খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ করার অন্য রকম এক ‘সাফল্য’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 3 minutes

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন দেশে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। আর ছয় বছর পরে সেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫৪ হাজার ৬৫৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ব্যাংকে টাকা রাখলে ছয় বছরে দ্বিগুণ হয়, এটা সবার জানা। কিন্তু খেলাপি ঋণও যে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায়, সে কথা আর কতজন জানেন।
এর বাইরে আরেকটা গোপন হিসাব আছে। এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো নিজেদের হিসাবের খাতা পরিষ্কার রাখতে ৩৬ হাজার ৯৭০ কোটি ৫৪ লাখ রাইট-অফ বা অবলোপন করেছে। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ আর খেলাপি ঋণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে না। এর মধ্যে কেবল ২০১১ সাল পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ৮৪৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সুতরাং এই অর্থ যোগ করলে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এই অর্থ দিয়ে দুটো পদ্মা সেতু বানানোর পরও মেট্রোরেলেরও অনেকখানি তৈরি করা যেত।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত শনিবার জাতীয় সংসদে খেলাপি ঋণের একটি হিসাব দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট। কর্মসূচির মধ্যে আছে অর্থঋণ ও দেউলিয়া আইন প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মানের ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালা তৈরি, খেলাপি ঋণ পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংকে টাস্কফোর্স গঠন, সভা করে পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক এবং বার্ষিক পারফরম্যান্স চুক্তি সই। এসব কর্মসূচির সবগুলোই পুরোনো এবং গতানুগতিক। এ দিয়ে অতীতে খেলাপি ঋণ আদায়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন খেলাপি ঋণের হার ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের সাড়ে ১০ টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে এবং এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে অর্থমন্ত্রীর জন্য কয়েকটি অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান বলা যেতে পারে। যেমন, বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকে প্রায় ২৯ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকে সাড়ে ১৯ শতাংশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ৪৩ শতাংশ, কৃষি ব্যাংকে ৩৩ শতাংশ এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৪ শতাংশ। সবগুলো ব্যাংকই রাষ্ট্রমালিকানাধীন। এগুলো পরিচালনা করে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের অংশ হলেও এসব ব্যাংকের ওপর তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ তাদের নেই। বরং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের। আর বন্ধ করে দেওয়া এই বিভাগটি অর্থমন্ত্রীই নতুন করে চালু করেছিলেন। ফলে দায়দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, অন্য সময়ের তুলনায় এবার খেলাপি ঋণ এতটা বাড়ার কারণ ভিন্ন। কয়েকটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে বেসিক ও সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এতটা বেড়েছে। এর মধ্যে হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনার জন্য এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ জেলে থাকলেও আত্মসাৎ করা প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা কোথায় গেল তা বের করার চেষ্টাই করেনি সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ ব্যাংক হিসাব ধরে তা বের করা সম্ভব ছিল। আবার বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির জন্য ব্যাংকটির সে সময়ের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে দায়ী করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। জাতীয় সংসদে তাঁর নাম ধরে আলোচনা হলেও প্রভাবশালী এই ব্যক্তিটি বহাল তবিয়তে আছেন। তাঁর খুঁটির জোর অনেক।
‘বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করাটা এখন একরকম সর্বজনীন অভ্যাস। বড় বড় ব্যবসায়ী, সফল শিল্পপতি বা গ্রামীণ মাতবর কেউই ঋণ পরিশোধ করে না। তার ফলে উদ্যোগী লোকেরা বা গরিব চাষিরা কোনো ঋণ পায় না, সুস্থ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে পারে না। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিরা গোষ্ঠী হিসেবে সরকারের সহযোগী, তাই এদের মর্জিই হলো সরকারের প্রচেষ্টা। বিশেষ গোষ্ঠীকে নিজের দলে রাখতে গেলে স্বভাবতই দেশের বা জনতার স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়।’—এ কথাগুলো আমাদের অর্থমন্ত্রীর। পার্থক্য হলো, তিনি এটা লিখেছিলেন ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তাঁর বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও জাতীয় ঐকমত্য শিরোনামের বইতে।
ছয় বছরে খেলাপি ঋণ যে দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেল এই অর্থ তো সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা। আমানতের টাকা আত্মসাৎ করায় সরকারকে এখন নতুন করে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে নতুন মূলধন দিতে হচ্ছে। এ টাকাও তো সাধারণ মানুষেরই করের টাকা। সুতরাং ওই কথাটিই ঠিক, ‘বিশেষ গোষ্ঠীকে নিজের দলে রাখতে গেলে স্বভাবতই দেশের বা জনতার স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়।’ বর্তমান সরকার ও অর্থমন্ত্রী সেটাই করছেন।
দেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৫৬টি। এই সরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ২০১৩ সালে নতুন নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে। এর চারটি ব্যাংকে এরই মধ্যে খেলাপি ঋণ ঢুকে পড়েছে। পরিমাণে কম হলেও তথ্যটি উদ্বেগজনক। এর দায় নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককেই। প্রভাবশালীরাই এসব ব্যাংকের মালিক। যেমন ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর সাবেক আইনজীবী এম মনিরুজ্জামান খোন্দকার ও ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা কাজী জাফরুল্লার স্ত্রী ও সাংসদ নিলুফার জফরুল্লাহ এবং এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের প্রবাসী নেতা ফরাসত আলী।
সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ এখন আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের, সাড়ে ৭৭ শতাংশ। এর দায়ও সরকারকেই নিতে হবে। এই ব্যাংকটির নাম প্রথমে ছিল আল-বারাকা ব্যাংক। নব্বইয়ের দশকে লুৎফর রহমান সরকার যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তখন তিনি আল-বারাকা ব্যাংককে আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করা যায়নি। তখন করা সম্ভব হলে আজ ব্যাংকটির এই দশা হতো না। অথচ সারা বিশ্বেই একীভূতকরণ একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। সরকারি ও বেসরকারি খাতে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক কয়টা সরকারের হাতে থাকবে তাও ঠিক করতে হবে। সরকারের হাতেও যে ব্যাংক ভালো চলে একসময়ে তার উদাহরণ ছিল বেসিক ব্যাংক, ২০০৮ সাল পর্যন্ত। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকটিতে পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে বেসিক ব্যাংক ধ্বংসের মুখে চলে গেছে। এখন দুই হাজার কোটি টাকার মূলধন দিতে হবে ব্যাংকটিকে। এর চেয়ে বরং বেসিক ব্যাংক অন্য আরেকটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা যায় কিনা তাও ভেবে দেখার সময় এসেছে।
ব্যাংক খাত নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনার কথা কি সরকার বা অর্থমন্ত্রী ভাববেন? নাকি ২০২১ সালে এই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘রূপকল্প’ বাস্তবায়নের সময় খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে?

২৯ জুন, ২০১৫

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.