গণমাধ্যম: কারা টিকে থাকবে, কারা থাকবে না

27

নাসিরউদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প আছে। একবার এক বৃদ্ধা এল হোজ্জার কাছে চিঠি লিখে দেওয়ার জন্য। হোজ্জা বললেন তিনি পারবেন না, কারণ তাঁর পায়ে ব্যথা। চিঠি লেখার সঙ্গে পায়ে ব্যথার সম্পর্ক কী। অবাক হলেন বৃদ্ধা। তখন হোজ্জা বলল, তাঁর যে হাতের লেখা তাতে এই চিঠি কেউই পড়তে পারবে না। ফলে তাকেই গিয়ে পড়ে দিতে হবে। কিন্তু সেটা সম্ভব না, কারণ তাঁর পায়ে ব্যথা।

সাংবাদিক জীবনে অনেকেরই লেখা পড়তে হয়। বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়ায় লেখাটাই আসল। কিন্তু অনেকের লেখা পড়েই হোজ্জার গল্পটা মনে পড়ে। অবশ্য আক্ষরিক ভাবে বললে বলা যায়, এখন হাতের লেখা পড়তে কষ্ট হয় না। কারণ কম্পিউটারে সবার হাতে লেখাই একইরকম। পড়তে কষ্ট হওয়ার কথা না, তারপরেও কিন্তু হয়। এ ক্ষেত্রে মনে হয় নিচের গল্পটাই বেশি মানানসই হবে।

এক লোক একদিন এসে দাবি করল-সে লিখতে পারে কিন্তু পড়তে পারে না। সবাই অবাক। সাধারণত উল্টোটাই দেখা যায়। অতএব পরীক্ষা নেওয়া হোক। কাগজ কলম দেওয়া হলো। সে লিখল কিছু একটা। কিন্তু লেখা আর পড়া যায় না। সবাই ধরল তাকে, কি লিখছ নিজেই পড়ো। এবার তাঁর নির্বিকার উত্তর-বলছি না, লিখতে পারি, পড়তে পারি না।

প্রিন্ট মিডিয়ায় যারা কাজ করেন তাদের জন্য প্রথম শর্তই হচ্ছে লিখতে জানতে হবে। লিখতে জানেন না, কিন্তু বড় সাংবাদিক হয়ে গেছেন এমন আছেন অনেকেই। গল্পটা খুব প্রচলিত। কারও কারও সম্বন্ধে বলা হয়, তিনি মাসে একবারই লেখেন, বেতনের স্লিপে। কেবল নিজের নামটা সই করেন।

অনেক রিপোর্টারই কেন ভালো লিখতে পারেন না তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারতের খুবই নামকরা সাংবাদিক হামদি বে। তিনি নিজেও রিপোর্টার ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘কাগজের লোকেরা খবরের জন্য অপেক্ষা করে যত সময় ব্যয় করেন তার সিকিভাগও খবরটা লেখার জন্য ব্যয় করেন না। অর্থাৎ শতকরা নব্বুই ভাগ সময় প্রতীক্ষা আর দশ ভাগ সময়ে লেখা।’

এখন মিডিয়ার অনেক ভাগ। প্রিন্ট, টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন। সুতরাং এখন না লিখেও সাংবাদিক হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। রেডিও বা টেলিভিশনের লেখালেখির সুযোগ নেই। আর তারা এখন যে সাংবাদিকতা করেন তাতে লেখালেখির খুব দরকারও হয়তো পড়ে না। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রিন্ট মিডিয়ার যে ইন্ট্রো, সেটাই অনেক টেলিভিশনের পুরো সংবাদ। এর জন্য কতটুকুই বা লিখতে হয়!

যতই প্রিন্ট মিডিয়ার ঐতিহ্যের জয়গান গাই না কেন, এখনকার বড় প্রশ্ন হচ্ছে কত দিন টিকে থাকবে এই মিডিয়াটি। পশ্চিমে প্রিন্ট মিডিয়া টিকছে না। এক বছর আগেও বলা হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ায় আরও বেশ কয়েক বছর দাপটের সঙ্গেই টিকে থাকবে প্রিন্ট মিডিয়া। কিন্তু এই সব আশাবাদীদের গলা একটু চুপসে গেছে। পত্রিকার বিক্রি আর বাড়ছে না। কমছে বিজ্ঞাপন। তারপরেও বলা যাবে না যে প্রিন্ট মিডিয়া মরে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে আরও কয়েক বছর সত্যিই হয়তো টিকে থাকবে। তবে এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে চালালে টিকে থাকার বয়স আরও যে কমবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ছাপা কাগজের প্রতিদ্বন্দ্বী কে? অনেকেই বলেন টেলিভিশন বা ভিজ্যুয়াল মিডিয়া। এখন বলা হচ্ছে মূল হুমকি ডিজিটাল মিডিয়া। বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিতে এটি আলোচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতা সংবাদপত্রের সাংবাদিকতাকে বিপদে ফেলেছে এমনটি এখনো দেখা যায়নি। সেই যে সায়মন ড্রিং-এর একুশে টিভি যে ধারার সূচনা করেছিল সেখান থেকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে টেলিভিশনগুলো সামান্য এগিয়েছে তা খুব জোর গলায় বলা যাবে না। এই সময়ে বাংলাদেশে টেলিভিশনগুলোর আবিষ্কার হল টকশো। বলাই বাহুল্য টকশো সাংবাদিকতা নয়। সংবাদপত্রের যা উপসম্পাদকীয়, সেটাই টেলিভিশনের টকশো। সংবাদপত্রের মূল জায়গা হচ্ছে সংবাদ। খুব সরল ভাষায় বলতে গেলে, প্রথম ও শেষ পাতার ছাপা হওয়া নিউজ। মাঝের পাতার উপসম্পাদকীয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশে টেলিভিশনগুলো দেখলে মনে হয় টকশো করাই তাদের প্রধান  লক্ষ্য। সম্ভবত টকশো আয়োজন করা সবচেয়ে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে করা যায় বলে এদিকে আগ্রহ বেশি।

কিন্তু যে কোনো সংবাদমাধ্যমের কাছেই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা থাকে সংবাদের। একজন পাঠক ও দর্শকের আগ্রহ বেশি থাকবে সংবাদে। তারপরেও বলতে পারেন, টকশো তো দর্শকেরা দেখছে। আপনি যখন সংবাদ দিয়ে পাঠকের মন ভরাতে পারবেন না তখনতো দর্শকেরা বিনোদনের দিকেই ঝুঁকে থাকবে। আমরা তো টক শোকে মোটামুটি বিনোদনের পর্যায়েই নিয়ে গেছি।

বাংলাদেশে প্রিন্ট আর টেলিভিশন মিডিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বরং পরিপূরক হয়ে গেছে। কারণ, টেলিভিশনগুলো কেবল দিনের ঘটনা নিয়েই ব্যস্ত  থাকে। খুব ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাড়তি সংবাদ বা গভীরে যাওয়ার মতো কোনো কিছু তেমন দেখা যায় না। বরং কোনো ঘটনা ঘটলে সেটি নিয়ে আরও বেশি সংবাদ করার চেয়ে সেটি নিয়ে টকশো করার দিকেই তাদের আগ্রহ যেন বেশি। ফলে সংবাদপত্রকে কোনো প্রতিযোগিতাই ফেলতে পারছে না ভিজুয়াল মিডিয়া। সংবাদ পত্রের প্রতি এখনো আগ্রহ তেমন কমেনি পাঠকদের। ৫ টাকার পত্রিকা বনাম ১০ টাকার পত্রিকার মধ্যে প্রচার নিয়ে যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ততটা নেই টেলিভিশনের সঙ্গে। ফলে টেলিভিশন কমাতে পারেনি সংবাদ পত্রের প্রচার সংখ্যা।

টেলিভিশন মিডিয়া এখনো সংবাদের ক্ষেত্রে কোনো এজেন্ডা তৈরি করতে পারে না। এমন খুব কমই হয়েছে যে তারা কোনো বড় একটি সংবাদ ব্রেক করেছে বা গভীর অনুসন্ধানী কিছু একটা করেছে আর সংবাদপত্র সেগুলো লুফে নিয়েছে। বরং উল্টো। সকালে দিনের সংবাদ পত্র পেয়ে তারপরেই টেলিভিশনগুলো ঠিক করে দিনের সংবাদ বা টকশো পরিকল্পনা। এভাবে চললে অন্তত বাংলাদেশে প্রিন্ট মিডিয়ার টেলিভিশন মিডিয়ার কাছ থেকে কোনো ভয় নেই। তবে বলতেই হয়, অপরাধভিত্তিক কিছু টেলিভিশন অনুষ্ঠান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

প্রণব বর্ধন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, বার্কলের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। তিনি সম্প্রতি একটি আত্মজীবনী লিখেছেন, নাম ‘স্মৃতিকূণ্ড য়ন’। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘কিছুদিন আগে দিল্লির টিভিতে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য আহূত হয়ে করণ থাপারের স্টুডিওতে ঢুকতে যাচ্ছি, এমন সময় কোথা থেকে একটি ফুটফুটে বাঙালি মেয়ে টিভি ক্যামেরা নিয়ে আমাকে বাংলায় বলল, স্যার, আপনি ভেতরে যাওয়ার আগে আমাকে একটা বাইট দিয়ে যাবেন? মুহূর্তের জন্য মনে হল বুঝি কামড়ে দিতে বলেছে, অনেক কষ্টে আমার অন্তর্নিহিত ড্রাকুলাটিকে নিরস্ত করে মেয়েটিকে এক মিনিটের byte-এর আকারে একটা বাণী দিলাম।’ এ থেকে বলা যায়, কামড় দেওয়ার মতো সাংবাদিকতা না করতে পারলে, কেবল byteভিত্তিক সাংবাদিকতা টেলিভিশন মিডিয়াকে খুব বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।

সংবাদ পত্রের জন্য সত্যিকারের হুমকি ডিজিটাল মিডিয়া। এখন অনেকেই সংবাদপত্র হাতে না নিয়ে মোবাইলের ছোট পর্দায় সংবাদটি পড়ে নিচ্ছেন। আর সংবাদটির হদিস পাচ্ছেন ফেসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে। বিশেষ করে তরুণেরা এই কাজটিই বেশি করছেন। এ অবস্থায় সংবাদপত্র নিয়ে শঙ্কার অবশ্যই কারণ আছে। এই সব তরুণ পাঠকদের ধরে রাখতে সংবাদের ধরন পালটাতে হবে। সারা দিন ধরে টেলিভিশনে যে সংবাদটি প্রচার হচ্ছে, পরের দিন ঠিক সেটিই ছাপানো যাবে না। বাড়তি কিছু দিতে হবে। অকারণে সংবাদটি বড় করা যাবে না। বেশি বড় সংবাদ অনেকেই পড়তে চাইবেন না। লেখার ধরনও পালটাতে হবে। সংবাদের ধরন অনুযায়ী সংবাদটি লেখার ধরনও পালটাতে হবে। তরুণেরা যা পছন্দ করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এখন যেভাবে সংবাদপত্রগুলো আমরা চালাচ্ছি সেভাবে চলতে থাকলে সামনে কিন্তু বিপদ। এই সত্যটি উপলব্ধি করে যারা নিজেদের বদলাবেন, তারাই ভবিষ্যতে টিকে থাকবেন। তবে এটা সত্যি, ভবিষ্যতে এত এত সংবাদপত্র, এত এত টেলিভিশন মিডিয়া এবং এত এত অনলাইন নিউজ পোর্টাল থাকতে পারবে না। অনেকগুলোই ঝরে যাবে। সাধারণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এটা বলা যায়। পাশাপাশি যারা সৎ সাংবাদিকতা করবেন, অনুসন্ধানী রিপোর্টের পরিমাণ বাড়াবেন, ভালো লিখতে পারবেন, ভিন্ন কিছু করতে পারবেন তারাই সাংবাদিক হিসাবেও টিকে থাকবেন। চ্যালেঞ্জ আসলে এগুলোই।

২.

কথাটা এ রকম-প্রিন্ট মিডিয়া সূর্যের মতো, এটি সব সময়ই পূর্বে উঠে আর পশ্চিমে অস্ত যায়। বিশ্বাস করুণ কথাটা সত্যি। পশ্চিমে প্রিন্ট মিডিয়া বা দৈনিক পত্রিকার বড়ই দুরবস্থা। বিক্রি কমেছে, বিজ্ঞাপনও কমছে। মানুষ দৈনিক পত্রিকা কম পড়ছে। বড় প্রশ্ন হচ্ছে দৈনিক পত্রিকা আর কত দিন টিকে থাকবে?

রিপোর্টের কারণে নিক্সন সরকারের পতন ঘটেছিল। ওয়াশিংটন পোস্ট সেই রিপোর্ট করে প্রিন্ট মিডিয়াকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। এর পরে ও আগেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে সারা বিশ্বে অনেক ওলট পালট হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুর। সবকিছুই কি বন্ধ হয়ে যাবে? অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট বিক্রি হয়ে হয়ে গেছে। টানা সাত বছর ধরে আয় কমে যাওয়ার পর ২৫ কোটি ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয় ওয়াশিংটন পোস্ট। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বিজোস কিনে নিয়েছেন পত্রিকাটি।

সেই ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াল্টার আইস্যাকশন লিখেছিলেন আলোচিত একটা নিবন্ধ। শিরোনাম ছিল, হাউ টু সেভ ইওর নিউজ পেপার। সেখানে তিনি দৈনিক পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছিলেন। তিনি বেশ কিছু প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে বেশি কিছু প্রস্তাব মেনে নিলেও তা খুব বেশি কাজে লাগেনি। যেমন, তিনি বলেছিলেন দৈনিক পত্রিকাগুলোর উচিত নয় ইন্টারনেটে বিনা মূল্যে পত্রিকা পড়তে দেওয়া। এই সুপারিশ মেনে অনেক পত্রিকাই অর্থের বিনিময়ে অনলাইন গ্রাহক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কিন্তু এতে আয় তো বাড়েইনি, বরং গ্রাহক কমে গিয়েছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমস তৃতীয় দফায় সফল হয়েছে। ২০টি পর্যন্ত নিউজ পড়তে পারবে বিনা মূল্যে, এরপর পড়তে চাইলেই অর্থ দিতে হবে। এই পদ্ধতিতে সফল হয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। পশ্চিমা বড় পত্রিকার মধ্যে লাভ জনক এখন এই নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইকোনমিস্ট (দৈনিক পত্রিকা নয়), হেরাল্ড ট্রিবিউনের মতো প্রভাবশালী কিছু পত্রিকা। গার্ডিয়ান লোকসানি প্রতিষ্ঠান।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ইকোনমিস্টের সাফল্যের আরেকটি কারণ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের মোড়ল। সারা বিশ্বের মানুষ জানতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি ভাবছে। এ কারণে নিউইয়র্কের বাইরে পত্রিকাটির বড় পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে। ইকোনমিস্ট-এরও বড় করপোরেট পাঠক রয়েছে।

কয়েক বছর ধরে এই বিতর্কটি বেশ ভালো ভাবেই চলছে। আর তা হচ্ছে কত দিন টিকে থাকবে এই প্রিন্ট মিডিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকতার অধ্যাপক ফিলিপ মেয়ার ভ্যানিশিং নিউজ পেপার নামে একটা বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ২০৪৩ সালের শুরুটাই হচ্ছে সেই সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক পত্রিকার আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটবে। শেষ পত্রিকাটি হাতে নিয়ে পড়বেন পাঠকেরা।

সামগ্রিকভাবে পশ্চিমে নিউজ পত্রিকার চেহারা করুন। পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। সর্বশেষ ২০১২ সালের পরিসংখ্যান হাতে রয়েছে। ২০১২ সালে আগের বছরের তুলনায় সারা বিশ্বে দৈনিক পত্রিকার বিক্রি কমেছে, দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকায় কমেছে ৬.৬ %, পশ্চিম ইউরোপে ৫.৩ %, পূর্ব ইউরোপে ৮.২% এবং ১.৪% মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায়।

গত পাঁচ বছরের হিসাবটিও ভয়ংকর। গত ৫ বছরে এর মধ্যে উত্তর আমেরিকায় দৈনিক পত্রিকার বিক্রি কমেছে কমেছে ১৩ %, দক্ষিণ আমেরিকায় ০.৮ %, পশ্চিম ইউরোপে ২৪.৮% এবং পূর্ব ইউরোপে ২৭.৪ %।

প্রশ্ন হচ্ছে উন্নত বিশ্বে থেকে দৈনিক পত্রিকাকে কে সরিয়ে দিচ্ছে? একটা কথা সবাই মানেন, দৈনিক পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী টেলিভিশন মিডিয়া সেভাবে হতে পারেনি। টেলিভিশন মিডিয়া দৈনিক পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী আগেও হতে পারেনি, এখনো নয়। টেলিভিশন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংবাদটি দিচ্ছে, কিন্তু গভীর বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তেমন করতে পারেনি। বরং বলা যায়, টেলিভিশন সংবাদের শিরোনামটি বলার কারণে, সংবাদের ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। ফলে টেলিভিশনে সংবাদ চলে আসায় প্রিন্ট মিডিয়ার তেমন ক্ষতি হয়নি। এমনকি বাংলাদেশেও হয়নি।

তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী কে? ইন্টারনেট। সঠিকভাবে বলা যায়, ডিজিটাল মিডিয়া। মানুষ এখন পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়ে না। পড়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এক সময় পড়ত পিসিতে, এরপর মোবাইল, আর এখন ট্যাবলেটে। শুরু হয়েছিল ৯০ এর দশকে। যখন ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বব্যাপী। উন্নত দেশগুলোতে এখন তাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০০ শতাংশই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে সংবাদ তারা দ্রুত পেয়ে যায়। একটা দৈনিক পত্রিকা হাতে নেওয়ার সময় তাদের নেই। বিজ্ঞাপন আয়ের একটি বড় অংশ ছিল ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপন। উন্নত দেশগুলোতে এখন পত্রিকায় কোনো ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপন ছাপা হয় না। এ ধরনের বিজ্ঞাপন এখন অনলাইনে চলে গেছে। এতে আয়ে ধস নেমেছে দৈনিক পত্রিকাগুলোর।

ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ-এসব কারণেও দৈনিক পত্রিকার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে অনেক পাঠক। সিটিজেন জার্নালিজম জনপ্রিয় হচ্ছে। যে কোনো সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বলা যায়, সংবাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু সংবাদ পড়া ও জানার মাধ্যম পালটে যাচ্ছে। এ কারণে উন্নত বিশ্বের অনেক পত্রিকা এখন সপ্তাহে তিন দিন বের হয়। কেউ কেউ কাগজ বাদ দিয়ে কেবল ইন্টারনেটে চলে গেছে। কেউ কেউ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছেন, সবারই লক্ষ্য খরচ কমানো। অর্থাৎ সংবাদ টিকে থাকবে, কিন্তু মাধ্যম হিসাবে দৈনিক পত্রিকা হয়তো এক সময় টিকে থাকবে না। সংবাদ পাওয়া যাবে হাতের মুঠোয়, মোবাইলে, ট্যাবলেটে।

সব মিলিয়ে প্রিন্ট মিডিয়া বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনার বিষয়। প্রশ্ন একটাই কত দিন টিকে থাকবে দৈনিক পত্রিকা?

ভালো লাগলে
[Total: 0   Average: 0/5]
শেয়ার করবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published.