কোন পক্ষে যাবে?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 3 minutes

কোন পক্ষে যে যাই……..

দ্রৌপদীর ছিল পাঁচ পক্ষ। কিন্তু কবি বলেছেন আমাদের সামনে দুই পক্ষ।

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো- কোন পক্ষে যাবে?
প্রকৃতির ভেতরে তাকাও, দ্যাখো আলো এবং অন্ধকার দুটি পক্ষ
নিসর্গের ভেতরে তাকাও, দ্যাখো পানি এবং মাটি দুটি পক্ষ
পৃথিবীর ভেতরে তাকাও, দ্যাখো শোষিত এবং শোষক দুটি পক্ষ
মানুষের ভেতরে তাকাও, দ্যাখো গরীব এবং বুর্জুয়া দুটি পক্ষ
এদেশের ভেতরে তাকাও, দ্যাখো পঁচাশি এবং পনেরো দুটি পক্ষ
দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো- কোন পক্ষে যাবে?

এটাকে ডিলেমা বা উভয়সঙ্কট ঘরানার কবিতা বলা যাবে কিনা বুঝছি না। বরং নিচের লাইনটিকে তা বলা যায়।

‘এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে,- জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা’

ডিলেমার সঠিক ভালো বাংলা আসলে কি হবে? আপনার সামনে দুটো বিকল্প। দুটোই খারাপ। কিন্তু আপনাকে বেছে নিতে হবে এক পক্ষকে। এটাই আসলে ডিলেমা।উভয়সঙ্কটই ঠিক আছে বলে মনে হয়।

উভয়সঙ্কটের সেই গল্পটা জানেন তো?
বুশ আমলের গল্প। ট্রাম্পকে ধরেও চালানো যায়।
মনে করুন আপনি আছেন আমেরিকায়। আপনি একজন প্রেস ফটোগ্রাফার। আপনি আছেন মায়ামি বিচে। হাঁটছেন। গেলেন সমুদ্রের কাছে, হাওয়া খেতে। হঠাৎ দেখলেন একটা লোক সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। সমুদ্র তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আপনার মনে হল, লোকটিকে বাঁচাতে হবে। আপনি ছুটে গেলেন। কিছুটা কাছে গিয়ে দেখলেন লোকটি আর কেউ নন, প্রেসিডেন্ট বুশ। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি।
এবার আপনি রিয়েল ডিলেমায় পড়লেন। বুশকে বাঁচাবেন না কি ক্ষমতাধর ব্যক্তির ডুবে মরার ছবি তুলে পুলিৎজার পুরস্কারটি ঘরে তুলবেন?
আরও ডিলেমা আছে? বুশকে বাঁচাবেন না কি সারা বিশ্বকে বাঁচিয়ে রাখবেন?
তবে দুষ্ট লোকেরা কিন্তু আপনাকে অন্য একটি প্রশ্ন করবে। আসল ডিলেমা নাকি এখানেই।
প্রশ্নটি হল, ছবিটা কি কালারে তুলবেন না কি ক্ল্যাসিক সাদা-কালোয়?
(এই গল্পটাকে অনায়াসে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আনা যেতো। কিন্তু হেফাজতের ভয়ে হাত পা….)
বাস্তব ডিলেমার কথা বলি।
সত্যিকার ডিলেমায় পড়েছিলেন কেভিন কার্টার। দক্ষিণ আফ্রিকার নামী ফটো সাংবাদিক। বর্ণ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক। তিনি ছবি তুলতে গিয়েছিলেন সুদানের দুর্ভিক্ষের, ১৯৯৩ সালের মার্চে। শিশুটি প্রাণপণ চেষ্টা করছিল কাছের ফিডিং সেন্টারে যেতে। আবার পাশেই অপেক্ষা করছিল একটি শকুন। সেই ছবিটি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ছাপা হয় ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ। ১৯৯৪ সালে তিনি ছবিটার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পান।

কিন্তু বিপত্তি ঘটে ছবিটি ছাপা হওয়ার পর। অসংখ্য ফোন আসতে থাকে পত্রিকা অফিসে, সবাই জানতে চান শিশুটি কি ফিডিং সেন্টারে যেতে পেরেছিল? এর উত্তর দেওয়া যায়নি। তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। কেভিন কার্টারের উচিত কি ছিল? পুরস্কার পাওয়ার ছবি তোলা না কি শিশুটিকে বাঁচানো।

এই বিতর্ক থেকে মুক্তি পাননি কেভিন কার্টার। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুলাই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন কেভিন কার্টার।
সুতরাং এই ডিলেমা নিয়ে সব সময় থাকতে হয় সাংবাদিকদের। যেমন বিশ্বজিৎ হত্যার সময়েও এই বিতর্ক উঠেছিল।
এই ডিলেমা সংবাদপত্রের জন্য এখনো আছে। গণমাধ্যম কি যা ঘটছে তাই লিখবে না কি কোনো এক পক্ষ নেবে? পত্রিকার কাজ কি পক্ষে যাওয়া না কি নিরপেক্ষ থাকা?
পাল্টা প্রশ্নও করা যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুক্ত শুরু হওয়ার পর কি পত্রিকা নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করতে হতো?

ভারী ভারী কথা থাক। ডিলেমা নিয়ে আরেকটা গল্প বলি।
এবারও আপনি। ধরুন, আপনি লং ড্রাইভে বের হয়েছেন। হঠাৎ ঝড়। এক বাস স্টেশনের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো বাস নেই। দেখলেন তিনজন দাঁড়িয়ে সেখানে।
একজন বৃদ্ধা, মরণাপন্ন, এখনই হাসপাতালে না নিলে মারা যাবেন।
একজন পুরোনো বন্ধু। এক সময় সে আপনার জীবন বাঁচিয়েছিল।
আরেক জন, খুব সুন্দর একটা মেয়ে। দেখেই মনে হলো আপনি যাকে খুঁজছিলেন এই মেয়েটি সেই।
আপনি কেবল একজনকে গাড়িতে তুলতে পারবেন। এখন আপনি কি করবেন?
উত্তরটা এভাবে হতে পারে-
আপনি গাড়ি থেকে নেমে পুরোনো বন্ধুকে চাবি দিয়ে বলবেন বৃদ্ধাকে কোনো একটা হাসপাতালে পৌঁছে দিতে। তারপর থাকবেন কেবল আপনি আর সেই মেয়েটি।

ডিলেমা নিয়ে হিচককের একটা মুভির কথা খুব মনে পড়ছে। ছবিটার নাম আই কনফেস। ১৯৫৪ সালের এই মুভিটিতে অসাধারণ অভিনয় করেছেন মন্টোগোমারি ক্লিফট। তিনি একটি ক্যাথলিক চার্চের প্রিস্ট। চার্চের কেয়ারটেকার একরাতে তাঁর কাছে এসে কনফেস করে। সে খুন করে এসেছে। এই কথাই জানায় কেয়ারটেকার। ঘটনা ঘটে এর পর। খুনের সূত্র খুঁজতে গিয়ে পুলিশের ধারণা হয় খুনটি করেছেন ফাদার নিজেই।

ফাদারের একটাই ডিলেমা, কি করবেন তিনি। কনফেস কেউ করলে বলতে হয় না। আবার না বললে সে নিজেই ফাঁসবেন। অসাধারণ এক মুভি।
তবে ডিলেমার সেরা গল্পটা কিন্তু এখনো বলা হয়নি। এটা বড়দের গল্প।
আপনি একটি বিশাল বিছানায় শুয়ে আছেন, জন্মদিনের ড্রেসে। আপনার ডান দিকে শুয়ে আছে অপরূপ সুন্দরী এক মেয়ে, সেও জন্মদিনের ড্রেসে। আর আপনার বায়ে জন্মদিনের ড্রেসে শুয়ে আছে এক পুরুষ, পুরুষটি গে। সেও প্রস্তুত।
এখন আপনার ডিলেমা হচ্ছে, কার দিকে ফিরবেন, আর কাকেই বা পেছনে রাখবেন?

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.