বিপ্লবের ভেতর-বাহির ১: গল্পটা কমরেড মুক্তার

60

১৯৭২ সালের একদিন। ডিঙি নৌকায় করে কামরাঙ্গীরচরের পাশ দিয়ে বুড়িগঙ্গা পাড় হয়ে তারপর যেতে হয় জিঞ্জিরায়। সেখানেই ছোট্ট একটা বাড়ি। পার্টির নিজস্ব গোপন শেল্টার। এই শেল্টারে থাকেন চারজন। কমরেড আসাদ, কমরেড মুক্তা, কমরেড শিখা এবং কমরেড টিটো। আরও এক সদস্য আছে, সাত-আট মাসের এক শিশু, নাম বাবু। কমরেড মুক্তার ছেলে। সেও জন্মগত কারণেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এই পাঁচজনের সঙ্গে থাকতে চলে এলেন কমরেড আরিফ, তাঁর স্ত্রী রানু এবং তাদের দেড় বছরের পুত্র শান্তনু। বিপ্লব করবেন বলে তারাও ঘর ছেড়ে চলে এসেছেন এই গোপন আস্তানায়। কমরেড টিটু তাদের নিয়ে এসেছে গোপন এই শেল্টারে।

ওরা সবাই পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির সদস্য। আর তাদের সবার নেতা সিরাজ সিকদার। সশস্ত্র বিপ্লব তাদের লক্ষ্য, স্বপ্ন শোষণমুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠা। সেই ইতিহাস কমবেশি অনেকেই জানেন। তবে আমাদের আজকের গল্পটি কমরেড মুক্তার। বলে রাখা ভালো, সবগুলোই রাজনৈতিক নাম, ছদ্মনাম। প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা পার্টির নির্দেশ। কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিচয় জানার চেষ্টা পার্টির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বহির্ভূত বিষয়।

কমরেড মুক্তা সবাইকে দাদা বলে ডাকতেন। মুক্তার স্বামী কমরেড ঝিনুক। কমরেড ঝিনুক ঢাকায় থাকেন না, খুলনা অঞ্চলে পার্টির কাজ করেন। ঝিনুকের সঙ্গে তখন পার্টির মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব চলছিল। এ কারণে ঢাকায় আসতে পারতেন না সে। ফলে স্ত্রী ও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই থাকতে হতো কমরেড ঝিনুককে। মনে রাখতে হবে, ‘ব্যক্তিস্বার্থ এমনকি ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখও বিপ্লবের অধীন’-এটি বিপ্লবের আরেকটি তত্ত্ব। তারপরেও শেল্টারে কমরেড মুক্তা সর্বদা থাকতেন মনমরা হয়ে।

কমরেড মাসুদ এসে একদিন জানালেন, বিশেষ সাংগঠনিক শৃঙ্খলাজনিত কারণে মুক্তাকে কয়েক দিনের জন্য অন্য শেল্টারে সরিয়ে নিতে হবে। নতুন সেই শেল্টারটি ঢাকার আগামসি লেনে অবস্থিত। মুক্তাকে নতুন শেল্টারে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আরিফের ওপর। তিনি পৌঁছে দিলেনও।

সিরাজ সিকদার ঢাকায় এলে জিঞ্জিরার এই শেল্টারেই উঠতেন। কমরেড আরিফ কমরেড মুক্তাকে নতুন শেল্টারে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসে দেখলেন সিরাজ সিকদার তাঁর স্ত্রী জাহানারা হাকিমকে নিয়ে এরই মধ্যে চলে এসেছেন। সঙ্গে দুই সন্তান শিখা ও শুভ্র।

এবার আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। সিরাজুল হক সিকদার ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র। ছাত্রজীবনে ছিলেন লিয়াকত আলী হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) সভাপতি। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতিও হয়েছিলেন। বুয়েট থেকে পাশ করেন ১৯৬৭ সালে। চীনের রেড গার্ড মুভমেন্টে অনুপ্রাণিত হয়ে কৃষকদের নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন সিরাজ সিকদার। কৃষকদের সংগঠিত করতে চলে যান নিজের গ্রাম ফরিদপুরের ডামুড্যায়। সিরাজ সিকদার ছিলেন সুদর্শন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পড়তেন। সানগ্লাস তাঁর প্রিয় ছিল। বেশভূষায় আধুনিক। ফলে তাঁর পক্ষে কৃষকদের বিশ্বাস অর্জন করা শুরুতে খুব সহজ ছিল না। সম্ভবত আস্থা অর্জনের জন্যই সিরাজ সিকদার খুব দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অনেকে হঠকারীও বলেন। আর সেটি হল, হঠাৎ করে তিনি এক দরিদ্র কৃষকের মেয়ে রওশন আরাকে বিয়ে করেন। এই রওশন আরাই আমাদের কমরেড মুক্তা। পরে প্রমাণ হয়েছে সিরাজ সিকদারের এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আর এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একাধিক জীবনও নষ্ট হয়। এমনকি বিপ্লবেরও ক্ষতি হয়েছিল যথেষ্ট।

সিরাজ সিকদার আর রওশন আরার দুই সন্তান। বড় মেয়ে শিখা আর ছেলে শুভ্র। এই শিখা আর শুভ্রর মা কমরেড মুক্তা। ১৯৭২ সালে তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তখন সিরাজ সিকদার পুরোপুরি গোপন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, গঠন করেছেন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।

সিরাজ সিকদার মারা যাওয়ার পর দলের সম্পাদক হয়েছিলেন রইসউদ্দিন আরিফ। তিনি লিখেছেন, ‘‘এই বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তটি এককভাবে সিরাজ সিকদারের ছিল না। পার্টি নেতার ‘নিরাপত্তা’ ও ‘স্ট্যাটাসের’ কথা ভেবে এটি ছিল পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত।’ ’

দলের বিভিন্ন ইশতেহার পড়লেও এর সত্যতা পাওয়া যায়। একাধিক ইশতেহারে বলা আছে, সিরাজ সিকদার যে জীবন যাপন করেন তা পার্টির সিদ্ধান্ত অনুসারেই। তবে এই বিবাহবিচ্ছেদটি যে পার্টি ও বিপ্লবের জন্য কল্যাণকর হয়নি তা পরবর্তী বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে-লিখেছেন রইসউদ্দিন আরিফ।

তবে খানিকটা খটকা লাগে ‘স্ট্যাটাস’ কথাটার কারণে। ‘প্রলেতারিয়েত’দের জন্য কাজ করেছেন সিরাজ সিকদার। যদি তাই হয়, তাহলে একজন দরিদ্র কৃষকের মেয়ের সঙ্গে জীবনযাপন নিয়ে কেন স্ট্যাটাসের প্রশ্ন উঠবে। এর উত্তর পাওয়া যাবে না। কারণ, এ নিয়ে কেউই খুব বেশি কিছু লেখেননি। অল্প কিছু জানা যায় সিরাজ সিকদারের একসময়ে সহযোগী সূর্য রোকনের একটা লেখা থেকে। কমরেড মুক্তা এখন কোথায় আছেন জানা নেই।

কমরেড মুক্তার কাহিনি আরও আছে। ‘পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তটি কমরেড মুক্তা মাথা পেতে মেনে নিয়েছিলেন। প্রথমত, পার্টি ও বিপ্লবের স্বার্থে। দ্বিতীয়ত, নিজের শ্রেণি অবস্থানের কথা বিবেচনা করে। কমরেড মুক্তার দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়েছিল কমরেড ঝিনুকের সঙ্গে। কমরেড সিরাজ সিকদার নিজেই এ বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন’ (আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন সমগ্র-রইসউদ্দিন আরিফ)।

সিরাজ সিকদার জিঞ্জিরার শেল্টারে আসলেই অন্য শেল্টারে নিয়ে যাওয়া হতো মুক্তাকে। দেখা হতো না শিখা ও শুভ্রর সঙ্গে। বলা হতো ‘নিরাপত্তা’ ও ‘শৃঙ্খলাজনিত কারণ’। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করবেন আসল কারণ কি অন্য? প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে যাতে দেখা না হয় সে কারণেই কি জিঞ্জিরা শেল্টার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল মুক্তাকে।

কমরেড মুক্তার জীবনের ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। সিরাজ সিকদার সরকারি বাহিনীর হাতে মারা যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে দলের মধ্যে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। খুনোখুনি হয় নিজেদের মধ্যে। এতে মারা যান দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা। এক উপদল আরেক উপদলকে খতম করে। মতের মিল না হওয়ায়, এমনকি সামান্য সন্দেহ থেকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় দলের সদস্যদের। খতম করা হয় অনেককেই। আর এই পথেই খতম করা হয় কমরেড ঝিনুককে।

আগেই বলেছি, সিরাজ সিকদার ও রওশন আরার বিবাহবিচ্ছেদটি পার্টি ও বিপ্লবের জন্য কল্যাণকর হয়নি। এর অনেক প্রমাণ পরবর্তীতে দেখা যায়। সে ঘটনায় যাওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে সিরাজ সিকদারের দ্বিতীয় বিয়ের কাহিনি। এ কাহিনিও অভিনব, ঘটনাবহুল ও রোমাঞ্চকর। উপন্যাসকেও হার মানায় সে কাহিনি।

সবশেষ তথ্য হচ্ছে, সিরাজ সিকদারের পুত্র মনিরুল হক সিকদার শুভ্র চলতি বছরের (২০১৯) ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। আর বোন শিখা কানাডায় থাকেন।

নোট: সিরাজ সিকদার সাচ্চা বিপ্লবী ছিলেন। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব আর নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউ এখানেও এসে লেগেছিল। সিরাজ সিকদার মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন। সিরাজ সিকদার সত্যিকার শোষণমুক্ত একটা দেশ চেয়েছিলেন। তিনি পারতেন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে। কিন্তু মানুষকে ভালোবেসে সেটা করেননি। তবে সেই বিপ্লব সফল হয়নি। ব্যর্থতার নানা কারণ ছিল। এই লেখা সিরাজ সিকদারের মূল্যায়ন নয়। সফলতা বা ব্যর্থতারও কাহিনি নয়। বরং তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন বই ও লেখা পড়ে সেই সময়কার নানা ঘটনার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা বলা যায়। কারণ, আমার ধারণা, বিপ্লবীরা ব্যক্তি মানুষকে গুরুত্ব কম দিয়েছে। কিন্তু একটা মানুষের নানা দিক আছে। সেগুলো বিবেচনা করা হলে বিপ্লবের ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। আমি চেষ্টা করেছি ব্যক্তিজীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের প্রভাব, যা শেষ পর্যন্ত অনেক ধরনের বিপদ ডেকে এনেছিল অনেকের জীবনে।

নোট–২: ব্লগ সিরিজটি লিখেছিলাম অনেক আগে। নতুন করে এখানে দিচ্ছি, অবশ্যাই সম্পাদনা করে, হালনাগদ তথ্যসহ।

ভালো লাগলে
[Total: 9   Average: 3.9/5]
শেয়ার করবেন?

1 thought on “বিপ্লবের ভেতর-বাহির ১: গল্পটা কমরেড মুক্তার

  1. গল্পের মতো লাগছে। গোপন রাজনীতি আর ব্যক্তিজীবন, মানুষকে কত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে। ব্যক্তি সিরাজ শিকদার নিয়ে খুবই আগ্রহ পাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.