কালো গোষ্ঠী যেভাবে তৈরি হয়

20

চীনে ২০১৪ সালে এক সরকারি কর্মকর্তার বাসা থেকে ২০ কোটি ইউয়ান (৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের সমান) উদ্ধার করেছিলেন দেশটির দুর্নীতি প্রতিরোধ তদন্ত কর্মকর্তারা। উয়েই পেনজুয়ান ছিলেন চীনের জাতীয় জ্বালানি প্রশাসনের কয়লা বিভাগের উপপ্রধান। তাঁর কাজ ছিল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া। উদ্ধার হওয়া অর্থ ছিল ঘুষের। চীনের সর্বোচ্চ মুদ্রার নোট ১০০ ইউয়ানের। একটার ওপর একটা রাখলে তা উঁচু হবে ৩২৮ ফুট। এই নোট গুনতে ১৬টি কাউন্টিং মেশিন ব্যবহার করা হয়েছিল, যার চারটিই ভেঙে যায়।
নগদ অর্থ উদ্ধারের এই রেকর্ড ভেঙেছেন সুদানের বিতাড়িত প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। গত ২০ এপ্রিল তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩ কোটি ডলার সমপরিমাণ বিভিন্ন মুদ্রার নোট। আর এর আগে ২০১৬ সালে রাশিয়ার দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দিমিত্রি ঝাখারচেনকোর গাড়ি, পড়ার রুম আর বোনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ।

‘বনখেকো’ ওসমান গনিকে নিশ্চয়ই মনে আছে। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক প্রধান বনসংরক্ষক ওসমান গনির উত্তরার সরকারি বাসার বালিশ-তোশকের ভেতরে ও ড্রামে রাখা নগদ ১ কোটি ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৬০০ টাকা উদ্ধার করেছিল।
বাড়িতে টাকা রাখার প্রবণতা যে মোটেই কমেনি, বরং বেড়েছে তা–ও জানা গেল ২০১৯ সালে এসে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় বাসায় নগদ অর্থ উদ্ধার ও সোনা রাখার ঘটনা অনেকগুলো। এভাবে নগদ টাকা ঘরের মধ্যে রেখে দেওয়ার ঘটনায় অনেকেই বিস্মিত। তবে আটক ঠিকাদার, আওয়ামী লীগ নেতা জি কে শামীমের মাতৃভক্তির কথাও খানিকটা বলা উচিত। তিনি মায়ের নামেই ব্যাংকে রেখেছেন ১৪০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত। একইভাবে গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার বাসায় নগদ ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ছাড়াও পাওয়া গেছে ৭৩০ ভরি স্বর্ণালংকার। সব অর্থ যে নগদ রাখতে নেই, স্বর্ণের মতো নিরাপদ পণ্যে রাখতে হয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁদের এই আধুনিক চিন্তাকেও তো সাধুবাদ জানাতে হয়।
তবে দেশে হঠাৎ করে ক্যাসিনোর খনি আবিষ্কার বা ঘরে ঘরে নগদ টাকার ছড়াছড়ি দেখে যাঁরা অবাক হয়েছেন, তাঁদের জন্য কিছু কথা বলতেই হয়। ক্যাসিনো দেশে রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। ক্যাসিনো পরিচালনার সব ধরনের সামগ্রী এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চোখের সামনে, ক্যাসিনোগুলো চলেছে প্রশাসনের নাকের ডগায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশ্রয়ে ও রাজনীতিবিদদের পৃষ্ঠপোষকতায়। এরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের হয়ে ফুলেফেঁপে বড় হয়েছেন, অবৈধ উপার্জনও হয়েছে যথেষ্ট। তবে ধরা পড়ছে সামান্যই।
অবৈধ উপার্জন করা অর্থের বৈধ বিনিয়োগের উদাহরণ খুবই কম। দেশে স্বাধীনতার পর থেকে অসংখ্যবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও কম মানুষই এ সুবিধা নিয়েছেন। বরং পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হয়ে গেছে।
বিশ্ব এখন ‘ক্যাশলেস’ বা নগদ অর্থ লেনদেনবিহীন একটি সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা ছাড়াও দুর্নীতি কমাতে এটি একটি কার্যকর ব্যবস্থা বলেই মনে করা হয়। কিছুদিন আগেও দুনিয়াবাসীর ধারণা ছিল, কাজটি ভালোমতোই এগোচ্ছে। তা ছাড়া ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার পর ব্যাংক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানোয় অনেকেরই ধারণা ছিল অবৈধ অর্থের লেনদেন কমবে। কিন্তু ২০১৭ ও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একাধিক উদ্বেগজনক রিপোর্ট অনেক ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ১০০ ডলারের নোট ব্যবহার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। অথচ এক দশক আগেও ১ আর ২০ ডলারের নোট ব্যবহার হতো বেশি। আর এখন যত ১০০ ডলারের নোট আছে, তার ৮০ শতাংশই আছে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। আর এই অর্থের বড় অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ কাজে। নগদ ১০০ ডলারের নোট নিয়ে এখন বলা হয়, ‘ক্যাশ ইজ কিং, বাট ১০০ ডলার নোট আর ফর ক্রুকস’।
বিশ্বব্যাপী অবৈধ অর্থ উপার্জনের নানা পথ রয়েছে। অনলাইনভিত্তিক হ্যাভোকস্কোপ বিশ্বব্যাপী অবৈধ বাজার ও অবৈধ উপার্জনের নানা তথ্য প্রকাশ করে থাকে। সেখানে ৫০ ধরনের বেশি অবৈধ উপার্জনের তথ্য আছে। যেমন নকল ওষুধের বাজার ২০০ বিলিয়ন ডলারের, পতিতাবৃত্তির বাজার ১৮৬ বিলিয়ন ডলার, নকল ইলেকট্রনিকস পণ্যের ১৬৯ বিলিয়ন ডলার, মারিজুয়ানার ১৪২ বিলিয়ন ডলার, অবৈধ জুয়ার ১৪০ বিলিয়ন ডলার এবং কোকেনের বাজার ৮৫ বিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ তাহলে কত? বিশ্বব্যাপী কালোটাকা নিয়ে কাজ করেন অস্ট্রিয়ার অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নেইডার। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩৪ শতাংশ। টাকার অঙ্কে হিসাব করলে তা হয় পৌনে চার লাখ কোটি টাকা।
প্রশ্ন হচ্ছে অবৈধ অর্থের এই যে ছড়াছড়ি, এর উৎস কী কী। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক সাদরেল রেজা বাংলাদেশের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি’ নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। গবেষণায় তিনি কালোটাকার আয়কে দুভাগে ভাগ করেছিলেন। যেমন সরল কালো আয় ও যৌগিক কালো আয়। সরল কালো আয়ের উৎস তিনটি। যেমন বিনিয়োগে অস্বাভাবিক মুনাফা, পেশাজীবীদের অতিরিক্ত ফি এবং পুঁজির অতিরিক্ত আয়। বিনিয়োগে অস্বাভাবিক মুনাফার মধ্যে রয়েছে ইন্ডেন্টিং ও নির্মাণ কর্মকাণ্ড, জনশক্তি ব্যবসা, বেসরকারি ক্লিনিক, চলচ্চিত্র ব্যবসা ইত্যাদি। পেশাজীবীদের অতিরিক্ত ফি হচ্ছে আইনজীবী, ডাক্তার, কনসালট্যান্ট এবং সিনেমা তারকার অতিরিক্ত ফি ইত্যাদি। পুঁজির অতিরিক্ত আয়ের মধ্যে ছিল বাসস্থানের উচ্চমূল্য ও শেয়ারবাজার থেকে অস্বাভাবিক আয়। যৌগিক কালোটাকার উৎসও তিনটি। এর মধ্যে ব্যবসা, শিল্প ও সেবাসম্পৃক্ত উৎসের মধ্যে ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং, বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেন, চোরাচালান, ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি, নিম্নমানের নির্মাণ কর্মকাণ্ড, কর ফাঁকি, অবৈধ জুয়া, ব্যাংকঋণ ফেরত না দেওয়া, বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি, ইত্যাদি।
অধ্যাপক সাদরেল রেজা আরও বলেছিলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতায় নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ড কালো আয়ের পথে সহযোগী হিসেবে
কাজ করে। এখানে আছে ঘুষ, অবৈধ কমিশন ও পক্ষপাতদুষ্ট মুনাফা ইত্যাদি। এসব কর্মকাণ্ডকে তিনি ধূসর অর্থনীতি আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, এভাবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠে একটি কালো গোষ্ঠী।
গবেষণাটি ৩০ বছর আগের করা। কিন্তু ধরন পাল্টেছে সামান্যই। পরিবর্তন যা তা হচ্ছে পণ্যে। যেমন ফেনসিডিলের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ইয়াবা, অবৈধ জুয়া পরিণত হয়েছে ক্যাসিনোতে, ধরন পাল্টেছে পদ্ধতির, ব্যবহার হচ্ছে প্রযুক্তির। তবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিষয়টি একই আছে, একই আছে কালো গোষ্ঠীর গড়ে ওঠা।
কালো গোষ্ঠীর অবৈধ আয়ের একটা পর্যায়ক্রম তৈরি করা যাক। স্বাধীনতার পরপর অবৈধ আয়ের বড় উৎস ছিল চোরাচালান ও সরকারি পারমিট ব্যবসা। এরপর বাংলাদেশ বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর হয়ে পড়ায় কমিশননির্ভর একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়ে যায়। আবার ৭০ দশকের শেষের দিক থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা হলে টাকা বানানোর জায়গা হয়ে যায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পুরো আশির দশকই ছিল এই পথে টাকা বানানোর দশক। ৯০–এর দশকে এসে যুক্ত হয় শেয়ারবাজার। ১৫ বছরের মধ্যে ঘটে দুটি বড় কেলেঙ্কারি। ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে নানাভাবে টাকা আত্মসাৎ অবশ্য এখনো বেশ জোরেশোরেই চলছে। আর এসবই হচ্ছে সরকারি ছত্রচ্ছায়ায়, নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। ব্যাংকমালিকদের–ঋণখেলাপিদের নতুন করে সুবিধা দেওয়া এরই একটি উদাহরণ মাত্র।
অর্থ আয়ের আরেকটি বড় উৎস এখন প্রকল্প। গত ১০ বছরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ অনেক বছর ধরেই প্রায় স্থবির। অথচ বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত এ অবস্থায় বেছে নিয়েছিলেন সরকারি বিনিয়োগকে। ব্যয় বাড়িয়ে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির প্রতিও সাবেক অর্থমন্ত্রীর ঝোঁক ছিল। ফলে বেড়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ও প্রকল্পের সংখ্যা। যত বেশি ও বড় প্রকল্প, তত বেশি টাকা। আবার বিদেশি সাহায্য ছিল কম, স্থানীয় মুদ্রা বেশি। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গায়ও ছিল বড় ঘাটতি।
দেশে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয় কেনাকাটায়। আবার ঠিকাদারদের বড় অংশই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী। ঠিকাদারেরা সব যুবলীগের, আর তাঁদের সহায়ক ছাত্রলীগ। আর তাদের এই মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়, নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১১ সালে গণখাতে ক্রয় নীতিমালা বা পিপিআরে ছোট্ট একটা পরিবর্তন এনে বলা হয়েছিল, সরকারি কেনাকাটা ও উন্নয়নকাজের দরপত্রে অংশ নিতে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কোনো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হবে না। এতে রাতারাতি ঠিকাদার বনে যেতে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের কোনো সমস্যাই হয়নি। সরকারই নিজেদের নেতা-কর্মীদের সেই পথ দেখিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি কাজ পেতে সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ, ঘুষের টাকা দেশের বাইরে লেনদেন, কেনাকাটার কমিশন, দর বেশি বা কম দেখিয়ে অর্থ পাচার—সবই এর অনুষঙ্গ। তারা সবাই গত ১০ বছরে ফুলেফেঁপে বড় হয়েছে। যার প্রমাণ হচ্ছে সাম্প্রতিক ক্যাসিনো–কাণ্ড, ছাত্রলীগ-যুবলীগের দৌরাত্ম্য এবং আরও আরও অনেক কিছু। আর চোরাচালানি, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থ আত্মসাৎকারী, এঁরা তো যুগ যুগ ধরে আছেনই।
সব মিলিয়ে দেশে মূলত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়ই তৈরি হয়েছে একটি ‘কালো গোষ্ঠী’। যাকে আজকাল অনেকে বলছেন স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বা ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’। দু-চারজনকে জেলে ভরে এর সমাধান করা যাবে না। কারণ, কালো গোষ্ঠীর সংখ্যা তো এখন বিশাল, কতজনকেই বা জেলে রাখা যাবে?
১৭ অক্টোবর ২০১৯

ভালো লাগলে
[Total: 1   Average: 1/5]
শেয়ার করবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published.