দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় বলা হলো না অনেক কিছুই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 5 minutes

অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি।
তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি।

রবীন্দ্রনাথের গানের এই দুটি লাইন মনে পড়লো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাজেট বক্তৃতা পড়ে। সুমধুর সংগীতের সঙ্গে বাজেটের মতো একটি নিরস আর জটিল বিষয়ের তুলনা করতেই হলো। তবে একজন অর্থনীতির ছাত্র ও অর্থনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে বাজেটের ভাষা বোঝার আশা জলাঞ্জলি দেওয়া গেল না। বরং বুঝতে চেষ্টা করে মনে হল, এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী অনেক কথা বলেছেন ঠিকই কিন্তু আবার ধরতে গেলে অনেক কথাই বলেননি। বাজেটে প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে লুকানো তথ্যই মনে হল বেশি।
অর্থমন্ত্রী গত ১০ জুন যে বাজেটটি দিলেন সেটি দেশের ৩৯তম বাজেট। আবার এটিকে ৪০তম বাজেটও বলা যায়। কারণ, দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন একসঙ্গে ১৯৭১-৭২ এবং ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট দিয়েছিলেন। এরপর থেকে মোটামুটি একই ধাচের বাজেট বক্তৃতা দিয়ে আসছেন অর্থমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। যদিও বাজেট বক্তৃতায় নয় বরং উপস্থাপনায় বড় ধরণের অগ্রগতি হয়েছে বলা যায়। ১৯৯২ সালে বৃটিশ সাহায্য সংস্থা ডিএফআইডির সহায়তায় অর্থমন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প শুরু করেছিল। বাজেটীয় বরাদ্দ এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সংস্কার নামের এই প্রকল্পটি রিবেক (রিফর্মস ইন বাজেটিং অ্যান্ড এক্সপেনডিচার কন্ট্রোল) নামেই পরিচিত। এর ফলে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনেক স্বচ্ছতা এসেছে। আগে বাজেটের সময় দেওয়া অসংখ্য পরিসংখ্যান সমৃদ্ধ বই থেকে কিছু উদ্ধার করা কঠিন ছিল, এখন মোটামুটি সহজেই বাজেট পরিসংখ্যান বোঝা যায়।
বাজেটের বিশাল বিশাল টাকার অংকের পরিসংখ্যান পাওয়া এবং বুঝতে পারা যখন সহজ ও স্বচ্ছ হয়ে গেছে, তখন পত্র পত্রিকায় বাজেট নিয়ে রিপোর্টিং-এর ধারা অনেক খানি পাল্টে গেছে। বাজেটের আকার যদি এক লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা হয়, তাহলে এই পরিসংখ্যান তুলে দেওয়ার মতো সহজ সাংবাদিকতা এখন আর নেই। বরং সাধারণ মানুষের উপর বাজেটে প্রভাব কী পড়ছে সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেটিই এখন গণ মাধ্যমে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, বাজেটের এক গাদা পরিসংখ্যান নয়।
এবারের বাজেট বক্তৃতাটি বেশ দীর্ঘ। পরিশিষ্ট বাদ দিলে ৯২ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মোটামুটি সব বিষয় নিয়েই কথা বলেছেন। এর মধ্যে ৭৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তিন অধ্যায়ে অর্থমন্ত্রী শুকরিয়া আদায় থেকে শুরু করে অর্থনীতি এবং এর সংশ্লিষ্ট অনেক কথা বলেছেন। আর শেষ অধ্যায়ে মাত্র ১৩ পৃষ্ঠায় তিনি রাজস্ব কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়েছেন। এর সঙ্গে ১৯ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে রাজস্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের বিবরণ। মূলত বাজেটের কারণে নতুন অর্থবছরে মানুষের যাপিত জীবন কেমন যাবে, তা এই রাজস্ব কার্যক্রম থেকেই জানতে পারার কথা। কিন্তু বাজেট বক্তৃতা পড়ে তা এবার জানা গেলো না। রাজস্ব কার্যক্রমের দিক থেকে এবারের বাজেটটিকে অস্বচ্ছই বলা যায়।
বাজেট থেকে সাধারণ মানুষ কি জানতে চায়? কত টাকার বাজেট, আয় কতো, ব্যয় কতো, ঘাটতি কতো, সর্বোচ্চ বরাদ্দ কোন খাতে, সুদ পরিশোধে কত বরাদ্দ, এসব? না কি কোথায় কোথায় নতুন করে বা বেশি হারে কর দিতে হবে সেটি? বাজেট বক্তৃতা পড়ে বা শুনে সাধারণ মানুষ আসলে তেমন কিছুই বুঝতে পারবে না। অর্থমন্ত্রী দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় অনেক কিছুই বলেছেন, আবার বলেননি এমন গুরুত্বপূর্ণ কথাও কম নয়। অর্থমন্ত্রী সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কথাগুলোই বলেননি।
২০০৯-১০ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে ৭৯ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। আর আগামি অর্থবছরের জন্য আয়ের পরিকল্পনা ৯২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামি অর্থবছরে জনগনকে বাড়তি কর দিতে হবে ১৩ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। এবার অর্থমন্ত্রী যে কেবল করের আওতা বাড়িয়েছেন তা না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে করের হারও বাড়িয়েছেন। এর ফলে এমনকি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায় বেশি হবে বলেই মনে করছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসছে, কোন কোন খাতে কর বসলো, কত হারে বসলো?
অস্বচ্ছতার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। অর্থমন্ত্রী ৮১ নং পৃষ্ঠায় উৎস মূলে আয়কর সংগ্রহের হার যৌক্তিকরণ করা প্রয়োজন বলে এর বিস্তারিত পরিশিষ্টের ৫ম অংশে আছে উল্লেখ করেছেন। পরিশিষ্ট পড়ে জানার কোনো উপায় নেই যে, আমদানি পর্যায়ে উৎসে আয়করের হার ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। আগামি ২০১০-১১ অর্থবছরে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। এর বড় অংশ থেকেই উৎসে আয়কর কেটে নেওয়া হবে। এতে বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে এক হাজার কোটি টাকার অনেক বেশি। এর অর্থ হচ্ছে প্রায় সবধরণের আমদানি পণ্যের দাম বাড়ছে, যা অবশ্যই বাজারে প্রভাব ফেলবে। এতবড় একটি সিদ্ধান্তের কথা অর্থমন্ত্রী বাজেটে উল্লেখই করলেন না।
সঞ্চয়পত্র নিরাপদ বিনিয়োগ নামেই পরিচিত। কারা কেনেন সঞ্চয়পত্র? অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। গৃহিনী থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্তরাই সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন। শেয়ার বাজারের রমরমা অবস্থাতেও ঝুঁকির কারণে তারা সেখানে যাবেন না। অনেকেরই জীবন চলে সঞ্চয়পত্রের আয় থেকে। সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ আগের তুলনায়ও অনেক বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার, আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই বিক্রি হয়েছে ১৮ হাজার ৯০৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। এতদিন এই সঞ্চয়পত্রের আয় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ছিল আয়করমুক্ত। আর পেনশনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যে বিশেষ সঞ্চয়পত্র, তা ছিল সম্পূর্ণই করমুক্ত।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতার ১৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ‘অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবে এ স্কিমগুলো তাঁদের উপকারে আসে।’ এ কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী কেবল বলেছেন যে, ‘আগামি অর্থবছরে আমরা ঋণসীমা, ঋণের পরিমাণ ও সুদের হারসমূহের যৌক্তিকীকরণের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়নের আশা করছি।’ এ কথা বলা হলেও আসলে বাজেটে সঞ্চয়পত্রকে সম্পূর্ণভাবে আয়করের আওতায় আনা হয়েছে। এমনকি পেনশনভোগীরাও আর ছাড় পাচ্ছেন না। অথচ বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তের কথা জানানোরই প্রয়োজন বোধ করলেন না।
সারা দেশজুড়ে রয়েছে অসংখ্য খুচরা ও ক্ষুদ্র দোকানদার। তাদেরকে বছর নির্দিষ্ট হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) দিতে হয়। নতুন বাজেটে সবার কর বাড়ানো হয়েছে। যেমন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য এতদিন দিতে হয়েছে ৪২০০ টাকা, নতুন অর্থবছর থেকে দিতে হবে ৬ হাজার টাকা, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দিতে হত ৩৬০০ টাকা, বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮০০ টাকা, অন্যান্য জেলা শহর ও পৌর এলাকায় এর পরিমান ছিল ২৪০০ টাকা, করা হয়েছে ৩৬০০ টাকা এবং দেশের বাকি এলাকায় এই মূসকের পরিমাণ ১২০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১৮০০ টাকা করা হয়েছে।
আবার আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রীম ব্যবসায় মূসকের হারও (এটিভি) ২ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসকের হার ছিল দেড় শতাংশ, করা হয়েছে ৩ শতাংশ।
সারা দেশের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা কর বাড়ানোর এই তথ্য কোথা থেকে জানবে? জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারী করলেই কি যথেষ্ট? বাজেট বক্তৃতার মাধ্যমে দেশের সবাইকে একসঙ্গে জানানোর সুযোগটা নিলেন না কেন অর্থমন্ত্রী?
এবার আসা যাক কালো টাকা প্রসঙ্গ। চলতি বাজেটে কালোটাকা সাদা করার ব্যাপক সুযোগ দিয়েছিলেন। পরে সমালোচনার মুখে এই সুযোগ ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত রাখা হয়। ফলে এমনিতেই আগামি ৩০ জুন কালো টাকা সাদা করার সুযোগের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী কিন্তু বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আবার দিয়েছেন। অথচ বাজেট বক্তৃতায় তিনি সে কথা উচ্চারণই করেননি। ৭৯ পৃষ্ঠায় তিনি একটি ভৌত অবকাঠামো অর্থায়ন তহবিল গঠনের কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘এই তহবিলের ইস্যুকৃত বন্ডে জুন ২০১২ সাল পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে কর প্রদান সাপেক্ষে বিনিয়োগের বিধান প্রবর্তন করা হবে।’ অর্থবিল ঘেটে দেখা গেলো, এটি আসলে কালো টাকা সাদা করারই সুযোগ। কেননা, আয়কর অধ্যাদেশে ১৯সি নামে একটি ধারা সংযোজন করে বলা হয়েছে, এই তহবিলে বিনিয়োগ করলে অর্থের উৎস সম্বন্ধে কোনো প্রশ্নই করা হবে না।
এরকম অনেক কথাই নেই বাজেট বক্তৃতায়। আদতে এবারের বাজেটে লুকানো আছে অনেক কিছুই। এই অস্বচ্ছতার কারণও বোঝা গেলো না। বাজেট তৈরির প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল। এ জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ে একটি আলাদা বিভাগ আছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত যেসব কথা বাজেট বক্তৃতায় লেখা থাকে সেসব পাঠায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। আর রাজস্ব কার্যক্রম অংশটি তৈরি করে দেয় এনবিআর। এসব পেয়ে নিজস্ব বক্তব্য ও দর্শন ঢুকিয়ে অর্থমন্ত্রী তৈরি করেন বাজেট বক্তৃতা। সুতরাং এনবিআর কেন সবকিছু পরিস্কার করলো না সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মানুষ কম জানলেই কি বাজেট সমালোচনা কম হয়?
নাসিরউদ্দিন হোজ্জার পুরানো সেই গল্পটি এখানে বলা যায়। হোজ্জাকে জব্দ করতে সবাই নিয়ে গেল মসজিতে খুতবা দিতে। হোজ্জাকে সবার উদ্দেশ্যে বললো, ‘আপনারা কেউ কি জানেন, আমি কি নিয়ে বলবো?’ সবাই বললো, না। তখন হোজ্জা বললো, ‘আপনারা তো কিছুই জানেন না, আপনাদের আর কি বলবো’-এই বলে হোজ্জা চলে গেলেন। পরের সপ্তাহে আবার নিয়ে আসা হলো হোজ্জাকে। তিনি আবার একই প্রশ্ন করলেন। এবার সবাই প্রস্তুত, সমস্বরে বললেন তারা জানেন হোজ্জা কি নিয়ে খুতবা দিবেন। হোজ্জা বললেন, ‘জানেনই তো সবাই সব। আমি আর কি বলবো তাহলে?’। এর পরের সপ্তাহে শলাপরামর্শ করে সবাই উত্তর ঠিক করে রাখলো। হোজ্জা প্রশ্ন করতেই একদল বললো, তারা জানেন, আরেকদল বললো তারা জানেন না। এবার হোজ্জা বললো, ‘যারা জানেন, তারা যারা জানেন না তাদেরকে বলেন।’ এ কথা বলে হোজ্জা আবার চলে গেলেন।
বাজেট প্রস্তাব জানা এবং জানানো শেষ পর্যন্ত হয়তো এই পর্যায়েই চলে এলো।

(লেখাটা ২০১৩ সালে প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে। তবে জায়গার অভাবে কিছু অংশ বাদ যায। যদিও আজকাল আর প্রকাশিত লেখা ব্লগে দিতে ভাল লাগে না। তারপরেও বাজেট বলেই দিলাম। পাশাপাশি সম্পূর্ণ লেখাটা সংরক্ষনে রাখাটাও হলো।

 

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.