার চিঠি লিখেও সদুত্তর পায়নি। কয়েক লাইনের একটি প্রতিবেদন দেওয়া হলেও সেখানে কোনো তথ্য ছিল না।
অর্থ পরিশোধ না করার বার্তা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফিলিপাইনকেও দেওয়া হয়েছিল। তারপরও রিজাল ব্যাংক বা আরসিবিসি অর্থ স্থানান্তর করে মোটেই দায়িত্বশীল ও নির্ভর করার মতো প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেনি। আর এর মাধ্যমে তারা একটি কলঙ্কজনক নাটক রূপায়িত করেছে বলে মন্তব্য তদন্ত কমিটির। কেননা, ঘটনার মাত্র ছয় মাস আগে গ্রাহকের সঠিক পরিচয় ছাড়াই মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার জমা দিয়ে চারটি হিসাব খোলা হয়েছিল। আর সেখানেই চুরি করা অর্থ জমা করে পরে তুলে নেওয়া হয়।


মানা হয়নি সুপারিশ
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্ব গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ সুপারশ করলেও মানা হয়েছে অল্প কয়েকটি। কারও বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমনকি সামগ্রিক ব্যাংক খাত পরিচালনা বিষয়ে করা সুপারিশও সরকার আমলে নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেনব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। আর রিজার্ভ চুরির ঠিক পরপরই সুইফট থেকে আরটিজিএস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফরাসউদ্দিন কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সব সার্ভার রাখা আছে প্রধান কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায়। আর ব্যাকআপ সার্ভার রাখা হয়েছে মিরপুরের বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশিক্ষণ একাডেমিতে। তবে আগের মতোই ব্যাক-অফিস পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের (এবিডি) মাধ্যমে। এই কক্ষে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। রিজার্ভ চুরির সময় যাঁরা ওই বিভাগে কর্মরত ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই এখনো ওই বিভাগে রয়ে গেছেন। এর মধ্যে মুখলেসুর রহমান, জুবায়ের বিন হুদা, মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, শেখ রিয়াজউদ্দিন, রফিক আহমেদ মজুমদার, মইনুল ইসলাম এখনো অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগে কর্মরত। এর মধ্যে ১৫ জানুয়ারি যুগ্ম পরিচালক থেকে পদোন্নতি পেয়ে উপমহাব্যবস্থাপক হয়েছেন জুবায়ের বিন হুদা। আর আইটি বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক রাহাত উদ্দিন এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে কর্মরত।
জানা গেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে, স্বাভাবিক নিয়মে সবার পদোন্নতি ও বদলি অব্যাহত আছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুজন ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
যদিও তদন্ত কমিটি দায়িত্বহীনতা, কাজে গাফিলতি ও অদক্ষতার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাত কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে আইটি বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক রাহাত উদ্দিন খানকে নিয়ে কমিটির মন্তব্য হচ্ছে, সুইফট-আরটিজেএস সংযোগকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যা করণীয় ছিল, তার অবহেলা করে তিনি দেশের ক্ষতি করেছেন। আর অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের জুবায়ের বিন হুদা, মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, শেখ রিয়াজউদ্দিন ও রফিক আহমেদ মজুমদারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে চুরি ঘটনা সম্পন্ন হতে সহায়তা করেছে। এ ছাড়া শেখ রিয়াজউদ্দিন ও মইনুল ইসলাম তাঁদের পাসওয়ার্ড চুরি (তদন্ত কমিটির ভাষায় কম্প্রোমাইজড) হতে দিয়ে বিপত্তির সৃষ্টি করেছেন।
তদন্ত কমিটি এঁদের মধ্যে দুই কর্মকর্তার বিষয়ে আরও বেশি তদন্ত করার সুপারিশ করেছে। কমিটি বলেছে, উপপরিচালক জি এম সালেহীন আবদুল্লাহ এবং মুখলেসুর রহমান রিজার্ভ চুরির সহায়তাকারী না অংশীদার, তা নিয়ে তদন্ত করা জরুরি। কেননা, তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা সেন্টার থেকে অনেকবারই সুইফট বার্তা প্রেরণকারী মেইন সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। জি এম সালেহীন আবদুল্লাহর ল্যাপটপ থেকে ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বরের পর নয়বার এ ধরনের যোগাযোগ করা হয়েছে। ৩ ফেব্রুয়ারি সালেহীন আবদুল্লাহর ল্যাপটপের লগবার্তাগুলো মুছে ফেলা, পরের দিন ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ হস্তান্তরের জন্য ৩৫টি বার্তা পাঠানো এবং ভোররাত ৪টা ২৩ মিনিটে লগআউট হওয়া যখন সংগঠিত হয়, তখন উপপরিচালক মুখলেসুর রহমান ডেটা সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলনকক্ষে গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ নিয়ে জানতে চাইলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে গভর্নর আর কোনো জবাব দেননি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে সিআইডির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে এ ঘটনায় কেউ জড়িত বা দোষী কি না, তা জানা যায়নি। এ কারণে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ অব্যাহত আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এ বক্তব্য দিলেও বাংলাদেশ গত সাড়ে তিন বছরে অভ্যন্তরীণ কোনো তদন্ত করেনি, কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। বরং পদোন্নতি ও বদলি অব্যাহত রেখেছে।
একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে কমিটির অন্যতম সদস্য ড. কায়কোবাদের তত্ত্বাবধানে তিনজন দেশি বিশেষজ্ঞের একটি দল বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের বার্তাপ্রবাহ ছাড়াও প্রযুক্তিগত সব বিষয়ে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়। কমিটির আশা ছিল সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক তা দ্রুতগতিতে বিবেচনা করবে।
এ ছাড়া কমিটি সুইফটকে আরটিজিএস থেকে বিচ্ছিন্ন করে তা আলাদা পরিচালনার এবং একটি ব্যাকআপ সার্ভার ঊর্ধ্বতন কারও কক্ষে সংরক্ষণ, সুইফটে বার্তা প্রদানকারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, বিশেষ ভাতা এবং রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরীক্ষারব্যবস্থা চালু এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৮০ শতাংশ মার্কিন ডলারে না রেখে বিশ্বের আরও কয়েকটি প্রধান মুদ্রায় সংরক্ষণ করার সুপারিশ করেছিল।
তদন্ত কমিটির আরও সুপারিশ ছিল চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে, ভুলভ্রান্তিগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। কোনো আগ্রাসী তৎপরতা নয়, বরং নিউইয়র্ক ফেড, সুইফট, আরসিবিসি-সবার সঙ্গে অত্যন্ত ভদ্র অথচ দৃঢ় ভাষায় যোগাযোগ করে সহযোগিতা চাইতে হবে। খুব ভালো হয় যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক কৌশলী তৎপরতায় এবং অত্যন্ত যোগ্য আইনি পরামর্শে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
ফরাসউদ্দিন কমিটি ব্যাংক ব্যবস্থা পরিচালনা নিয়েও বেশ কিছু সুপারিশ করে। কমিটি বলেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের টানাপোড়েন আর চলতে দেওয়া যায় না। আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক সংস্কারের পরিমণ্ডলে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সার্বিক নজরদারির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া যেতে পারে। আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিমা, বিশেষায়িত ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি করতে পারে। এ ছাড়া একটি দক্ষ ও দায়িত্বশীল ব্যাংকব্যবস্থা গড়তে সরকারের ট্রেজারি সোনালি ব্যাংক ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্র খাতের ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর অথবা শেয়ারবাজারে পুঁজি বিক্রি করে জনসাধারণের অংশগ্রহণে তাদের মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। ব্যাংকসহ করপোরেট খাতে একীভূত ও একত্রকরণ (মার্জার ও অ্যাকুইজিশন) আইন পাস করার কাজটি দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা যেতে পারে।
তদন্ত কমিটি গভর্নরের মেয়াদ বাড়িয়ে একবারেই পাঁচ বা ছয় বছর এবং গভর্নরের মানক্রম কমপক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমান বা আরও এগিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কমিটির আরও সুপারিশ হচ্ছে এটিএম মেশিন থেকে বারবার অর্থ চুরির ঘটনার আদ্যোপান্ত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আরোপ, জনসাধারণের অপূরণীয় ক্ষতি রোধে মোবাইল ব্যাংকিংকে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক পরিমণ্ডলে নিয়ে আসা এবং দেশে-বিদেশে লেনদেন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি শনি ও রোববার করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে সুপারিশ মানা হয়নি বললেই চলে। এমনকি এ নিয়ে আর কোনো আলোচনাই হয়নি। তবে রিজার্ভ চুরি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে-বিদেশে মামলা করেছে। এর মধ্যে দেশে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় প্রথম মামলাটি করা হয়। ১৬ মার্চ মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থাকে (সিআইডি)। সে থেকে এখন পর্যন্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি সিআইডি। এ নিয়ে ৩৫ বার আদালতের মাধ্যমে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পাল্টানো হয়েছে।

শেষ কথা
ফরাসউদ্দিন কমিটির প্রতিবেদন ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে গেছে অনেক আগেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এমনকি কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়নি। পুলিশের মামলা আর বিভাগীয় ব্যবস্থা ভিন্ন বিষয় হিসেবেই গণ্য করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে এর দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়াই রীতি। আর কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হলে সেটি অনুসন্ধান করা পুলিশের দায়িত্ব। একদিকে সিআইডি এখনো প্রতিবেদন দেয়নি, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণ কোনো তদন্ত কমিটি গঠন বা বিভাগীয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
চাকরির বিধান নিয়ে অসংখ্য বইয়ের লেখক সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, কোনো সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী (বর্তমান আইনে সবাই কর্মচারী) যদি ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হন, তাহলে দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। একটি হলো বিচারিক ব্যবস্থা, আরেকটি হলো অসদাচরণের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা। বিচারিক ব্যবস্থায় কেউ অভিযুক্ত হলে তাঁকে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে বিচারিক ব্যবস্থা না হলেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বাধা নেই।
বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়া ছাড়াও ফরাসউদ্দিন কমিটির কোনো সুপারশও আমলে নেওয়া হয়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত অর্থ উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি। সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে ছিলেন আরও দুই সদস্য। এর বাইরে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করেছে কমিটির পরামর্শক দল হিসেবে। রাষ্ট্রের জন্য এত বড় একটি ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া কিংবা বিচারের বাইরে থেকে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ সামগ্রিক বিষয়ে গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, রিজার্ভের অর্থ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাই এ ঘটনা গোপন করা ঠিক হয়নি। যথাসময়ে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এত দিনে টাকাটা উদ্ধার করা যেত। তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনায় দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সেটা দৃশ্যমান হলে অনিয়ম, জালিয়াতি কমে আসত। কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় জালিয়াতি বাড়ছে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, প্রথম আলো

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.