টাকা পাচার কেন করে, কীভাবে করে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 12 minutes

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম নির্বাচন কমিশনের কাছে আয় ও সম্পদের কোনো দৃশ্যমান উৎস দেখাননি। ব্যাংকে আমানত এবং চার প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আছে বলে দেখানো হয়। ব্যাংকে আমানত আছে পৌনে চার কোটির টাকার একটু বেশি আর আছে প্রায় ২৩ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের শেয়ার। এর মধ্যে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেরই শেয়ার ২২ কোটি টাকার। ফোর পয়েন্ট জেনারেল ট্রেডিং ও ফোর পয়েন্ট হাউজিং নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফোর পয়েন্ট হাউজিং রিহ্যাবের সদস্যও নয়। আয়কর বিবরণীতে বরং তিনি বলেছেন, উল্টো তিনি এই কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছেন। এভাবে ঋণ দেখানো হয় মূলত আয়কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে দেওয়া আয়কর বিবরণী অনুযায়ী, মোহাম্মদ শহিদ ইসলামের একমাত্র আয় ব্যাংকে আমানত রেখে ৭৩ লাখ টাকা সুদ প্রাপ্তি। কৃষি, বাড়ি, ব্যবসা, চাকরি কিছুই তার নেই। পেশার ঘর খালি, কোনো বৈদেশিক মুদ্রাও নেই। এমনকি বিদেশ থেকে কোনো আয়ও নেই। অথচ কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন করেছেন, একজন প্রার্থীকে বসিয়ে দিয়েছেন, ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীদের সমর্থন কিনেছেন, স্ত্রীকেও সাংসদ বানিয়েছেন। সবকিছুই হয়েছে সবার চোখের সামনে, কেউ কিছু বলেননি, করেননি, বরং পেছনে থেকে সমর্থন দিয়ে গেছে। অথচ সবাই জানতেন তাঁর বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস কি।
যেকোনো ভাবে অর্থ উপার্জন করাও এক ধরনের ব্যবসা। তবে বৈধ ও অবৈধের একটা বড় পার্থক্য আছে। অবৈধ অর্থের লেনদেন নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) হিসাবে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অর্থ আসে নানা ধরনের জাল পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে। এরপরেই আছে মাদক ব্যবসা ও মানব পাচার থেকে আয়। এই তিন অবৈধ ব্যবসাই বাংলাদেশে আছে। এর মধ্যে মাদক ব্যবসার একটা বড় রুট বাংলাদেশ। মানব পাচারের একটি বড় উৎস বাংলাদেশ।
মোহাম্মদ শহিদ ইসলামের বিপুল অবৈধ সম্পদের বড় উৎস এই মানব পাচার। অবৈধ টাকার জোরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বড় উদাহরণ তিনি। রাষ্ট্র, রাজনীতি, ক্ষমতা এবং অবৈধ ব্যবসার যে নেক্সাস বা বন্ধনের কথা শোনা যায়, মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম তারই একটি উদাহরণ মাত্র। ভিসা বাণিজ্য, মানব পাচার ও ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে কুয়েত সরকার তাকে আটক করেছে, তাঁর কোম্পানির ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করেছে। সরকার যে কালো টাকার খোঁজে থাকে, মূল ধারায় নিয়ে আসার কথা বলে, সাদা করার সুযোগ দেয়-সেই কালো টাকার মালিক এই মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম।
সুযোগ দিলে কালো টাকা মূল ধারায় ফিরে আসে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা গবেষণা নেই। কালো টাকার মালিকেরা নিজ দেশে বিনিয়োগ করেছেন এমন কোনো বড় উদাহরণও নেই। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কালো টাকা বিনিয়োগ জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশ থেকে উপার্জিত কালো টাকার গন্তব্য মূলত অন্য দেশ। সুইস ব্যাংকে জমা হয় কিছু অংশ, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্র অথবা অন্য কোনো দেশে সম্পত্তি কেনা হয়। আবার কিছু কালো টাকা দিয়ে সিঙ্গাপুরে পাঁচ তারকা হোটেল বা বাণিজ্যিক জায়গা কেনা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বা থাইল্যান্ডে বিনিয়োগ হয়। আবার ‘ট্যাক্স হেভেন’ নামের পরিচিত রাষ্ট্রগুলোয় বেনামে কোম্পানি খোলা হয়। মূল কথা হলো, কালো টাকা দেশে থাকে কম, পাচার হয় বেশি।

কালো টাকার সন্ধানে
কালো টাকার প্রসঙ্গ এলেই সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, এগুলো আসলে অপ্রদর্শিত অর্থ, যা আয়করের খাতায় দেখানো হয় না। আর এসব অর্থকে সব সময় অবৈধ বলা যাবে না। অর্থাৎ বৈধ আয়ও আয়কর বিবরণীতে না দেখালে সেটি অবৈধ হয় যায়। সরকার বলতে চেষ্টা করে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এসব মানুষের জন্যই। সরকার দাবি করলেও এরও কোনো প্রমাণ নেই।

ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী কীথ হার্ট ১৯৭১ সালে ঘানার ওপর এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রথম ইনফরমাল ইকোনমি বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কথাটি ব্যবহার করেছিলেন। এরপর থেকেই অবৈধ অর্থনীতির সমার্থক হিসেবে ‘ইনফরমাল ইকোনমি’, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি’, ‘হিডেন ইকোনমি’, ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বা ‘আনরেকর্ডেড ইকোনমি’ শব্দগুলি ব্যবহার হয়ে আসছে।
বিশ্বব্যাপী কালো টাকা নিয়ে সবচেয়ে বড় গবেষক জার্মান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নাইডার। তিনি মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া বা কালো অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে মূলত সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কর কাঠামোর অব্যবস্থার কারণে। তাঁর সমীক্ষা অনুযায়ী, গড়ে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা আছে লাতিন ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে, সাব-সাহারা আফ্রিকা ও এশিয়ায়। ধনী দেশগুলোতে কালো টাকার হার তুলনামূলকভাবে কম।
প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ কত। অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নাইডারের হিসাব অনুযায়ী তা জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদেরা বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে সরকারিভাবে সে রকম কোনো গবেষণা নেই। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উদ্যোগে ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় এ নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছিল। ‘বাংলাদেশের অপ্রকাশ্য অর্থনীতির আকার: একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ নামের এই সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে কালো টাকার হার জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৮১ শতাংশ। সমীক্ষায় ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কে বিবেচনা করা হয়েছিল। সমীক্ষায় বলা ছিল, কালো টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু ব্যক্তির হাতে সম্পদ ঘনীভূত হচ্ছে। এতে সমাজে জীবনযাত্রার মানেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
কালো টাকা নিয়ে আরেকটি সমীক্ষা চালান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক সদস্য আমিনুর রহমান। ‘ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সেশন অব দা আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি’ নামের সেই সমীক্ষায় তাঁরা অবৈধ অর্থনীতির উৎস হিসেবে ঘুষ, জুয়া, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অবৈধ অভিবাসন, ইত্যাদির কথা বলেছিলেন। এ ছাড়া বৈধ পথে আয় হলেও কর ফাঁকি দেওয়াকে তাঁরা কালো টাকার আরেকটি বড় উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর থেকে এই কালো টাকা সাদা করার জন্য অন্তত ২০ বার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জরিমানাসহ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি সাদা হয়নি। এই অর্থ দেশের কালো টাকার তুলনায় অতি সামান্য বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাহলে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা কোথায় যায়? গন্তব্য মূলত অন্য দেশ, অর্থাৎ পাচার।

টাকা পাচার: সুইস ব্যাংক মডেল
১৯৩০ এর দশকে ফ্রান্সের রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ টাকা পাচার করে সুইজারল্যান্ডসের ব্যাংকগুলোতে গোপনে রেখে দিয়েছিল। পরে সেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এরপরেই ১৯৩৪ সালে সুইজারল্যান্ড সুইস ব্যাংকিং অ্যাক্ট নামে একটি আইন পাস করে। আইন অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের তথ্য সুইস ব্যাংকগুলো প্রকাশ করতে পারবে না। মূলত এর পর থেকেই সুইস ব্যাংকগুলোর গোপন হিসাবে অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়ে যায়। তবে ৩০ এর দশকের শেষ দিকে জার্মানিতে নাৎসিদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করলে ইহুদিরা তাদের অর্থ সুইস ব্যাংকে রাখা শুরু করে। সুইস ব্যাংকের রমরমা ব্যবসা তখন থেকে শুরু।
তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিবাজ সামরিক-বেসামরিক শাসক ও রাজনীতিবিদ এবং উন্নত বিশ্বের অসাধু ব্যবসায়ীদের অর্থ গোপন ও লুকিয়ে রাখার বড় জায়গা এই সুইস ব্যাংক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সুইজারল্যান্ডের বিশেষ খ্যাতি আছে। সুইজারল্যান্ডে আছে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান কার্যালয়। শান্তির ও নিরপেক্ষ দেশ হিসেবেই সুইজারল্যান্ডের পরিচিতি। এ রকম একটা স্বপ্নের দেশই অপরাধীদেরও খুব প্রিয়, আর তা সুইস ব্যাংকে জন্য।
তবে কর ফাঁকি, অপরাধমূলক ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে হচ্ছে তাদের। নানামুখী চাপে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) স্বল্প পরিসরে হলেও স্বল্পপরিসরে দেশভিত্তিক আমানতের পরিমাণ প্রকাশ করে আসছে ১৯৮৭ সাল থেকে। তবে সুনির্দিষ্ট গ্রাহকের তথ্য তারা এখনো প্রকাশ করে না।
সুইস ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশিদের রাখা অর্থের হিসেব পাওয়া যায় ২০০৪ সাল থেকে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সুইস ব্যাংকের রমরমা অবস্থা যতই কমে যাক, বাংলাদেশিরা সেখানে অর্থ রাখা ক্রমশ বাড়িয়েছে। তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে এই ভয় সম্ভবত বাংলাদেশিদের নেই। ফলে অন্যান্য দেশের নাগরিকেরা সুইস ব্যাংক থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করলেও সেখানে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে।
যেমন, ২০০৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বর্তমান বাজার দর ৮৯ টাকা ধরলে বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ ৩৬৫ কোটি টাকা। আর সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ২০১৯ সালের। এখন সেখানে অর্থ আছে ৫ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১৫ বছরে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ বেড়েছে এক হাজার ৩৭০ গুণ।


সুইস ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখে যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা। এরপরেই আছে যুক্তরাষ্ট্র, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ফ্রান্স ও হংকং। বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫ তম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থান একমাত্র ভারতের, ৭৭ তম। এ ছাড়া পাকিস্তানের অবস্থান ৯৯ তম, নেপাল ১১৮ তম, শ্রীলঙ্কা ১৪৮ তম, মিয়ানমার ১৮৬ তম এবং ভুটান ১৯৬ তম।

ভারত বা অন্যরা কি করেছে
পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, ২০০৪ সালে সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখা দেশের তালিকায় ভারত ছিল ৩৭ তম। আর এখন তারা ৭৭ তম। ২০০৫ সালে ভারতের নাগরিকদের রাখা অর্থ ছিল ৫৩৫ কোটি সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি টাকায় যা ৪৭ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। আর সে সময়ে বাংলাদেশের ছিল ৯ কোটি ৭০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৮৬৩ কোটি টাকা। অথচ ২০১৯ সালে এসে সেই ভারত বাংলাদেশের প্রায় কাছে চলে এসেছে। এখন সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নাগরিকদের অর্থের পরিমাণ ৬০ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৩৩৭ কোট টাকা। আর ভারতীয়দের আছে ৯০ কোটি সুইস ফ্রাঁ বা ৮ হাজার ১০ কোটি টাকা।

বলে রাখা ভালো, সুইস ব্যাংকগুলোতে রাখা অর্থ সাদা না কালো তার কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। হয়তো বৈধ অর্থও আছে। তবে এর মধ্যে অবৈধ বা কালো টাকার পরিমাণ কত, তা অনেক দেশই এখন জানতে চাচ্ছে। এ জন্য সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বেশ কিছু দেশ বিশেষ একটি চুক্তিও করেছে। এর নাম স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় কাঠামো। ভারত ২০১৬ সালে এই চুক্তিটি করেছে এবং ২০১৯ সাল থেকে তথ্যও পেতে শুরু করেছে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সুইস ব্যাংকে কি পরিমাণ অর্থ রেখেছে তার বিস্তারিত তথ্য চাইলে ভারত তা পাবে। এতেই সুইস ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ফেলছে ভারতীয়রা।
অবশ্য সুইজারল্যান্ডের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বেশি বেড়েছে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর। এরপর ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘দ্য ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন করে। এই আইনে বলা আছে, কোনো মার্কিন নাগরিক অন্য দেশের কোনো ব্যাংকে অর্থ রাখলে চাইলে সে তথ্য তাদের দিতে হবে। আর তা না মানলে ওই ব্যাংককে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কারণে সুইজারল্যান্ডের ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফটিএ) এখন কর ফাঁকি রোধে বিভিন্ন দেশকে তথ্য দেওয়া শুরু করেছে। সব মিলিয়ে ৮০টি দেশের সঙ্গে তথ্য আদান প্রদানের চুক্তি করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য এই তালিকায় বাংলাদেশ নেই।

বাংলাদেশ কি করেনি
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ আছে এই আলোচনা অনেক পুরোনো। সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর তাঁর পাচার করা অর্থ উদ্ধার নিয়ে অনেক আলোচনাও হয়েছিল। ধারণা করা হয় সে সময় এরশাদের অর্থ সুইস ব্যাংকে রাখা ছিল। কিন্তু এর কোনো সুরাহা হয়নি।
তবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের কি পরিমাণ অর্থ আছে তা জানা যায় ২০০৪ সাল থেকে। এ নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু হয় ২০১৪ থেকে। সাধারণত জুনের শেষে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে দেশভিত্তিক আমানতের তথ্য প্রকাশ করা হয় বলে এ সময়টাতেই আলোচনা বেশি হয়।
২০১৪ সালের জুন মাসে সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখা নিয়ে লেখালেখি শুরু হলে ওই বছরের ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, তাঁর সরকার আমানতকারীদের তালিকা চেয়ে সুইজারল্যান্ড সরকারকে অনুরোধপত্র পাঠাবে। আর পাচার হওয়া অর্থ সুইস ব্যাংক থেকে ফেরত আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগের দিন, ২৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সম্প্রতি সুইস ব্যাংকে রাখা দেশের টাকা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আমরা ক্ষমতায় থাকলে সুইস ব্যাংকে কে কত টাকা রেখেছে, তা বের করব। শুধু বেরই করব না, দেশে ফিরিয়ে আনব। অতীতে যেমন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলের পাচার করা টাকা বিদেশ থেকে ফেরত এনেছি। সুইস ব্যাংকে রাখা টাকাও আমরা ফেরত আনব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাই তখন কিছু নড়াচড়াও শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তিন দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে সুইজারল্যান্ডের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) কাছে সে দেশের ব্যাংকগুলোতে রাখা বাংলাদেশিদের অর্থের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পাচারকৃত অর্থের আদান-প্রদান বিষয়ে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ওইটুকুই।
এর আগের বছরের (২০১৩) জুলাই মাসে বিএফআইইউ এগমন্ট গ্রুপের সদস্যপদ পেয়েছিল। এগমন্ট গ্রুপ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম, যারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করে। এগমন্ট গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন দেশের একই ধরনের সংস্থার কাছ থেকে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও বিদেশে পাচার করা অর্থের তথ্য পেতে পারে। এই সদস্যপদ পাওয়ার পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৪ জুলাই বেশ ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন করেছিল। তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচার করে কেউ আর সহজে পার পাবে না।’
এর পর থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য নিয়ে লেখালেখি হলেই মুখস্থ কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়। কিন্তু টাকা পাচারকারীর নাম বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য আর পাওয়া যায় না। আসলে জোরালো কোনো পদক্ষেপই বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত নেয়নি। ফলে নিশ্চিত করেই বলা যায়, পরের বছরগুলোতেও একই ধরনের বক্তব্য এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া যাবে।
টাকা পাচার বন্ধে কে কি বলেছেন

সময় কে বলেছেন কি বলেছেন
২০১৪ শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রী সুইস ব্যাংকে রাখা দেশের টাকা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আমরা ক্ষমতায় থাকলে সুইস ব্যাংকে কে কত টাকা রেখেছে, তা বের করব। শুধু বেরই করব না, দেশে ফিরিয়ে আনব
২০১৫ মাহফুজুর রহমান, মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক সুইজারল্যান্ডের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের মনোভাব হচ্ছে আইন সংশোধন ছাড়া তারা কিছু করতে পারবে না
২০১৬ নজিবুর রহমান, চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মুদ্রা পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ ঠেকাতে এনবিআর সক্রিয় আছে। এ জন্য গঠন করা বিশেষ সেল মুদ্রা পাচারসংক্রান্ত দেশি-বিদেশি প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করছে। সেই অনুযায়ী নিজেরা তদন্ত করে থাকে।
২০১৭ আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, ডেপুটি গভর্নর ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান সুইস ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমার যে পরিমাণ বলা হচ্ছে, তা পুরোটাই বাংলাদেশ থেকে গেছে বিষয়টি তেমন নয়। বাংলাদেশ থেকে কত অর্থ গেছে, সেই তথ্য পাওয়া গেলে অর্থ পাচার সম্পর্কে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। অর্থ পাচার রোধে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।
২০১৮ আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সুইস ব্যাংকের কাছে তথ্য জানতে হলে ব্যক্তির পুরো পরিচয় ধরে তথ্য চাইতে হয়। এ জন্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভারত কী প্রক্রিয়ায় সুইজারল্যান্ড থেকে তথ্য নিয়েছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।
২০১৯ আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান জমা হওয়া অর্থের পুরোটাই যে অবৈধ বা পাচার হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না। দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে কারা অর্থ জমা করেছে, আমরা নানাভাবে সেই তথ্য জানার চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।
২০২০ ইকবাল মাহমুদ, চেয়ারম্যান, দুদক আমরা গত বছরই বাংলাদেশ ব্যাংককে পত্র দিয়েছিলাম সুইস ব্যাংকের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের সমঝোতা করার জন্য। আমি আমার অফিসকে বলেছি, ‘একটা রিমাইন্ডার দেন যে কী করল তারা’
২০২০ আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বাণিজ্যের আড়ালেও এ দেশ থেকে কিছু অর্থ পাচার হয়ে থাকতে পারে। আমরা চেষ্টা করছি ভারতের মতো করে দেশটি থেকে তথ্য সংগ্রহের। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকও করেছি। কিন্তু করোনার কারণে সবকিছু থেমে গেছে।’

সূত্র: প্রথম আলো ও বিবিসি

টাকা পাচারের আরও তথ্য
মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোন দেশ থেকে কত অর্থ পাচার হয়ে থাকে তার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই)। এ ক্ষেত্রেও ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশের তথ্য পাওয়া যায়। অন্য সব দেশের অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত। কিন্তু বাংলাদেশের সর্বশেষ তথ্য ২০১৫ সালর। কেননা, পরের দুই বছররে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তথ্য জাতিসংঘকে বাংলাদেশ দেয়নি। তথ্য গোপন রাখার কারণ অবশ্য জানা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে খোঁজ নিয়েও সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
জিএফআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়। বর্তমান বাজারদরে (৮৫ টাকায় প্রতি ডলার) এর পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। মূলত ২০০৮ সালের পর থেকে এই পদ্ধতিতে অর্থ পাচার বেড়েছে। আর গড় অর্থ পাচারের হিসাবে ১৩৫টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৩ তম।


টাকা পাচার নিয়ে জিএফআই-এর প্রতিবেদন প্রকাশ ও সুইস ব্যাংকের তথ্য প্রকাশের মধ্যে একটি মিল অবশ্য আছে। কেননা, এ নিয়েও খানিকটা হইচই হয়, ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, দুদক থেকেও কঠোর হওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো কিছুই হয় না। যেমন, জিএফআই-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২০১৬ সালে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘কর এড়িয়ে টাকা পাচারকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেবে না এনবিআর। টাকা পাচারকারীদের ধরতে একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে’।
আবার ২০১৯ সালে বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘জিএফআই যে তথ্য দিয়েছে, তার সবই বাণিজ্য-সম্পর্কিত। এসব বিষয় ব্যাংক ও এনবিআরও দেখভাল করে। পুরো প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেই এ নিয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।’ একই ভাবে ২০২০ সালের মার্চে আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান প্রথম আলোকে আবার বলেন, ‘আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে আমরা একটি নীতিমালা করেছি। ব্যাংকগুলোকে তা মেনে চলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
কেন পাচার হয়, কে পাচার করে
আমদানি-রপ্তানির আড়াল ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের বড় মাধ্যম হুন্ডি। বরং এই পথেই অর্থ পাচারের পরিমাণ অনেক বেশি। মাদক ও মানব পাচার সহ সব ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের বড় মাধ্যম হুন্ডি। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, সুশাসনের অভাবেই মূলত একটি দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। দেশের রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ীদের অনেকেরই ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। এ কারণেও অর্থ অন্য দেশে চলে যায়। কানাডার ‘বেগম পাড়া’ এর বড় উদাহরণ। এ ছাড়া, দেশে বিনিয়োগের ভালো ক্ষেত্র বা আস্থা না থাকলেও অর্থ অন্য দেশে নিয়ে যায় অনেকে।
একটা প্রশ্ন প্রায়ই উত্থাপন করেন অর্থনীতিবিদেরা। আর তা হলো নির্বাচনের সঙ্গে টাকা পাচারের সম্পর্ক। আফ্রিকার ওপর এ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এরিকা ফ্রান্টজ। ‘ইলেকশন অ্যান্ড ক্যাপিটাল ফ্লাইট: এভিডেন্স ফ্রম আফ্রিকা’ নামের এই গবেষণাটি আফ্রিকার ৩৬টি দেশের ওপর করা। ১৯৭১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এরিকা ফ্রান্টজ দেখান যে, নির্বাচনী চক্রের (ইলেকশন সাইকেল) সঙ্গে পুঁজি পাচারের একটি যোগসূত্র রয়েছে। নির্বাচনের আগেই অর্থ পাচার বেশি হয়ে থাকে।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এগিয়ে আসলে অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়। তখন অর্থ পাচারও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে। যেমন, ২০০৬ ও ২০০৭ সালের প্রবল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা রাখার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। তবে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ায় ২০০৮ সালে অর্থ পাচার কমে যায়। আবার ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা থাকায় এর ঠিক আগে টাকা পাচার আবার বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে দেশের মধ্যে যদি বিনিয়োগ পরিবেশ ও আইনের শাসন না থাকে, যদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা থাকে এবং নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, তখনই অর্থ পাচার বাড়ে বলেই মনে করা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে অর্থ পাচার কমাতে সরকারের কি কার্যকর উদ্যোগ আছে। সংশ্লিষ্টদের কিছু রুটিন বক্তব্য ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কিছুই আসলে নেই। বড় প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কি আসলেই অর্থ পাচার বন্ধ করতে চায়। সুইস ব্যাংকের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যেতে না পারা কি কেবলই দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব, নাকি রাজনৈতিক নির্দেশনার অভাব। কার না কার নাম বের হয়ে আসে, সেই ঝুঁকিও তো আছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অর্থ পাচার রোধে যে আইন ও প্রতিষ্ঠানের দরকার, তা বাংলাদেশের ঘাটতি আছে বলে মনে করি না। যা নেই তা হচ্ছে রাজনৈতিক উৎসাহ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা কার্যকর করতে রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক কোনো পদক্ষেপ নেই। আর দুদক প্রকাশ্যে যতই সঠিক কথা বলুক না কেন, প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ রকম একটি উদাহরণ নেই। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সেটা যে রাজনৈতিকভাবে উপকারী, সেই অনুধাবন না আসা পর্যন্ত কোনো কাজও হবে না। আর সামাজিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহির জায়গা শক্তিশালী না হলে এ অনুধাবন আসবে না

সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নতির জন্য গত ১০ বছরে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ, বিকাশমান মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী, প্রবাসী শ্রমিক, কৃষকসহ সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসছেন। আর সেই সময় আমাদের উচ্চবর্গের এক দল মানুষ ঠিকমতো কর দেয়নি, শেয়ারবাজার থেকে লুটপাট করেছে, পুঁজি পাচার করেছে, অতিমূল্যায়িত প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। সাধারণ মানুষেরা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে পরিশ্রম করেছে আর সেই আস্থা ও বিশ্বাস নেই বলে উচ্চবর্গের মানুষেরা অর্থ অন্য দেশে নিয়ে গেছে। আর রাজনীতি তাদেরই রক্ষা করছে। সুতরাং রাজনীতির উচ্চারণ ও আচরণের মধ্যে পার্থক্য থাকলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

তাহলে জনপ্রিয় ব্রিটিশ লেখক জেফরি আর্চারের ‘ক্লিন সুইপ ইগনেশিয়াস’ গল্পটা এখানে বলা যায়। জেফরি আর্চারের পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন, কনজারভেটিভ পার্টির ডেপুটি চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। গল্পটা এ রকম-ইগনেশিয়াস আগারবি নাইজেরিয়ার ১৭ তম অর্থমন্ত্রী হওয়ার সময় কেউ খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু দ্রুতই তিনি সবার মনোযোগ কেড়ে নিলেন। ঘুষ, দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন ইগনেশিয়াস। কেবল কথা না, কাজও শুরু করলেন তিনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে দুর্নীতির দায়ে জেলে পুরলেন, ঘুষ নেওয়ার দায়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক গ্রেপ্তার হলেন। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল ইগনেশিয়াসের। দুর্নীতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করছেন বলে নাম হয়ে গেল ‘ঝাড়ু ইগনেশিয়াস’।
খুশি হয়ে রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল ওটোবি একদিন ইগনেশিয়াসকে ডেকে পাঠালেন। খুব বাহবা দিলেন, সব ধরনের সমর্থনের আশ্বাসও দিলেন। আর উপহার হিসেবে দিলেন একটি পিস্তল, যাতে ইগনেশিয়াস শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পায়।
ইগনেশিয়াসের এবার লক্ষ্য সুইস ব্যাংকের টাকা পাচারকারীরা। যুদ্ধ ঘোষণা করলেন সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। তারপর একদিন চলেও গেলেন জেনেভায়। বড় একটি সুইস ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে জীর্ণ একটা ব্রিফকেস হাতে ইগনেশিয়াস এক সকালে হাজিরও হলেন সেখানে। দ্রুতই কাজের কথায় এলেন। চাইলেন তাঁর দেশের নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের সব তথ্য। এ জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের দেওয়া অনুমোদনের চিঠিও দেখালেন। কিন্তু ব্যাংক চেয়ারম্যান তথ্য দিতে রাজি হলেন না। নাছোড়বান্দা ইগনেশিয়াস নানা ধরনের লোভ দেখালেন, ব্যবসা বাড়ানোর কথা বললেন। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। মক্কেলের তথ্য কোনো অবস্থাতেই সুইস ব্যাংকটির চেয়ারম্যান দিতে রাজি নন। এরপর ইগনেশিয়াস ভয় দেখাতে শুরু করলেন। সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসা বন্ধসহ সুইজারল্যান্ডের দূতাবাসে তালা দেওয়ার হুমকিও দিলেন। তাতেও কাজ হলো না। গোপনীয়তা রক্ষার নীতিতে অটল তিনি। এবার শেষ অস্ত্র ব্যবহার করলেন ইগনেশিয়াস। পকেট থেকে উপহার পাওয়া পিস্তলটা বের করে চেয়ারম্যানের কপালে চেপে ধরলেন। ভীষণ ভয় পেলেও আগের সিদ্ধান্তেই অনড় ব্যাংক চেয়ারম্যান।
গল্পের শেষটা এ রকম-‘দুর্দান্ত!’ চেয়ারম্যানের কপাল থেকে পিস্তল সরিয়ে নিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতে বসতে বলেন ইগনেশিয়াস। জীর্ণ ব্রিফকেসটা তুলে নিলেন। ব্রিফকেসের ভেতরে এক শ ডলারের নোট থরে থরে সাজানো। পাঁচ মিলিয়ন ডলারের কম হবে না।
‘আমি ভাবছি, ’ ইগনেশিয়াস বলেন, ‘আপনাদের ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট খুললে কেমন হয়।’

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Comments

  1. Anonymous

    খুব দরকারী একটা লেখা। উন্নয়ন অর্থনীতির ছাত্রদের খুব কাজে লাগবে। এখান থেকে রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা কিছুটা শিখলে জাতির সামান্য মঙ্গল হতো। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.