বিপ্লবের ভেতর-বাহির ৪: স্বাধীন দেশের প্রথম বুদ্ধিজীবী হত্যা?

61

বিপ্লবের ভেতর-বাহির: ৪

হুমায়ুন কবির ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। কবিতা লিখতেন। জীবনানন্দ দাশ নিয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু প্রবন্ধও লিখেছিলেন। প্রথম কাব্যগ্রস্থ কুসুমিত ইস্পাত ছাপা হয়েছিল ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে।
আজকাল হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। তবে সেই সময়ের অনেকের লেখার মধ্যেই পাওয়া যাবে হুমায়ুন কবিরকে। হেলাল হাফিজের কথা আমরা শুনতে পারি-


বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্পষ্ট এবং সরাসরি আহ্বান জানিয়ে লেখা প্রথম এবং প্রধান কবিতাটি হচ্ছে নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়। এর আগে আর কারও লেখায় এ রকম সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান ঘোষিত হয়নি। এবং এই একটি কবিতা আমাকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দেয়। আমি লিখতে পারছিলাম না। অস্থিরতার ভেতর দিন কাটাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ৩/৪ পৃষ্ঠা দীর্ঘ একটি কবিতা লিখে ফেললাম। কবিতাটি লেখার পর সেটি কবি হুমায়ুন কবিরকে দেখালাম। তিনি সেটা পড়ে বললেন, এডিট করতে হবে। ৩/৪ পৃষ্ঠার কবিতাটিকে তিনি বললেন ১ পৃষ্ঠায় লিখতে। দুরূহতম সেই কাজটি আমার নিজেরই করতে হবে। কুসুমিত ইস্পাত-এর কবি আমার অতিরিক্ত আবেগ বিহ্বল কবিতাটিকে এডিট করে ১ পৃষ্ঠার পরিসরে আনবার তাগিদ দিয়েছিলেন। ক্রমাগত কাটাছেড়ার ভেতর হঠাৎ করেই নামটিও এসে গেল, ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ অমানুষিক খেটে শেষ পর্যন্ত কবিতাটিকে বর্তমান অবয়বে দাঁড় করালাম।

উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

ক্যাম্পাসে সম্পাদিত কবিতাটি পড়ে শোনালাম কবি হুমায়ুন কবির এবং লেখক আহমদ ছফাকে। শুনে দুজনেই প্রচণ্ড আবেগে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘হেলাল, জীবনে তোমার আর কোন কবিতা না লিখলেও চলবে। একটি কবিতাই তোমাকে অমরত্বের দরোজায় পৌঁছে দিয়েছে।’ পরদিন তারা দুজনে আমাকে নিয়ে কবি আহসান হাবিবের কাছে গেলেন তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান অফিসে। কবি হুমায়ুন কবির আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হেলাল, কবিতা লেখে, ও একটি কবিতা লিখেছে সেটা পড়ে দেখেন।’ আমি তাঁর হাতে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি দিলাম। তিনি পড়লেন পড়ে বললেন, ‘বাবা, তোমাকে একটা কথা বলি, তোমার এই কবিতাটি আমার এই পত্রিকায় ছাপা যাবে না, ছাপলে আমার চাকরিটা চলে যাবে।’ হুমায়ুন কবিরের দিকে ফিরে তাকে বললেন, ‌’কবির তুমি তো বোঝ, ও তো নতুন ও হয়তো অভিমান করবে’। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‌’তবে একটা কথা বলে দিই, তোমার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে, জীবনে তোমার আর কোনও কবিতা না লিখলেও চলবে।’

এই হুমায়ুন কবির নির্মনভাবে খুন হন ১৯৭২ সালের ৬ জুন। তাঁর স্ত্রী সুলতানা রেবুর স্মৃতিচারণ শুনুন-


হুমায়ুন ওর প্রথম কবিতার বইটি (কুসুমিত ইস্পাত) প্রকাশিত হবার আগে যতরকম শ্রম দেয়া দরকার তার সবটুকু দিয়েছিলে। বইটি ছাপা হবার জন্য সব প্রস্তুতিই ছিল সম্পন্ন। ঐদিন সে কথা জানাতে গেলে ওর শেষ দেখা হয়েছিল সেলিম আল দীন ও আহমদ ছফার সঙ্গে। প্রচন্ড গরমে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অবস্থায় হুমায়ুন বাড়ি ফিরে এলে সন্ধ্যা নাগাদ। আমরা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত সাড়ে দশটায় আমি যখন আমার বাড়িওয়ালা ও প্রতিবেশীদের সাহায্য নিয়ে গুলিবিদ্ধ হুমায়ুনকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাই, তার কিছু পরেই খবর পেয়ে হাসপাতালে অনেকে এসেছিলেন-যাঁদের মধ্যে আমি কেবল আহমদ শরীফ স্যারের কথা মনে করতে পারি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে হুমায়ুন চিরনিদ্রায় শায়িত আছে। কে জানত, একসময়ের প্রিয় আড্ডার জায়গাটিই হবে তার শেষ শয্যা!

কবি হুমায়ুন কবিরকে হত্যা করেছিল পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। ১৯৭২ সালের ৬ জুন। এর আগে ৩ জুন খতম করা হয়েছিল সেলিম শাহনেওয়াজ বা ফজলুকে। ফজলুকে হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর ঘটনাটি। ফজলুর বিদ্রোহের বড় কারণ ছিল তাঁর প্রেমিকাকে পার্টির মেনে না নেওয়া। নিশ্চই মনে আছে, ফজলুর প্রেমিকা-স্ত্রীর নাম ছিল মিনু। মিনুকেও বহিস্কার করা হয়েছিল দল থেকে। এই মিনু ছিলেন হুমায়ুন কবিরের বোন। বোনকে আশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি। এটাই ছিল হুমায়ুন কবিরের সম্ভবত একমাত্র অপরাধ। কেবল বোনকে সমর্থন দেওয়ার কারণেই প্রতিভাবান এই মানুষটিকে খতম করা হয়েছিল।
আরও একটি অভিযোগ আনা হয়েছিল হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে। হুমায়ুন কবিরের আরেক ভাই ফিরোজ কবির ছিলেন পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী। ১৯৭১ সালে দল গঠনের পর পেয়ারা বাগানে এই ফিরোজ কবিরের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল সিরাজ সিকদারের সঙ্গে। তখন ফিরোজ কবিরকে বহিস্কার করা হয়। অভিযোগ করা হয়, এই বহিস্কারের সিদ্ধান্তও মেনে নেননি হুমায়ুন কবির।
হুমায়ুন কবিরকে খতম করার পর পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিল ১৯৭২ এর ১০ জুন। সেখানে কেন হুমায়ুন কবিরকে খতম করা হয়েছে তার যুক্তি তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা আছে,

‘সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ, নাম-যশ করার পুরোপুরি বুর্জোয়া দৃষ্টিকোন সম্পন্ন হওয়ায় স্বভাবতই হুমায়ুন কবিরের মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্য ছিল। তাঁর ইচ্ছা ছিল আর.এস.পি-এর নির্মল সেন ও প্রফেসর সিদ্দিকের মতো চাকুরী ও বুর্জোয়া জীবনযাপন করে সর্বহারা পার্টির নেতা হওয়া এবং লেখক হিসাবে নিজেকে জাহির করা। তার এই মনোভাব এবং তার ভাই ফিরোজ কবির সংক্রান্ত পার্টির সিদ্ধান্ত তাকে প্ররোচিত করে ফজলু-সুলতান চক্রের সঙ্গে যুক্ত হতে।’


আবার পরে আরও বলা হয়েছে,

‘এক দিকে সে এ ধরণের কথা বলেছে আর অন্যদিকে ফজলু চক্র ও নিজের বোনকে আশ্রয় দিয়েছে। পার্টি ও নেতৃত্ব বিরোধী অপপ্রচার ও জঘন্য ব্যক্তিগত কৃৎসা সম্বলিত দলিলাদি লিখেছে, ছাপিয়েছে এবং বিতরণ করেছে, চক্রের প্রধান প্রতিক্রিয়াশীল বৃদ্ধিজীবী হিসাবে কাজ করেছে। তার উদ্দেশ্য ছিলচক্রান্তকারীদের চর হিসাবে গোপনে পার্টির মাঝে অবস্থান করা যাতে ফজলু চক্রের পতন হলেও সে পার্টির মাঝে লুকিয়ে থাকতে পারে এবং পার্টির বিরাটাকার ক্ষতিসাধন করতে পারে।’


বিবৃতির সবশেষে ছোট্ট একটা নোট দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়,

প্রতিবিপ্লবী তৎপরতা চালাতে যেয়ে হুমায়ুনি কবির পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির গেরিলাদের হাতে খতম হয়। হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকার যে সকল পদক্ষেপ নিয়েছে তা পাক ফ্যাসিস্টদের হাতে নিহত কোনো বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে নেয়নি। তার প্রতি সরকারের বিশেষ প্রীতি কি প্রমান করে না যে, সে সরকারের উঁচুদরের গোপন তাবেদার ছিল?’


ফজলু ও হুমায়ুন কবিরকে খতম করেছিল খসরু। এই খসরু আবার কাজী জাফরের গ্রুপের ক্যাডার ছিল বলে একটি প্রচারণা রয়েছে। তবে খসরুও বাঁচতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে কালকীনি উপজেলায় রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প দখল করতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন খসরু।
প্রথমে খতমে অংশ নেওয়া গেরিলাদের পুরস্কৃত করা হলেও সর্বহারা পার্টি পরবর্তীতে হুমায়ুন কবিরকে খতম করা ভুল ছিল বলে স্বীকার করে নিয়েছিল। তবে পার্টি আগে মনে রাখেনি তাদের মূল নেতা মাও সেতুঙ এর একটি কথা। সেটি হচ্ছে, ‘মানুষের মাথা পেঁয়াজের কোষ নয় যে, একবার কেটে ফেললে তা আবার গজাবে’।

পার্টির এক সময়কার সম্পাদক রইসউদ্দিন আরিফ লিখেছেন,

‘বিপ্লবী পার্টিতে মতবিরোধ থাকবে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতবিরোধকে কেন্দ্র করে পার্টি কমরেডদেরকে জলেস্থলে-অন্তরীক্ষে যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই ধরে জবাই করার উদ্ভট লাইন সর্বহারা পার্টিতে যেভাবে শেকড় গেড়ে বসেছিলো পৃথিবীর আর কোন বিপ্লবী পার্টির ইতিহাসে তার কোনো নজির খুঁজে পাওয়া দুস্কর।’


হুমায়ুন কবিরের বন্ধু ছিলেন ফরহাদ মজহার। হুমায়ুন কবিরের খুন হওয়ার পর ফরহাদ মজহার কবিতায় লিখেছিলেন, “আমি তোকে ডেকে বলতে পারতুম হুমায়ূন অতো দ্রুত নয়, আরো আস্তে যা।” বলে রাখি, পুলিশ সে সময়ে ফরহাদ মজহারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল বলে শোনা যায়। এরপরই তিনি আমেরিকা চলে যান। তবে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পরে পুলিশ সবার সঙ্গে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক।

তবে তাদেরই আরেক বন্ধু আহমদ ছফা হয়তো অন্যকিছু ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও এখন আর কেউ এভাবে ভাবেন না। তাঁর ডায়েরি থেকে উদ্ধৃতি দেই-


“ভাত খেলাম। কাপড় ধুয়ে দিলাম। ঘুমোলাম। মনওয়ার এবং মসি এসে জাগালো। মসি ছেলেটাকে আমি ভয়ঙ্কর অপছন্দ করি। মনে হয় ছেলেটা কি একটা মতলবে ঘুরছে। আমার ধারণা হুমায়ুনের মৃত্যুরহস্যটা সে জানে। দিনে দিনে এ ধারণাটা আমার মনে পরিষ্কার রূপ লাভ করছে। কেমন জানি মনে হয়, ছেলেটার হাতে রক্তের দাগ লেগে আছে। এ ধরনের ছেলেদের কি করে এড়িয়ে চলবো সেটা একটা সমস্যা। রেবুদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে সম্ভবত। এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করতে পারিনি। আশা করছি এরই মধ্যে নতুন কোনো তথ্য জেনে যাবো। ফরহাদ মজহারের আমেরিকা পলায়ন, সালেহার সঙ্গে স্বামীর পুনর্মিলন এসবের সঙ্গে বোধ হয় হুমায়ুনের মৃত্যুর একটা সম্পর্ক জড়িত রয়েছে।”

আবার মূল প্রসঙ্গ। আবার সিরাজ সিকদার। তাঁর মৃত্যু নিয়েও অনেক মিথ রয়েছে। এখানেও কি প্রেম-ভালবাসা জাতীয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজ করেছিল? আগামি পর্বে এই আলোচনাই

ভালো লাগলে
[Total: 5   Average: 5/5]
শেয়ার করবেন?

4 thoughts on “বিপ্লবের ভেতর-বাহির ৪: স্বাধীন দেশের প্রথম বুদ্ধিজীবী হত্যা?

  1. যে বইগুলোর রেফারেন্স এলো, সবগুলোই পড়া। কিন্তু সবঘটনাকে একজায়গায় এনে গল্পের মতো এই লেখাটা মনে হলো হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে গবেষণা হলে এর প্রয়োজন হবে।

  2. Having read this I believed it was really informative.
    I appreciate you taking the time and energy to put this content together.
    I once again find myself personally spending a significant amount of time both reading and leaving
    comments. But so what, it was still worth it!

  3. Long time supporter, and thought I’d drop
    a comment.

    Your wordpress site is very sleek – hope you
    don’t mind me asking what theme you’re using?

    (and don’t mind if I steal it? :P)

    I just launched my site –also built in wordpress like yours–
    but the theme slows (!) the site down quite a bit.

    In case you have a minute, you can find it by searching for “royal cbd” on Google (would appreciate any feedback) – it’s still in the works.

    Keep up the good work– and hope you all take care of yourself during
    the coronavirus scare!

Leave a Reply

Your email address will not be published.