বিপ্লবের ভেতর-বাহির ৩: ফজলু–মিনুর প্রেম পর্ব

148

বিপ্লবের ভেতর-বাহির: ৩

সকলেই জানি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাম দলগুলোর ভূমিকা ছিল খুবই জটিল ও বিভ্রান্তিকর। মস্কোপন্থীরা এই বিভ্রান্তি থেকে দূরে ছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু চীনপন্থীরা এই বিভ্রান্তি থেকে বের হতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে) যুদ্ধ শুরু হলে দুই ভাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে এক ভাগ মুক্তিযুদ্ধকে বলেছিল, ‘দুই কুকুরের লড়াই’। মূলত মতিন-আলাউদ্দিন ও আব্দুল হক-তোহায়ার নেতৃত্বের দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা করে। এর মধ্যে হক-তোহায়া পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছিল। এমনকি তারা পাক সেনাদের কাছে অস্ত্র পেয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছে। আবার সুখেন্দু দস্তিদার লাল ফৌজ বাহিনী গঠন করে পাক সেনা ও মুক্তিবাহিনী উভয়ের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করে। একই ধরনের কাজ করেছিল মতিন-আলাউদ্দিন গ্রুপ।

চীনপন্থীদের মধ্যে ব্যক্তিক্রমও ছিল। এর মধ্যে দেবেন সিকদার ও আবুল বাশার গ্রুপের কথা বলা যায়। এই গ্রুপের ওহিদুর রহমান আত্রাই এলাকায় অস্ত্র লুট করে এক বড় কৃষক গেরিলা বাহিনী গঠন করে যুদ্ধ করেছিলেন। শুরুতে এই দলটি খতম লাইনে থাকলেও পরে পাক সেনাদেরই মূল প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নেয়।

তবে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন সিরাজ সিকদার। শুরু থেকেই মূল শত্রু চিহ্নিত করতে সময় নেননি তিনি। তাঁর নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন ভিন্নমুখী এক রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের যুদ্ধ বিক্ষুব্ধ রণাঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ৩ জুন বরিশালের স্বরূপকাঠির পেয়ারাবগানে অনুষ্ঠিত এক গোপন সম্মেলনে সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন বিলুপ্ত করে গঠন করেছিলেন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। টাঙ্গাইল, বরিশাল, মাদারীপুর, গৌরনদী ও মঠবাড়িয়া অঞ্চলে এই দলটি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।

সেই সময়ে সিরাজ সিকদারের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ফজলু। ফজলুর প্রকৃত নাম ছিল সেলিম শাহ নেওয়াজ। বরিশালের কলেজছাত্র ছিলেন, বাড়ি বরিশালেরই কাকচিরা গ্রাম। ফজলু ছিলেন বরিশাল-খুলনা এরিয়ার কমান্ডার, সর্বহারা পার্টির নির্বাহী কমিটির ৭ নং সদস্য। দলের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন ফজলু।

১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসের পরপরই দলের মধ্যে নেতৃত্ব, রণকৌশল ইত্যাদি নিয়ে মতভেদ দেখা দেয় এবং উপদলের সৃষ্টি হয়। বলা হয়, পার্টিতে প্রথম উপদল সৃষ্টি করেন সাদেক, বেবী, আবুল হাসান ও শান্তিলাল। কিন্তু এই চক্রটি খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখতে পারেনি। দ্বিতীয় উপদলটি গঠন করেছিলেন এই ফজলু বা সেলিম শাহনেওয়াজ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সুলতান।

ফজলু-সুলতান ছিলেন প্রথম কংগ্রেসে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ‘পার্টির লাইন সঠিক, তবে সিরাজ সিকদার প্রতিক্রিয়াশীল’-এই ছিল তাদের স্লোগান। এই স্লোগান দিয়ে দলে আন্তঃপার্টি সংগ্রামের চেষ্টা চালান তারা। সিরাজ সিকদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেওয়া হয়। ফজলু-সুলতানকে অভিযুক্ত করা হয় খুলনা এলাকায় উপদল গঠন, পার্টি কর্মী হত্যা ও সিরাজ সিকদারকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার ষড়যন্ত্রে। ১৯৭২ এর এপ্রিলে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ফজলু (প্রকৃত নাম-সেলিম শাহনেওয়াজ), সুলতান (মাহবুব), জাফর (আজম) ও হামিদকে (মোহসিন) পার্টি থেকে বহিষ্কার করে। জুলাই মাসে একই অভিযোগে বহিষ্কার করা হয় ইলিয়াস, রিজভী, সালমা, মিনু ও মনসুরকে। এই মিনু নামটি বিশেষ ভাবে মনে রাখতে হবে।

ফজলু-সুলতানের বিদ্রোহ সর্বহারা পার্টিকে যে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পার্টির ১৯৭২ সালের দলিলে। ৩০ এপ্রিল প্রথম এ নিয়ে একটি জরুরি সার্কুলার জারি করা হয়। পুরো সার্কুলারটিই ছিল ফজলু-সুলতানকে নিয়ে। এরপর ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বিশেষ সার্কুলার জারি করে পার্টি। সবগুলোর বিষয়বস্তুই ফজলু-সুলতান। আরও অনেক অভিযোগের সঙ্গে দুই হাজার টাকা চুরিও অভিযোগ আনা হয়। সার্কুলার অনুযায়ী অভিযোগগুলো ছিল-ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করা, গুজব-অপবাদ রটনা করা, গুপ্ত হত্যার পরিকল্পনা করা, অর্থ-অস্ত্র চুরি করা, পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা, ক্যু ঘটিয়ে পার্টির ক্ষমতা দখল করা ইত্যাদি।

১৯৭২ সালের ৩ জুন ছিল সর্বহারা পার্টির প্রথম প্রতিষ্ঠা দিবস। এই দিন বরিশালে হত্যা করা হয় ফজলুকে। ১৯৭২ সালের ১০ জুন এক বিশেষ ইশতেহারে এই খতমের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির বীর গেরিলারা নিজস্ব উদ্যোগে ৩রা জুন ফজলু চক্রকে দেশীয় অস্ত্রের সাহায্যে খতম করে।’ বিশেষ সেই ইশতেহারের শিরোনাম ছিল, ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির বীর গেরিলারা এই বিশ্বাসঘাতক চক্রকে খতম করে সর্বহারা পার্টির প্রথম প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্‌যাপন করেছে।’  সফলভাবে ফজলুকে হত্যার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটি পরে বরিশাল অঞ্চলের গেরিলাদের কাস্তে হাতুড়ি খচিত স্বর্ণপদক প্রদান করে।

কেন ফজলু (তাঁর আরেকটি নাম ছিল আহাদ) সিরাজ সিকদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল? এমনিতেই সিরাজ সিকদার নিয়ে লেখালেখির পরিমাণ খুব বেশি না। যত লেখাই হয়েছে ফজলু অধ্যায়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফজলুর বিদ্রোহের কারণ নিয়ে যদিও খুব বেশি বিশ্লেষণ হয়নি। তবে সিরাজ সিকদারের এক সময়ের সহযোগী সূর্য রোকনের লেখায় কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। এই বিদ্রোহের পেছনেও রয়েছে প্রেম।

আমরা আগের পর্বে রুহুল (সিরাজ সিকদার) আর রাহেলার (জাহানারা হাকিম) প্রেম, এক সঙ্গে থাকা, মেলামেশা ও পরে বিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছি। তাদের এই সম্পর্ক নিয়ে কানাঘুষা ছিল পার্টির মধ্যেও। কেউ কেউ এই সম্পর্ক মানতে পারেননি। তবে সমস্যা শুরু হয় যখন ফজলু বা সেলিম শাহনেওয়াজ তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চাইল এবং কেন্দ্রীয় কমিটি তা মানল না। কারণ হিসেবে বলা হলো, মেয়েটি প্রকৃত বিপ্লবী না, পেটি বুর্জোয়া।

প্রশ্ন হচ্ছে সিরাজ সিকদারের নতুন সম্পর্ক মেনে না নেওয়ার এই অভিযোগ কতটা সত্য। এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় সর্বহারা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বিবৃতি থেকে। ফজলু-সুলতান ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির বিপ্লবী কমরেড ও সহানুভূতিশীল, সিরাজ সিকদারের কাছ থেকে জবাব নিন’-শিরোনামে একটি পুস্তিকা বের করেছিল। এর একটি জবাব হিসাবে ৭২ এর জুনে বিবৃতিটি দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। এর এক জায়গায় বলা হয়েছে,

‘কমরেড সিরাজ সিকদার যে ধরনের জীবনযাপন করেন তা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কমরেডদের অধিকাংশের ইচ্ছা মতোই করেন।’ আরেক জায়গায় বলা আছে, ‘কমরেড সিরাজ সিকদারের ব্যক্তিগত জীবন সংক্রান্ত বিষয়াদি পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের বিপ্লবী পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত। একজন সর্বহারা বিপ্লবী হিসাবে তিনি কখনো পার্টির নিকট মিথ্যা বলেননি। পার্টির অনুমতিসহ বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার কমরেডদের আছে।’

এবার আসা যাক ফজলুর প্রেম ও বিয়ে প্রসঙ্গ। সম্ভবত এটিই ছিল বিদ্রোহের অন্যতম কারণ। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত আরেকটি পার্টি দলিল। হুবহু তুলে দেওয়া যেতে পারে কথাগুলো।

 ‘ফজলু-সুলতান চক্র বলত যৌনকে কি অস্বীকার করা যায়? অর্থাৎ অপরিবর্তিত খুদে বুর্জোয়া মেয়ের সঙ্গে প্রেমকে যৌন কারণে বাদ দেওয়া যায় না। যৌন কারণে তাকে নিয়ে বিয়ে করতে হবে। অর্থাৎ বিপ্লব, পার্টি ও জনগণের ক্ষতি হবে জেনেও শুধু যৌন কারণে অপরিবর্তিত বুদ্ধিজীবী মেয়েদের বিয়ে করা, যৌনের কাছে আত্মসমর্পণ করা। ইহা হলো যৌন স্বার্থের নিকট বিপ্লব, জনগণ ও পার্টি স্বার্থকে অধীন করা।

ফজলু পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনে যোগদানের কিছুদিন পরে পাশ করলেই বিয়ে করা যাবে, এ কারণে সুবিধাবাদী হয়ে পরীক্ষা দেয়, খুদে বুর্জোয়াসুলভ পত্র লেখে, জেলে প্রেমিকার চিন্তায় বিভোর থাকে, জেল থেকে বেরিয়ে পাক-সামরিক ফ্যাসিস্টদের চরম নির্যাতনের সময় বিয়ের কাজে প্রাধান্য দেয়, ব্যক্তিস্বার্থে প্রেমিকাকে নিয়ে আসে, ফ্রন্টের দায়িত্ব ভুলে যেয়ে প্রেমিকার নিরাপত্তার জন্য নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে বাড়িতে যায়, সেখানে প্রেমিকার জন্য ফ্রন্টের দায়িত্ব ভুলে থেকে যায়, অর্থ-অস্ত্র হারায়, পরে পার্টি তাকে কাজ দিলে সেখানে প্রেমিকার চিন্তায় কাজে অমনোযোগ প্রদর্শন করে, শেষ পর্যন্ত উক্ত দায়িত্ব থেকে অপসারণ চায়, প্রেমিকাকে নিয়ে আকাশ-কুসুম কল্পনা করে, শেষ পর্যন্ত প্রেমিকার চিন্তায় আত্মহত্যা করতে পদক্ষেপ নেয়, মানসিক বিকার জন্মায়, প্রেমিকার অভিযোগে পার্টির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়।

এভাবে ফজলু-সুলতান চক্র যৌন স্বার্থের নিকট বিপ্লব ও জনগণের স্বার্থকে অধীন করে। এর পরিণতি কি?

এর পরিণতি হলো ফজলু-সুলতান চক্র গঠন, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চালানো, পার্টির অর্থ চুরি, শেষ পর্যন্ত পার্টি, বিপ্লব, জনগণের স্বার্থের ক্ষতি করা।’

ফজলুর সেই প্রেমিকার নাম ছিল মিনু। মিনুকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল সে সময়ে পার্টি থেকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ফজলুর সেই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ প্রেম-বিয়ে। আর এ কারণে ফজলু-সুলতান চক্রের প্রায় সবাইকে জীবন দিতে হয়েছিল নিজে দলের কর্মীদের হাতেই। নিষ্ঠুর ভাবে খতম করা হয়েছিল তাকে।

রইসউদ্দিন আরিফ তাঁর বইয়ে লিখেছেন,

‘পার্টিতে বাহাত্তর সালে ফজলু খতম হয়েছিল আকস্মিকভাবে। পার্টির স্থানীয় কর্মী ও গেরিলারা কেন্দ্রের অনুমোদন ছাড়াই ফজলুকে খতম করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি পরে ফজলু খতমের বিষয়টিকে অনুমোদন করে এবং এহেন কাজকে অভিনন্দিত করে। অথচ আমার মতে সে সময়ে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সঠিক করণীয়টি ছিল একদিকে ফজলু-সুলতান চক্রের পার্টি বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সংগ্রাম জোরদার করা এবং একই সঙ্গে ফজলু খতমের ঘটনাকে নিন্দা করা। পার্টি যদি সেদিন এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালনে সক্ষম হতো, তাহলে সর্বহারা পার্টির ইতিহাস লিখিত হতো ভিন্নভাবে।’

আসলেই অন্যরকম লেখা হতো পার্টির ইতিহাস। কেননা, ফজলুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই অধ্যায়ের শেষ হয়নি। এই বিদ্রোহ আর খতম ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনাটি। তা পরের পর্বে

ভালো লাগলে
[Total: 9   Average: 4.4/5]
শেয়ার করবেন?

1 thought on “বিপ্লবের ভেতর-বাহির ৩: ফজলু–মিনুর প্রেম পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published.