দুই আর দুই মিলে যখন পাঁচ হয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 2 minutes

ছোটদের কাছ থেকে এই মজার গল্পটা প্রায়ই শোনা যায়—‘বলো তো, কখন দুই আর দুই মিলে পাঁচ হয়?’ উত্তরটা হচ্ছে, ভুল করলে। অন্য গল্পটা বড়দের। পরিসংখ্যানবিদ পদে লোক নেওয়া হবে। সবার জন্য একটাই প্রশ্ন—‘দুই আর দুই মিলে কত হয়।’ সবাই বলেছিলেন চার। কেবল একজন বললেন, ‘আপনি কত চান।’ চাকরিটা হয়েছিল তাঁরই।

বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ পরিসংখ্যান এই দুই গল্পের মধ্যেই কোথাও আছে। সরল বিশ্বাসীরা বলবেন, ভুল করে দুই আর দুই মিলে পাঁচ হয়ে গেছে। আর বাকিরা ঠিকই বুঝতে পারেন, আসলে দুই আর দুই মিলে পাঁচই চাওয়া হয়েছিল।

গল্প দুটো মনে পড়ল গতকাল বুধবার অর্থনীতিসংক্রান্ত দুটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত দেখে। একটি সংবাদ সম্মেলন ছিল রাজস্ব আদায় বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর), অন্যটি মুদ্রানীতি ঘোষণা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের। এর মধ্যে অবশ্য এনবিআর বিশেষ ধন্যবাদ পাবে। কারণ, আদায় পরিস্থিতি যেমনটাই হোক, সংস্থাটির চেয়ারম্যান নিয়মিতভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সাংবাদিকদের মুখোমুখি পারতপক্ষে হন না। বছরে দুবার তিনি মুদ্রানীতির ঘোষণা দেন। কিন্তু গতকাল জানানো হয়েছে, এখন থেকে মুদ্রানীতি হবে এক বছরের জন্য। সুতরাং দুরবস্থায় থাকা ব্যাংক খাত নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন থেকে রেহাইও পাচ্ছেন তিনি।

এনবিআর গতকাল জানিয়েছে, বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৬ হাজার ১৭১ কোটি টাকা, আর মূল বাজেট ধরলে ৭২ হাজার কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায়ে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ, কিন্তু হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।

রাজস্ব কম আদায়ের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে এনবিআর। এ জন্য কর ফাঁকি ও নানা ক্ষেত্রে কর ছাড়কে মূলত দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কম ঋণপ্রবাহের কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বহুল চর্চিত একটি ব্যাখ্যা আবারও দিয়েছে। সেটি হচ্ছে, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়, মান বাড়ানোর দিকে ছিল কঠোর নজরদারি। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর এই নজরদারির কথা বলে আসছে, আর খেলাপি ঋণও তত বাড়ছে।

গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বেশ বড় একটি মাইলফলক অর্জন করেছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ রকম একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময়েও রাজস্ব ঘাটতি বিশাল, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও অনেক কম। দেশের অর্থনীতির প্রকৃত দুর্বলতার প্রমাণই হচ্ছে এসব সূচক। গত অর্থবছরে উৎপাদন খাত যে ভালো অবস্থায় ছিল না, ব্যবসা-বাণিজ্যে ছিল মন্দা, বিনিয়োগে ছিল স্থবিরতা, ব্যাংকে ছিল নগদ অর্থের তীব্র সংকট, অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসবেই প্রতিফলিত হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি। এখন এত সব দুর্বলতা সত্ত্বেও কী করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেল, এই প্রশ্ন যাঁরা করবেন, তাঁদের শুরুতে বলা গল্প দুটি আবারও পড়তে বলি।

নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া নিশ্চয়ই রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জটি নিতে চাইবেন। কিন্তু এ জন্য বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে হবে, কমাতে হবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার খরচ, ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট কাটাতে হবে, আদায় করতে হবে খেলাপি ঋণ, কমাতে হবে সুদহার, ফিরিয়ে আনতে হবে উৎপাদন খাতের চাঞ্চল্য। তবেই না বাড়বে রাজস্ব আদায়। নইলে জোরজবরদস্তি করে কর আদায়ের নীতি নিতে হবে। আর তাতে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়বে, তাতে বিপাকে পড়বে সাধারণ ভোক্তারা। আর এর সব শেষ ফল হচ্ছে আবারও দুই আর দুই মিলে হয়ে যাবে পাঁচ।

০১ আগস্ট ২০১৯

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.