অর্থনীতির কোন অর্জনটি বড়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Reading Time: 5 minutes

১৯৭১ সালের ১৮ নভেম্বর। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ২৬তম সাধারণ অধিবেশনে ঠিক হলো, অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোকে আলাদা শ্রেণিভুক্ত করতে হবে। উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া, যাতে দেশগুলো সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি নামে ২৪টি দেশকে তালিকাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ তখনো স্বাধীন হয়নি। স্বাধীন হওয়ার পরও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে তখন অনেকেরই সংশয়। সেই বাংলাদেশ এলডিসিভুক্ত হয় ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে। সেই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পেল ২০২১ সালে, ৪৫ বছর পরে। তবে এখনো বাংলাদেশকেই এলডিসি বলতে হবে। ২০২৬ সালের পর বলা যাবে বাংলাদেশ আর স্বল্পোন্নত দেশ নয়।

বাংলাদেশের আরও একটি বড় অর্জন আছে। আর সেটি হচ্ছে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের তালিকায় স্বল্প আয়ের দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট। বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার নিয়ম হচ্ছে প্রথমে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সদস্য হতে হবে। তবেই বিশ্বব্যাংক সদস্য হওয়ার আবেদন বিবেচনা করে। বাংলাদেশ নিয়ম মেনেই সদস্য হয়েছিল। সেই বাংলাদেশকেও বিশ্বব্যাংকের তালিকায় এক ধাপ উত্তরণে ৪৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

নানা গ্রুপ, নানা দেশ

বিশ্বব্যাপী দেশ আছে অনেক, গ্রুপও কম নেই। কেউ উন্নত দেশ, কেউ অনুন্নত। আবার তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলেও এক গ্রুপের কথা অনেক বছর ধরেই চালু আছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যারা পুঁজিবাদের মার্কিন বলয় বা সমাজতন্ত্রের সোভিয়েত বলয়ের মধ্যে ছিল না, তাদেরই বলা হতো তৃতীয় বিশ্ব।

বাংলাদেশ শুরু থেকেই উন্নয়নশীল দেশ। তবে উন্নয়নশীল দেশ কারা, এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলেও একটি দেশ কীভাবে এলডিসি থেকে বের হয়ে যবে, তা বলা আছে। সাধারণভাবে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশ তারাই, যাদের শিল্প খাতের ভিত্তি কম উন্নত এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও পিছিয়ে আছে। আবার উন্নয়নশীল দেশের মধ্যেও কয়েকটি উপবিভাগ আছে। যেমন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), স্থলবেষ্টিত দেশগুলো নিয়ে ল্যান্ডলকড ডেভেলপিং কান্ট্রিজ (এলএলডিসি), ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো নিয়ে আছে স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটস (এসআইডিএস)। এর উল্টো দিকে আছে উচ্চ আয়ের দেশ বা উন্নত দেশ।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা আছে। এর মধ্যে কোনো কোনো সংস্থা নিজেদের কাজের সুবিধার জন্যই বিশ্বের দেশগুলোকে নানা গ্রুপভুক্ত করে। যেমন জাতিসংঘ প্রতিবছর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টাস নামের একটি বড় রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে দেশগুলোকে ভাগ করা হয় এভাবে—উন্নত অর্থনীতি, রূপান্তরিত অর্থনীতি, উন্নয়নশীল অর্থনীতি, জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ, স্বল্পোন্নত দেশ, বড় ধরনের ঋণভারে জর্জরিত দরিদ্র দেশ, ক্ষুদ্র দ্বীপভিত্তিক উন্নয়নশীল দেশ এবং স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ।

আজকাল অবশ্য অনেকেই বলেন, উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত—এই ধারণা অনেক পুরোনো। শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই উন্নত দেশ বলা হয়। আর উন্নত দেশের বিপরীত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল না বলে এর পরিবর্তে কেউ কেউ ভিন্নভাবে বলে থাকেন, গ্লোবাল সাউথ।

বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি আবার আলাদা। উন্নয়ন সহযোগী বা দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক মূলত ঋণ প্রদানের সুবিধার জন্য সদস্যদেশগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করে। যেমন নিম্ন আয়ের দেশ, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ, উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং উচ্চ আয়ের দেশ। কোন দেশকে কী ধরনের ঋণসহায়তা দেওয়া হবে, সেটা নির্ধারণ করতেই এই ভাগ। বর্তমানে নিম্ন আয়ের দেশ তারাই, যাদের অ্যাটলাস পদ্ধতিতে (তিন বছরের গড়) মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩৫ ডলার বা এর চেয়ে কম। আর নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় হতে হবে ১ হাজার ৩৬ থেকে ৪ হাজার ৪৫ ডলার। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয় হতে হয় ৪ হাজার ৪৬ থেকে ১২ হাজার ৫৩৫ ডলার। এর চেয়ে বেশি মাথাপিছু আয় হলেই সেসব দেশ উচ্চ আয়ের দেশ।

বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতির কিছু দুর্বলতা আছে। কেননা, কেবল মাথাপিছু আয় দিয়ে একটি দেশের প্রকৃত চিত্র বুঝতে পারা যায় না, সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্রটি জানতে পারা যায় না। এমন অনেক দেশ আছে, যাদের মাথাপিছু আয় বেশি, কিন্তু সামাজিক সূচকে অনেক পিছিয়ে। সুতরাং পদ্ধতি হিসেবে এলডিসি উত্তরণের নিয়মটি তুলনামূলকভাবে ভালো।

এলডিসি থেকে উত্তরণ

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসোক) উন্নয়ন নীতিমালাবিষয়ক কমিটি (কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি—সিডিপি) তিন বছর পরপর এলডিসির তালিকা তৈরি করে। এই তালিকা করা হয় তিনটি সূচকের ভিত্তিতে। এই কমিটি সুপারিশ করলে একটি দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। সূচক তিনটি হচ্ছে: তিন বছরের গড় মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই); পুষ্টি, স্বাস্থ্য, স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষার হারের সমন্বয়ে তৈরি মানবসম্পদ সূচক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আঘাত, জনসংখ্যার পরিমাণ এবং বিশ্ববাজার থেকে একটি দেশের দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য এই তিন সূচকের যেকোনো দুটি সূচক অর্জন করতে হয়। তবে শুধু আয়ের ভিত্তিতে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হতে হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণে আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করে। তিন বছর পর ২০২১ সালে বাংলাদেশ সুপারিশ অর্জন করে। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ নির্ধারিত মান অর্জন করেছে। আগের নিয়ম মানলে ২০২৪ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে দুই বছর বাড়তি সময় চেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে এলডিসি থেকে বের হবে মূলত ২০২৬ সালে।

সুতরাং ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এলডিসিই থেকে যাচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হয়ে গেছে, এ কথা বলা যাবে না। আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশ কোন গ্রুপে যাবে। আসলে বাংলাদেশ তখনো উন্নয়নশীল দেশে থাকবে, যেমনটি আগে থেকেই ছিল। কেবল অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ এত দিন উন্নয়নশীল দেশেরই একটি উপবিভাগে ছিল, সেখানে আর বাংলাদেশের নাম থাকবে না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এলডিসি থেকে বের হতে কিন্তু ঠিক ৫০ বছরই লেগে যাচ্ছে।

কোন অর্জনটি বড়

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়েই অনেকের সংশয় ছিল। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পরিচয় ছিল ‘বাস্কেট কেস’ বা তলাবিহীন ঝুড়ি। পুরো সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য ছিল দাতাদেশ ও সংস্থার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া। প্রতিবছর নিয়ম করে প্যারিসে দাতাগোষ্ঠীর সভা হতো। সেই সভায় দলবল নিয়ে হাত পাততে যেতে হতো দেশের অর্থমন্ত্রীকে। এর আগে চেয়ে কত বেশি সাহায্য পাওয়া যায়, সেটাই ছিল বড় লক্ষ্য। নব্বইয়ের দশকে একটু একটু করে আগাতে থাকে বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশক পার হওয়ার পর বাংলাদেশ সাহায্য পাওয়ার পরিবর্তে বাণিজ্যসুবিধা চাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশের বাণিজ্যনির্ভর হতে পারা একটি বড় অর্জন। আর এর বড় কৃতিত্ব পোশাক খাতের। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। আবার বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় চাল উৎপাদক। এটাও একটি বড় অর্জন, কেননা, এই বাংলাদেশকেই দুর্ভিক্ষ দেখতে হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স অর্জনকারী দেশ হলেও তা খুব গৌরবের বলা যাবে না। দেশের ভেতর পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই বলেই জনশক্তি রপ্তানি করতে হয় বাংলাদেশকে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কৃষি ও অকৃষি পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য আছে।

২০১৫ সালে যখন বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়, তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এলডিসি থেকে উত্তরণে মনোযোগী হওয়া। কেননা, বিশ্বব্যাংকের শর্ত কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। অথচ কেবল আয় বৃদ্ধি উন্নয়ন নয়। আর এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে আয় বৃদ্ধি ছাড়াও মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতা রোধের বিষয়টি জড়িত। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে এর পরের চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। এলডিসি হিসেবে পাওয়া অনেক ধরনের বাণিজ্যসুবিধা আর পাওয়া যাবে না। এক পণ্যের ওপর নির্ভরতাও বিপদ ডেকে আনতে পারে। পেটেন্ট-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধান থেকে দেশের ওষুধশিল্প আর অব্যাহতি পাবে না। এলডিসি হিসেবে সুবিধা পেয়েই বাংলাদেশ পোশাক ও ওষুধ খাতে ভালো করেছে। মেধাস্বত্বের সব ধরনের আন্তর্জাতিক নীতি পালন করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নেও প্রাধিকার থাকবে না। যদিও বাংলাদেশসহ অন্যরা এসব সুবিধা আরও ১২ বছর অব্যাহত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।

মর্যাদা দিয়ে কী হবে

এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নের একধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এতে দেশের মর্যাদা বেড়েছে। বাংলাদেশ যখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়, তখনো এই মর্যাদা বাড়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, মর্যাদা বাড়লে কী হয়। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে ক্রেডিট রেটিং বাড়বে, তাতে এখনকার চেয়ে কম সুদে ঋণ পাওয়া যেতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী। বিশ্বের যত দেশ আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে মধ্যম আয়ের দেশ ও উন্নয়নশীল দেশ। মধ্যম আয়ের ফাঁদ বা মিডল ইনকাম ট্র্যাপ বলে একটা কথা আছে। বিশ্বের মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বেশির ভাগই ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় রয়ে গেছে। তারা উচ্চ আয়ের দেশ হতে পারছে না। এ তালিকায় আছে রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ। সুতরাং কেবল মর্যাদা দিয়ে কাজ হবে না। পরের ধাপে যাওয়ার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। এ জন্য বড় ধরনের প্রস্তুতিও নিতে হবে। নইলে ফাঁদেই পড়ে থাকতে হবে।

তাহলে কি বাংলাদেশ উন্নত দেশ হতে পারবে না? বাংলাদেশের লক্ষ্য কিন্তু ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়া।তবে উন্নত হতে দেশ বলতে ঠিক কী হতে চায় বাংলাদেশ, তা পরিষ্কার না। অবশ্য উন্নত দেশের একটি ভালো সংজ্ঞা দিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। তিনি বলেছিলেন, উন্নত দেশ সেই দেশ, যারা তাদের দেশের নাগরিকদের একটি নিরাপদ পরিবেশের মধ্যে মুক্ত ও সুস্থ জীবনযাপন উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। এই সংজ্ঞা মেনে উন্নত হতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারলে সেটাই হবে বড় অর্জন।

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২১

রেটিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.